স্থানীয় সরকারের সব প্রতিষ্ঠানের ছাদে বাধ্যতামূলক হচ্ছে সৌর প্যানেল

সিটি করপোরেশন থেকে ইউনিয়ন পরিষদ—স্থানীয় সরকারের এসব প্রতিষ্ঠানের ছাদে বসাতে হবে সৌরবিদ্যুতের প্যানেল।

শুধু দাপ্তরিক ভবন নয়, প্রতিষ্ঠানগুলোর অধীন মিলনায়তন, ডাকবাংলো ও হাটবাজারের স্থায়ী শেডের ছাদেও সৌরবিদ্যুতের প্যানেল বসাতে হবে।
প্যানেলে উৎপাদিত বিদ্যুৎ দিয়ে নিজস্ব চাহিদা মেটাবে প্রতিষ্ঠানগুলো। উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করে প্রতিষ্ঠানগুলো আয় করতে পারবে।

স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, “স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষের দৈনন্দিন সেবার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। আমরা চাই, বিদ্যুতের সমস্যায় এসব সেবা যেন ব্যাহত না হয়। ভবনের ছাদ কাজে লাগিয়ে নিজেদের বিদ্যুৎ উৎপাদন করলে খরচ কমবে। ব্যাটারি ব্যাকআপ জরুরি কাজ চালু রাখতে সহায়তা করবে। আবার বাড়তি বিদ্যুৎ গ্রিডে দিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো আয় করতে পারবে। শহর থেকে ইউনিয়ন পর্যন্ত এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করে আমরা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও সক্ষম করতে চাই।”

১৪ ও ১৫ সেপ্টেম্বর স্থানীয় সরকার বিভাগের পৃথক চিঠিতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ভবনে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সঙ্গে রাখতে বলা হয়েছে অন্তত দুই ঘণ্টার ব্যাটারি ব্যাকআপ।

দেশে বিদ্যুৎ-সংকটের মধ্যে স্থানীয় সরকার বিভাগ এই উদ্যোগ নিয়েছে। উদ্যোগটি সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদ পর্যন্ত বাস্তবায়ন হবে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানগুলোর রাজস্ব আয় বাড়ানোর বিষয়টি নতুন এই নির্দেশনায় গুরুত্ব পেয়েছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের ১ সেপ্টেম্বরের প্রজ্ঞাপনের সূত্র উল্লেখ করে চিঠিগুলোতে বলা হয়েছে, টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে সরকারের উদ্যোগের অংশ হিসেবে এই ব্যবস্থা নিতে হবে।

বিদ্যুৎ-সংকটের এই সময়ে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর ছাদ কাজে লাগানোর উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন নবায়নযোগ্য জ্বালানিসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁরা বলছেন, এতে আলাদা স্থান ছাড়াই বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হবে। দিনের বেলায় প্রতিষ্ঠানগুলোর দাপ্তরিক চাহিদার একটি অংশ এই সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে মেটানো গেলে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমতে পারে।

আগামী বছরের জানুয়ারির মধ্যে এসব প্রতিষ্ঠানে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করার নির্দেশনা দেওয়া হবে বলে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম।

মীর শাহে আলম গণমাধ্যমকে বলেন, “স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষের দৈনন্দিন সেবার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। আমরা চাই, বিদ্যুতের সমস্যায় এসব সেবা যেন ব্যাহত না হয়। ভবনের ছাদ কাজে লাগিয়ে নিজেদের বিদ্যুৎ উৎপাদন করলে খরচ কমবে। ব্যাটারি ব্যাকআপ জরুরি কাজ চালু রাখতে সহায়তা করবে। আবার বাড়তি বিদ্যুৎ গ্রিডে দিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো আয় করতে পারবে। শহর থেকে ইউনিয়ন পর্যন্ত এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করে আমরা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও সক্ষম করতে চাই।”

সিটি করপোরেশনগুলোকে পাঠানো চিঠিতে নিজস্ব ভবন, আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তাদের কার্যালয়, বাসভবন, মিলনায়তন, ডাকবাংলো ও অতিথিশালার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের কথা বলা হয়েছে। করপোরেশনের অধীন মার্কেট–হাটবাজারের স্থায়ী শেডে আয়তন বিবেচনায় এই ব্যবস্থা নিতে হবে।

পৌরসভা ও জেলা পরিষদের ভবন, মিলনায়তন, ডাকবাংলোসহ অধীনস্থ মার্কেট–হাটবাজারের স্থায়ী শেড এই নির্দেশনার আওতাভুক্ত।

