একসময় বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের বন ও প্লাবন ভূমিতে অবাধে ঘুরে বেড়াত এশিয়ার সবচেয়ে বড় অ্যান্টিলোপ নীলগাই। শিকার ও আবাসস্থল হারিয়ে প্রায় এক শতাব্দী আগে বাংলাদেশ থেকে হারিয়ে যায় প্রাণীটি। আবারও সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে নীলগাই প্রবেশের একাধিক ঘটনা ঘটেছে।
ঝোপের আড়ালে হঠাৎ দেখা গেল অচেনা এক প্রাণী। নীলচে-ধূসর রঙের বিশাল শরীর, লম্বা পা, শক্ত ঘাড় আর ছোট শিং। খবর পেয়ে গ্রামের অনেক মানুষ ছুটে এলো। কেউ দূর থেকে তাকিয়ে দেখছে, কেউ মোবাইল ফোন বের করে ছবি তুলছে। অনেকে ছুটে এলো লাঠি নিয়ে। কৌতূহলী কয়েকজন কাছে যাওয়ার চেষ্টা করতেই ভয় পেয়ে প্রাণীটি ছুটতে শুরু করল। ধান খেত পেরিয়ে, গ্রামের পথ ধরে, কখনো জনবসতির ভিতর দিয়ে।
এমন দৃশ্য গত কয়েক বছরে উত্তর-পশ্চিম বাংলাদেশের কোথাও কোথাও দেখা গেছে। প্রাণীটির চেহারা গরুর মতো, কিন্তু গরু নয়। আবার হরিণের মতোও নয়। পরবর্তীতে বনবিভাগের লোকজন ছবি দেখে জানায় প্রাণীটি ছিল নীলগাই। আজকের বাংলাদেশের মানুষের কাছে নীলগাই বিরল এক দৃশ্য হলেও একসময় এই প্রাণীই ছিল দেশের উত্তরাঞ্চলের বন্যপ্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। সত্তর-আশির দশকের শিশুরা দাদি-নানির মুখে নীলগাইয়ের গল্প শুনে বড় হয়েছে। দিনাজপুর ও রংপুর অঞ্চলের বনে দেখা মিলত প্রাণীটির। অনেক দিন পানি না খেয়ে বাঁচতে পারে। তবে সুস্বাদু মাংসের কারণে সব সময় শিকারির তিরের নিশানায় ছিল নীলগাই। ১৯৩০-এর দশকের পর থেকে এ ভূখণ্ডে আর দেখা মেলেনি প্রাণীটির। বাংলাদেশের জাতীয় লাল তালিকায়ও নীলগাইকে আঞ্চলিকভাবে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। তবে বিগত কয়েক বছরে সীমান্ত পেরিয়ে নীলগাই প্রবেশের একাধিক ঘটনা ঘটেছে, যা এদেশের বণ্যপ্রকৃতিতে প্রাণীটির ফিরে আসার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
নীলগাই এশিয়ার সবচেয়ে বড় অ্যান্টিলোপ প্রাণী। অ্যান্টিলোপ হলো বোভিডি পরিবারের অন্তর্ভুক্ত দ্রুতগামী ও খুরযুক্ত স্তন্যপায়ী বন্য প্রাণী, যা গরু, ছাগল ও ভেড়ার সমগোত্রীয় হলেও দেখতে অনেকটা হরিণের মতো। এরা মূলত আফ্রিকা এবং এশিয়া মহাদেশের আদিবাসী। এদের শিং স্থায়ী ও শাখা-প্রশাখা বিশিষ্ট হয় না।
গবেষণায় বলা হয়েছে, উত্তর-পশ্চিম বাংলাদেশ ও ভারতের উত্তর-পূর্ব পশ্চিমবঙ্গ ছিল নীলগাইয়ের প্রাকৃতিক বিস্তারের পূর্বতম সীমা। গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রের মতো বড় নদীর কারণে পূর্বদিকে বিস্তার লাভ করতে পারেনি প্রাণীটি। এ কারণে চট্টগ্রাম বা সিলেটের বনাঞ্চল কখনো নীলগাইয়ের আবাস হয়ে উঠতে পারেনি। দিনাজপুর-রংপুরের বনাঞ্চল, নদীর পাড়ের খোলা জায়গা ও প্লাবনভূমিতে হরহামেশা দেখা মিলত নীলগাইয়ের। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে যেতে থাকে সেই ভূদৃশ্য। কমতে শুরু করে বন। বাড়ে বসতি। কৃষিজমি বিস্তৃত হয়েছে। একই সঙ্গে চলেছে নির্বিচারে শিকার। ফলে ধীরে ধীরে কমতে থাকে নীলগাইয়ের নিরাপদ আবাস ও বিচরণক্ষেত্র। আবাসস্থল হারানো এবং অনিয়ন্ত্রিত শিকারের চাপে ১৯৩০-এর দশকের শেষ নাগাদ বাংলাদেশ থেকে বিলুপ্ত হয়ে যায় প্রাণীটি।
