এক বছর আগে রাজধানীর নিউমার্কেটের একটি জুয়েলারি দোকান থেকে সাড়ে ছয় হাজার টাকায় একটি ‘হীরার’ নাকফুল কেনেন শারমিন ইসলাম। বিক্রির সময় কলমের মতো একটি যন্ত্র দিয়ে পাথরটি পরীক্ষাও করে দেন দোকানি।
পাথরে যন্ত্রের ধাতব ডগা ছোঁয়ানোর সঙ্গে সঙ্গে শব্দ হয়, জ্বলে ওঠে একের পর এক বাতি। দোকানি জানান, নাকফুলটিতে আসল হীরা বসানো হয়েছে।
যন্ত্রে পরীক্ষা দেখে নিশ্চিন্ত হয়েই টাকা পরিশোধ করেন শারমিন। কিন্তু ছয় মাস যেতে না যেতেই নাকফুলটি কালচে হতে শুরু করে, হারিয়ে যায় উজ্জ্বলতা।
সেটি নিয়ে দোকানে গেলে বিক্রেতা ফেরত নিতে অস্বীকৃতি জানান। শারমিন বলেন, ‘অনেক শখ করে হীরার নাকফুলটি কিনেছিলাম। দোকানের মেশিনে পরীক্ষা করেও দেখানো হয়েছিল। পাথরে মেশিন ছোঁয়ানোর সঙ্গে সঙ্গে শব্দ হচ্ছিল, বাতিও জ্বলেছিল।
তাই কোনো সন্দেহ হয়নি। পরে অভিযোগ করেও গয়নাটি ফেরত দিতে পারিনি।’
শুধু নিউমার্কেট নয়, রাজধানীর নয়াবাজার, মিরপুর, শ্যামলী, গুলশান ও বনানীসহ দেশের বিভিন্ন জুয়েলারি মার্কেটে হীরা পরীক্ষার নামে বহুল ব্যবহৃত হচ্ছে ‘ডায়মন্ড সিলেক্টর পেন’। পাথরের ওপর যন্ত্রটি ছোঁয়ানোর পর শব্দ ও বাতির সংকেত দেখিয়ে দোকানিরা ক্রেতাকে বলছেন, ‘মেশিনে পরীক্ষা করা হয়েছে, এটি আসল হীরা।’
কিন্তু অনুসন্ধানে জানা গেছে, অধিকাংশ দোকানে ব্যবহৃত এসব যন্ত্র শুধু পাথরের তাপ পরিবাহিতা পরীক্ষা করে।
আসল হীরার মতো উচ্চ তাপ পরিবাহী মোইসানাইট নামের হীরাসদৃশ পাথরকেও অনেক ক্ষেত্রে যন্ত্রটি ‘ডায়মন্ড’ হিসেবে শনাক্ত করে। যন্ত্রটির এই সীমাবদ্ধতা ক্রেতাকে না জানিয়ে এর ফলকেই আসল হীরার চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।
বাইরে থেকে আনা পাথর পরীক্ষায় আপত্তি :
বিষয়টি যাচাই করতে অনুসন্ধানী সেলের সদস্যরা রাজধানীর নিউমার্কেট, শ্যামলী ও মিরপুরের কয়েকটি জুয়েলারি দোকান ঘুরেছেন। ক্রেতা পরিচয়ে কথা বলে দেখা গেছে, কম দামের গয়নাতেও হীরার নিশ্চয়তা হিসেবে পেন টেস্টারের ফল দেখানো হচ্ছে। তবে অধিকাংশ দোকানই স্বীকৃত জেমোলজিক্যাল ল্যাবের অনলাইনে যাচাইযোগ্য সনদ দিতে পারছে না।
নিউমার্কেটের একটি জুয়েলারি দোকানে ক্রেতা সেজে প্রবেশ করেন অনুসন্ধানী সেলের একজন সদস্য। কম দামের মধ্যে হীরার নাকফুল দেখতে চাইলে দুই থেকে তিন সেন্ট ওজনের ছোট পাথর বসানো কয়েকটি নাকফুল দেখান দোকানি। দাম হাঁকেন ছয় থেকে সাত হাজার টাকা।
গয়নাটি আসল হীরার কি না জানতে চাইলে একটি নাকফুলে পেন টেস্টার ছোঁয়ান তিনি। যন্ত্রটিতে বিপ বিপ শব্দ করে বাতি জ্বলে ওঠার পর এটিকেই আসল হীরার প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেন। হীরা নয়—এমন অন্য কোনো পাথর পরীক্ষা করে দেখাতে বললে দোকানি জানান, তাঁর দোকানে হীরা ছাড়া অন্য পাথর নেই। পরে ঘড়ি ও স্বর্ণের অংশে যন্ত্রটি ছোঁয়ান। সেখানে শব্দ না হওয়াকে তিনি যন্ত্রটির নির্ভরযোগ্যতার প্রমাণ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেন।
প্রতিবেদক তখন বাইরে থেকে আনা একটি পাথর পরীক্ষা করার অনুরোধ জানান। এতে দোকানির আচরণ বদলে যায়। তিনি ওই প্রতিবেদকের কাছে নাকফুল বিক্রি করবেন না বলে সাফ জানিয়ে দেন। যন্ত্রটিও সরিয়ে ফেলেন।