উপজেলা পরিষদ ভবনের পাশাপাশি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও চেয়ারম্যান বা প্রশাসকের বাসভবন, কর্মচারীদের আবাসিক ভবন এবং অধীনস্থ হাটবাজারের স্থায়ী শেডে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করতে হবে।

ইউনিয়ন পরিষদের ভবনগুলোর ক্ষেত্রে এই নির্দেশনা বাস্তবায়নের জন্য জেলা প্রশাসকদের চিঠি দেওয়া হয়েছে।

অর্থায়নের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বিবেচনা করা হয়েছে। যেমন—আর্থিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের রাজস্ব কিংবা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির অর্থ এই খাতে ব্যয় করতে পারবে।

আবার যেসব প্রতিষ্ঠান আর্থিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়, সেগুলো বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানের তালিকাভুক্ত কোম্পানির আর্থিক–কারিগরি সহায়তায় কার্যক্রম বাস্তবায়ন করবে। এ ক্ষেত্রে জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচির নির্দেশিকা অনুসরণ করতে হবে। প্যানেল স্থাপনকারী কোম্পানির সঙ্গে পরবর্তী ২০ বছরের মেরামত–রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে চুক্তি করার নির্দেশনা রয়েছে।

সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের আগে ছাদের কারিগরি উপযোগিতা যাচাইসহ নীতিমালা অনুযায়ী সর্বোচ্চ দক্ষতার প্যানেলের ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নির্দিষ্ট বাজেট ও লোকবল রাখতে হবে।

সরকারের সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণ উদ্যোগের সঙ্গে এই সিদ্ধান্তের যোগসূত্র রয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগ ১ সেপ্টেম্বর ব্যাটারিসহ ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে বিশেষ প্রণোদনা ঘোষণা করেছে। এতে বলা হয়েছে, নিজস্ব চাহিদা মিটিয়ে বাড়তি বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিটে ১০ টাকা ৫০ পয়সা দেওয়া হবে। প্রণোদনার এই দাম পেতে হলে ২০২৭ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে সৌরবিদ্যুৎব্যবস্থা স্থাপন করতে হবে। এই সময়ের পর তা বসালে বিশেষ এ সুবিধা মিলবে না।

এই দামে বিদ্যুৎ কেনা হবে ২০৩০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। বিদ্যুৎ বিক্রির টাকা প্রতি তিন মাস পরপর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবে জমা হবে। এ ছাড়া সৌরবিদ্যুতের প্যানেল, ব্যাটারি, ইনভার্টার, মিটারসহ সব যন্ত্রপাতি হতে হবে সরকার নির্ধারিত মানের।

সরকারি ভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের আলোচনা আগেও হয়েছে। ২০২৫ সালে সরকারি দপ্তর, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন ভবনে তিন হাজার মেগাওয়াটের ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল।

একই বছরের আগস্টে আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যানশিয়াল অ্যানালাইসিসের এক বিশ্লেষণে একে নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণের ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি ভবনের প্রকৃত সক্ষমতা যাচাই, অর্থায়ন ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়।

বিদ্যুৎ-সংকটের এই সময়ে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর ছাদ কাজে লাগানোর উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন নবায়নযোগ্য জ্বালানিসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁরা বলছেন, এতে আলাদা স্থান ছাড়াই বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হবে। দিনের বেলায় প্রতিষ্ঠানগুলোর দাপ্তরিক চাহিদার একটি অংশ এই সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে মেটানো গেলে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমতে পারে।

তবে এ জন্য ভবনের উপযোগিতা যাচাই, মানসম্মত যন্ত্রপাতি ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করার ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলছেন, উদ্যোগটি ঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ের সেবা নির্বিঘ্নে সচল থাকবে। এতে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানও সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন–ব্যবহারে উৎসাহিত হবে।

বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম গণমাধ্যমকে বলেন, সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের আগে ছাদের কারিগরি উপযোগিতা যাচাইসহ নীতিমালা অনুযায়ী সর্বোচ্চ দক্ষতার প্যানেলের ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নির্দিষ্ট বাজেট ও লোকবল রাখতে হবে।

এ ব্যাপারে স্থানীয় সরকার বিভাগে একটি তদারকি সেল গঠনের পরামর্শ দিয়েছেন খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। তিনি বলেন, কোন প্রতিষ্ঠান উদ্যোগ নিয়েছে, কোথায় কাজ শেষ হয়েছে, কত বিদ্যুৎ নিজেরা ব্যবহার করছে, কতটা গ্রিডে যাচ্ছে—এসব তথ্য নিয়মিত সংগ্রহ করতে হবে। এসব তথ্য জাতীয় পর্যায়ে প্রকাশ করলে কত বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরকারি ব্যয় সাশ্রয় হলো, তা সহজেই বোঝা যাবে।