তারপর কেটে গেছে প্রায় এক শতাব্দী। বন থেকে নীলগাইয়ের ঠাঁই হয়েছে বইয়ের পাতায়। কিন্তু গল্পটি সেখানেই শেষ হয়নি। ২০১৮ সালের পর উত্তর-পশ্চিম বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় আবারও নীলগাই দেখা যেতে থাকে। একটি-দুটি নয়। কয়েক বছরে একাধিকবার।
২০২৩ সালে প্রকাশিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় ২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে নীলগাই প্রবেশের ১৩টি ঘটনা নথিবদ্ধ হয়েছে। সব কটি ঘটনাই ঘটেছে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে। একই সময়ে সীমান্তের ওপারে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে নীলগাই প্রবেশের আরও ১৮টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়।
গবেষকদের ধারণা- বাংলাদেশে আসা এসব নীলগাই মূলত ভারতের বিহার, ওড়িশ্যা, ঝাড়খণ্ড এবং নেপালের দিক থেকে বিচরণ করতে করতে এসেছে। নীলগাই প্রবেশের বেশির ভাগ ঘটনা ঘটেছে শীত ও গ্রীষ্মের শুরুর দিকে। অনেকে একে নীলগাইয়ের বাংলাদেশে ফিরে আসা বললেও, এখনো বাংলাদেশে তাদের স্থায়ী প্রত্যাবর্তন ঘটেনি। বরং সীমান্তের ওপার থেকে বিচ্ছিন্নভাবে ঢুকে অনেক সময় বিপদে পড়েছে প্রাণীগুলো। গবেষণায় এমন ঘটনাও পাওয়া গেছে, যেখানে দীর্ঘক্ষণ মানুষের তাড়া খেয়ে নীলগাই মারা গেছে। কোথাও আবার মাংসের জন্য প্রাণীটি জবাই করা হয়েছে। মানুষের তাড়া খেয়ে একটি নীলগাইয়ের হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃত্যুর ঘটনাও গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
নীলগাই শুধু ঘন বনের প্রাণী নয়। খোলা বনভূমি, ঝোপঝাড়, তৃণভূমি, নদীর পাড় ও অন্যান্য অপেক্ষাকৃত খোলা আবাসস্থলেও তারা থাকতে পারে। ঘাসের পাশাপাশি পাতা, ভেষজ উদ্ভিদ ও ঝোপের কচি অংশ খায়। এ কারণে বাংলাদেশে নীলগাইয়ের সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। উত্তর-পশ্চিম বাংলাদেশের কিছু প্রাকৃতিক আবাসস্থল এখনো তাদের জন্য উপযোগী হতে পারে-এমন সম্ভাবনা গবেষণায় আলোচিত হয়েছে। কিন্তু, মানুষের কৌতূহল ও শিকারের নেশা সেই সুযোগ কেড়ে নিচ্ছে। এ কারণে ভারত, নেপাল ও পাকিস্তানে এখনো নীলগাই টিকে থাকলেও বাংলাদেশে আঞ্চলিকভাবে বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
প্রায় এক শতাব্দী আগে যে নীলগাই বাংলাদেশ থেকে হারিয়ে গিয়েছিল, তার বংশধররা আজ আবার সীমান্ত পেরিয়ে এ দেশের মাটিতে পা রাখছে। তারা হয়তো জানে না-এই ভূখণ্ড একসময় তাদেরই ছিল। জানে না, কেন মানুষ তাদের দেখে ছুটে আসে। জানে না, এই দেশে তাদের পূর্বপুরুষদের শেষ গল্পটি কেমন ছিল। কিন্তু মানুষ জানে। আর সেই কারণেই নীলগাইয়ের এই নতুন আগমন শুধু একটি বন্য প্রাণী দেখার ঘটনা নয়; এটি আমাদের অতীতের সামনে দাঁড়ানোরও সুযোগ।
গবেষকদের মতে, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কিছু এলাকায় যদি উপযুক্ত আবাসস্থল থাকে, যদি শিকার বন্ধ করা যায়-তাহলে হয়তো কোনো একদিন নীলগাইয়ের বিচ্ছিন্ন আগমন স্থায়ী বসতির দিকে যেতে পারে। প্রশ্ন হলো, বন ধ্বংস ও মানুষের শিকারের নেশার ঝুঁকির মধ্যে বাংলাদেশ কি আবার নীলগাইয়ের দেশ হতে পারবে?