নিউমার্কেটের সানন্দা জুয়েলার্সে ক্রেতা হিসেবে গেলে সেখানেও পেন টেস্টারে পরীক্ষা করে হীরার গয়না দেওয়ার কথা বলা হয়। প্রতিষ্ঠানটির বিক্রয়কর্মী মানিক জানান, গয়নার সঙ্গে তাঁদের নিজস্ব ল্যাবের সনদ দেওয়া হবে। তবে সেটি অনলাইনে যাচাই করার সুযোগ থাকবে না।
মানিক বলেন, ‘আমাদের কাছ থেকে হীরার গয়না নিলে অনলাইন ভেরিফিকেশন দেওয়া হবে না। তবে নিজস্ব ল্যাবের সার্টিফিকেট দেওয়া হবে। পরে কোনো ত্রুটি ধরা পড়লে জানালে সমাধান করে দেওয়া হবে।’
মিরপুরের একটি জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, পুরান ঢাকার তাঁতীবাজার থেকে এসব পেন টেস্টার কিনে আনেন দোকানিরা। যন্ত্রটি আসল হীরা ও মোইসানাইট-দুটিকেই হীরা হিসেবে দেখাতে পারে, এটি অনেক ব্যবসায়ীরই জানা।
তিনি বলেন, ‘এটি আসল হীরা এবং মোইসানাইট-দুটিকেই আসল হিসেবে দেখায়। বলতে পারেন, গ্রাহককে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য যন্ত্রটি দেখানো হয়। চার-পাঁচ হাজার টাকায় আসল হীরা দেওয়া সম্ভব নয়। গয়নার স্বর্ণ, পাথর ও তৈরির খরচ ধরলে অনেক ক্ষেত্রে ওই দামে ভালো মানের মোইসানাইট দেওয়াও কঠিন।’
অনুসন্ধানে পুরান ঢাকা, উত্তরা, এলিফ্যান্ট রোড এবং বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ‘ডায়মন্ড সিলেক্টর পেন’ বিক্রির তথ্য পাওয়া গেছে। যন্ত্রভেদে দাম এক থেকে কয়েক হাজার টাকা। দেশের একটি জনপ্রিয় অনলাইন বিপণন প্ল্যাটফর্মে একটি ডায়মন্ড সিলেক্টর পেনের দাম দেখা গেছে এক হাজার ১১৭ টাকা।
যেভাবে নকল পাথরও ‘হীরা’ হয়:
দেশের অধিকাংশ দোকানে ব্যবহৃত ডায়মন্ড টেস্টার পেন মূলত ‘থার্মাল কন্ডাক্টিভিটি’ বা তাপ পরিবাহিতা পরিমাপ করে। হীরা উচ্চ তাপ পরিবাহী। পাথরে যন্ত্রের ডগা ছোঁয়ানোর পর তাপ দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে যন্ত্রটি শব্দ ও আলোর মাধ্যমে ইতিবাচক সংকেত দেয়।
সমস্যা হলো, সিলিকন কার্বাইড দিয়ে তৈরি মোইসানাইটও উচ্চমাত্রায় তাপ পরিবহন করে। ফলে শুধু তাপ পরিবাহিতার ওপর নির্ভরশীল সাধারণ পেন টেস্টার অনেক ক্ষেত্রেই মোইসানাইটকে হীরা হিসেবে শনাক্ত করে। পরীক্ষাবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘ফলস পজিটিভ’ বলা হয়।
হীরা ও মোইসানাইটের পার্থক্য শনাক্ত করতে উন্নতমানের ‘ডুয়াল টেস্টার’ ব্যবহার করা হয়। এসব যন্ত্র তাপের পাশাপাশি বৈদ্যুতিক পরিবাহিতাও পরীক্ষা করে। তবে নিশ্চিত সিদ্ধান্তের জন্য প্রয়োজন বিশেষজ্ঞের পর্যবেক্ষণ ও পূর্ণাঙ্গ জেমোলজিক্যাল ল্যাব পরীক্ষা।
হীরা বিশুদ্ধ কার্বনের স্ফটিক। মোহস স্কেলে এর কঠিনতা ১০। অন্যদিকে মোইসানাইট সিলিকন কার্বাইড দিয়ে তৈরি এবং এর কঠিনতা প্রায় ৯.২৫। হীরার তুলনায় মোইসানাইট বেশি রঙিন আলোর ঝলক ছড়াতে পারে। কিন্তু সাধারণ ক্রেতার পক্ষে খালি চোখে এই পার্থক্য বোঝা কঠিন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘মোইসানাইট হীরা নয়। এটি সাধারণত ল্যাবে তৈরি হয় এবং দেখতে হীরার মতোই উজ্জ্বল। তবে এর দাম হীরার তুলনায় অনেক কম। আসল ডায়মন্ড এত কম দামে বিক্রি হওয়ার কথা নয়।’
তিনি বলেন, ‘বাইরে থেকে মোইসানাইটকে হীরার মতো দেখায়। সাধারণ যন্ত্রে মোইসানাইটকেও হীরা হিসেবে দেখাতে পারে। তাই ক্রেতাদের এ বিষয়ে সতর্ক হতে হবে।’
