ইলিশ রপ্তানিকারক বাংলাদেশ এখন আমদানিকারক

দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ থেকে ভারতে ইলিশ রপ্তানি হয়েছে। বিশেষ করে দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশের ইলিশের চাহিদা ছিল উল্লেখযোগ্য। সেই বাণিজ্যপ্রবাহে এবার দেখা দিয়েছে উল্টো চিত্র। দেশে ইলিশের উৎপাদন কমে যাওয়ায় ভারতের গুজরাট থেকে ইলিশ আমদানি শুরু করেছে বাংলাদেশ।

ভারতের মাছ ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই মাসে গুজরাট থেকে প্রায় ৫০০ টন ইলিশ বাংলাদেশে এসেছে। আরও ১৫০ থেকে ২০০ টন ইলিশ শিগগিরই আসতে পারে। আমদানি করা এসব ইলিশের বেশির ভাগই পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া পাইকারি মাছবাজার হয়ে গুজরাটের ভরুচ থেকে বাংলাদেশে গেছে।

একসময় যে বাংলাদেশের ইলিশ ভারতের বাজারে বিশেষ আকর্ষণের পণ্য ছিল, সেই বাংলাদেশের বাজারেই এখন ভারতীয় ইলিশ ঢুকছে। মৎস্য বিশেষজ্ঞদের কাছে বাণিজ্যের এই বিপরীতমুখী প্রবাহ বিস্ময়কর হলেও গত দুই বছরে দেশে ইলিশের উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে এসেছে বলে তাঁরা মনে করছেন।

দেশে কমছে উৎপাদন, গুজরাটে বাড়ছে : মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৭ সাল থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছর পর্যন্ত বাংলাদেশে ইলিশ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক ছিল। কিন্তু ২০২৩-২৪ ও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো উৎপাদন প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক হয়ে যায়। ওই দুই অর্থবছরে ইলিশের উৎপাদন কমেছে যথাক্রমে ৭ দশমিক ৩৩ শতাংশ ও ৫ দশমিক ৫১ শতাংশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে প্রায় ৫ লাখ টন ইলিশ উৎপাদিত হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের উৎপাদনের তথ্য এখনো প্রকাশ করেনি মৎস্য অধিদপ্তর। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ওই বছর উৎপাদন আরও কমেছে। অন্যদিকে ভারতে ইলিশ উৎপাদন বাড়ছে। হিন্দুস্তান টাইমসের ১৫ সেপ্টেম্বরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে গুজরাটে ইলিশের উৎপাদন বেড়ে ১৪ হাজার ৫৮৭ দশমিক ৭২ টনে দাঁড়িয়েছে, যা চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর মধ্যে শুধু ভরুচেই উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৭ হাজার ৪১০ টন। নর্মদা নদীতে ইলিশের আহরণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়াকে গুজরাটে উৎপাদন বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ভারতের বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গের মাছ ব্যবসায়ীরা প্রতিবছর গুজরাট থেকে ৫০০ থেকে ৭০০ টন ইলিশ সংগ্রহ করেন। এবার সেই সরবরাহের একটি অংশ বাংলাদেশেও আসছে।

‘গুজরাটের ইলিশে ডিম বেশি, স্বাদ কম’: হাওড়া হোলসেল ফিশ ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক সৈয়দ আনোয়ার মাকসুদ গত ১৭ সেপ্টেম্বর বলেন, গুজরাটের ইলিশে ডিমের পরিমাণ বেশি হলেও স্বাদ বাংলাদেশের পদ্মা-মেঘনা নদীব্যবস্থার ইলিশের মতো নয়। তিনি বলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশের পদ্মার ইলিশের চাহিদা অনেক বেশি। গুজরাটের ইলিশে ডিম বেশি হলেও পদ্মার ইলিশের তুলনায় স্বাদ কম। তবে গুজরাটে অতিরিক্ত উৎপাদন হলে মাঝে মাঝে বাংলাদেশে এই ইলিশ রপ্তানি করা হয়।’ বাংলাদেশ ফিশ এক্সপোর্টার্স অ্যান্ড ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. নিজাম উদ্দিন অবশ্য মনে করেন, দেশীয় উৎপাদন কমে যাওয়ার মধ্যে আমদানি বাজারে ইলিশের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করছে।

তিনি বলেন, ‘এখন ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টাকায় এক কেজি ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে। আমদানি না হলে দেশীয় উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণে দাম ২ হাজার ৭০০ থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত উঠে যেত।’

উৎপাদন কমার কারণ কী : দেশে ইলিশের উৎপাদন কমে যাওয়ার পেছনে জাটকা রক্ষায় দুর্বল আইন প্রয়োগ, নদীদূষণ ও পলি জমাকে দায়ী করছেন মৎস্য বিশেষজ্ঞরা। নিজাম উদ্দিন বলেন, জাটকা আহরণ বন্ধে আইন প্রয়োগ যথাযথ না হওয়ায় ইলিশের উৎপাদনে এর প্রভাব পড়ছে।