কিশোর-কিশোরী ও শিশুদের অনলাইন সুরক্ষা ও মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের সাথে এক ঐতিহাসিক নিষ্পত্তিতে পৌঁছেছে সোশ্যাল মিডিয়া জায়ান্ট মেটা। যুক্তরাষ্ট্রের ৫২ জন অ্যাটর্নি জেনারেলের সাথে হওয়া প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলারের এই মেগা সমঝোতার আওতায় দেশটির ১৮ বছরের কম বয়সী ব্যবহারকারীদের জন্য ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারে আসছে কঠোর নানা বিধিনিষেধ। ওকল্যান্ডের একটি ডিস্ট্রিক্ট কোর্টে দীর্ঘ শুনানির পর বিচারক এই চুক্তিতে নীতিগত অনুমোদন দেওয়ায় মেটার বিরুদ্ধে চলা বহুল আলোচিত মামলাটির আইনি জটিলতা অবসানের পথে এগোল।
মেটা অবশ্য ব্যবহারকারীদের বিভ্রান্ত করা বা প্ল্যাটফর্মকে ইচ্ছাকৃত আসক্তিকর করে তোলার অভিযোগ স্বীকার করেনি, তবে আদালতের অনুমোদনের মধ্য দিয়ে নতুন নিয়মগুলো আগামী ১০ বছরের জন্য বলবৎ হতে যাচ্ছে। এই উদ্যোগের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হলো ১৩ বছরের কম বয়সী শিশুদের প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ সম্পূর্ণ রোধ করা। অত্যন্ত নিখুঁত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও উন্নত বয়স শনাক্তকরণ প্রযুক্তির সাহায্যে মেটা ছোট শিশুদের অ্যাকাউন্ট শনাক্ত করে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে মুছে ফেলার প্রক্রিয়া আরও জোরালো করবে। অবশ্য এটি যুক্তরাষ্ট্রের শিশু অনলাইন গোপনীয়তা সুরক্ষার অংশ হিসেবে করা হচ্ছে, যা সরকার কর্তৃক ঢালাও কোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষেধাজ্ঞা নয়।
কিশোর-কিশোরীদের অতিরিক্ত সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাটানো রোধে একাধিক দৃশ্যমান পরিবর্তন আনা হচ্ছে। নতুন নিয়মে ১৮ বছরের নিচে থাকা কোনো ব্যবহারকারী দিনে সর্বোচ্চ দুই ঘণ্টার বেশি ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম ব্যবহার করতে পারবে না। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, কোনো কিশোর চাইলেই এই সময়সীমা নিজে পরিবর্তন করতে পারবে না; এর জন্য বাধ্যতামূলক অভিভাবকের ডিজিটাল অনুমোদনের প্রয়োজন হবে। এছাড়া রাত ১২টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত এসব অ্যাকাউন্ট থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যক্রম বন্ধ রাখা হবে। প্রতিদিনের একটানা ব্যবহার ঠেকাতে প্রতি ১৫ মিনিট পর পর সতর্কবার্তা প্রদর্শনের পাশাপাশি স্কুল চলাকালে পুশ নোটিফিকেশনে কড়াকড়ি আরোপের ব্যবস্থাও এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
নতুন এই সমঝোতা কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর থেকে ভার্চ্যুয়াল প্রতিক্রিয়া ও ক্ষতিকর সৌন্দর্যের মানদণ্ডের চাপ কমাতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে। ব্যবহারকারীদের মানসিকভাবে সুরক্ষিত রাখতে ১৮ বছরের কম বয়সীদের পোস্টে ঠিক কতটি লাইক এসেছে, সেই সংখ্যা প্রদর্শন বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর সাথে কসমেটিক সার্জারি বা শারীরিক গঠন পরিবর্তন সংক্রান্ত বিতর্কিত ও বিভ্রান্তিকর ইমেজ ফিল্টার ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হতে যাচ্ছে। একইসাথে কিশোরেরা চাইলে অ্যালগরিদমের নিজস্ব পছন্দ বাদ দিয়ে একদম সাধারণ একটি ফিড ব্যবহারের সুযোগ পাবে এবং তাদের অভিযোগগুলো খুব দ্রুত পর্যালোচনা নিশ্চিত করতে মেটাকে অন্তত ৯০ শতাংশ রিপোর্ট মাত্র ছয় ঘণ্টার মধ্যে খতিয়ে দেখতে হবে।
এই সুবিশাল সমঝোতা চুক্তির অর্থ পরিশোধের বিষয়ে বেশ কিছু শর্ত রাখা হয়েছে। মোট ১৮ বিলিয়ন ডলারের সমঝোতার মধ্যে প্রায় ১২ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার আগামী এক দশকে অংশগ্রহণকারী রাজ্যগুলোকে দেওয়া হবে। বাকি ৫ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন নির্ভর করবে প্রতিযোগী প্ল্যাটফর্ম টিকটক ও ইউটিউব অনুরূপ ব্যবস্থা গ্রহণ করে কিনা তার ওপর।
উল্লেখ্য, এই সমঝোতায় টিকটক কোনো সরাসরি পক্ষ ছিল না এবং এতে প্ল্যাটফর্মটি নিষিদ্ধ হওয়ার মতো সিদ্ধান্তও নেই। মেটা অন্য টেক জায়ান্টদের প্রতিও শিশুদের নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ তৈরিতে এমন সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে।