দেশে হীরার কোনো খনি বা বাণিজ্যিক উৎপাদন নেই। বাজারের চাহিদা পূরণ হওয়ার কথা আমদানির মাধ্যমে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈধপথে হীরা আমদানির পরিমাণ অত্যন্ত কম হলেও রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শহরে হীরার গয়নার দোকান ও বিক্রি বেড়েছে। ফলে বাজারের বিপুল সরবরাহের উৎস নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বাজারে প্রাকৃতিক হীরার পাশাপাশি ল্যাব-গ্রোন হীরা, মোইসানাইট, কিউবিক জিরকোনিয়া ও অন্যান্য হীরাসদৃশ পাথর বিক্রি হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে পাথরের প্রকৃত পরিচয় গোপন রেখে সেগুলো প্রাকৃতিক হীরা হিসেবে ক্রেতার কাছে তুলে ধরা হচ্ছে।
১৫০ টাকায় ল্যাব পরীক্ষা
ঢাকার বাংলামোটরের কনকর্ড টাওয়ারে কার্যক্রম পরিচালনা করছে সলিটায়ার জেমোলজিক্যাল ল্যাবরেটরিজ (এসজিএল)। প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য, তাদের ল্যাবে আধুনিক যন্ত্রপাতি, মাইক্রোস্কোপ ও বিভিন্ন জেমোলজিক্যাল পদ্ধতি ব্যবহার করে প্রাকৃতিক হীরা, ল্যাব-গ্রোন হীরা এবং মোইসানাইটসহ হীরাসদৃশ পাথর আলাদা করা হয়।
এসজিএল ল্যাবের মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ ফারিহা বলেন, ‘আগে মূলত জুয়েলারি ব্যবসায়ীরাই পরীক্ষা করাতে আসতেন। এখন সাধারণ ক্রেতারাও আসছেন। অনেকেই আসল হীরা হিসেবে গয়না কিনে এখানে পরীক্ষা করার পর জানতে পারছেন, সেটি মোইসানাইট বা অন্য পাথর।’
তিনি বলেন, ‘দোকানের পেন টেস্টার দিয়ে হীরা শনাক্ত করা যায় না। সঠিক ফলের জন্য ল্যাবে পরীক্ষা করাতে হবে। আমাদের এখানে সর্বনিম্ন ১৫০ টাকা থেকে পরীক্ষা শুরু হয়। ছোট নাকফুল, কানের দুল কিংবা আংটির ক্ষেত্রে সাধারণত ১৫০ থেকে এক হাজার টাকার মধ্যে পরীক্ষা করা যায়।’
ল্যাবে মেশিন টেস্টিংয়ের পাশাপাশি মাইক্রোস্কোপে পর্যবেক্ষণ ও গ্রেডিং করা হয়। প্রাকৃতিক হীরা, ল্যাব-গ্রোন হীরা এবং মোইসানাইটসহ অন্যান্য পাথর আলাদা করে পরীক্ষার ফল সনদে উল্লেখ করা হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পেন টেস্টারের সীমাবদ্ধতা জেনেও এর ফলকে আসল হীরার চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হলে তা ক্রেতাকে বিভ্রান্ত করার শামিল। কারণ যন্ত্রটি পাথরের পরিচয় নির্ধারণ করে না; শুধু তাপ পরিবাহিতা পরীক্ষা করে।
ক্রেতাদের সুরক্ষায় প্রতিটি হীরার গয়নার সঙ্গে স্বীকৃত ও অনলাইনে যাচাইযোগ্য পরীক্ষাগারের সনদ দেওয়া এবং বিক্রয় রসিদে পাথরটি প্রাকৃতিক হীরা, ল্যাব-গ্রোন হীরা নাকি মোইসানাইট, তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বাজার তদারকিতে ভোক্তা অধিকার সংস্থা, জুয়েলারি ব্যবসায়ীদের সংগঠন এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর হস্তক্ষেপ জরুরি।
তা না হলে হাজার টাকার পেন টেস্টারে জ্বলে ওঠা কয়েকটি বাতিই হীরার বাজারে ‘আসলের নিশ্চয়তা’ হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকবে। আর যন্ত্রের সেই সংকেত বিশ্বাস করে হীরার নামে মোইসানাইট কিংবা অন্য পাথর কিনে প্রতারিত হবেন ক্রেতারা।





