আগ্রাসি হয়ে উঠছে ডেঙ্গু

মৌসুমে দেশে ডেঙ্গু জ্বর পরিস্থিতি ক্রমেই আগ্রাসী হয়ে উঠছে। প্রতিদিনই ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৫৯৩ জন। একই সময়ে মৃত্যু হয়েছে ছয়জনের। এডিস মশার কামড়ে প্রতিদিন ঝড়ছে তরতাজা প্রাণ। সাধারণত জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সময়কালকে ডেঙ্গুর মৌসুম হিসাবে ধরা হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গতকালের ডেঙ্গুবিষয়ক প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত ২৪ ঘণ্টায় (গত শনিবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত) হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ১ হাজার ৫৯৩ রোগীর মধ্যে ৬৩ শতাংশ পুরুষ এবং ৩৭ শতাংশ নারী। একই সময়ে মারা যাওয়া ছয়জনের মধ্যে পাঁচজন পুরুষ এবং একজন নারী। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে গতকাল পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৬১ হাজার ৯৭২ জন। এ সময়ে মৃত্যু হয়েছে ১৮৪ জনের। সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন ৫৭ হাজার ৬১০ জন।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘আগামী অক্টোবর মাসে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে। ডেঙ্গুর পরিস্থিতি নিয়ে একটি পূর্বাভাস মডেল তৈরি করে পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। সেই মডেলের তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবর মাসে দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বাড়তে পারে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিভিন্ন সময়ে পরিচালিত পরীক্ষায় দেখা গেছে, এডিস মশা শুধু দিনের বেলাতেই নয়, রাতেও মানুষকে কামড়ায়। এডিস মশা সহজে দৃশ্যমান না হওয়ায় মানুষ অনেক সময় এটিকে গুরুত্ব দেন না। তাই মানুষের সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।’

আক্রান্তে পুরুষের আধিক্য, মৃত্যুর চিত্র উল্টো : চলতি বছর ডেঙ্গু আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যা নারীর তুলনায় অনেক বেশি। মোট আক্রান্ত ৬১ হাজার ৯৭২ জনের মধ্যে পুরুষ ৩৮ হাজার ৬৬৮ জন এবং নারী ২৩ হাজার ৬৩ জন। অর্থাৎ আক্রান্তদের প্রায় ৬২ দশমিক ৬ শতাংশ পুরুষ এবং ৩৭ দশমিক ৪ শতাংশ নারী। কিন্তু মৃত্যুর ক্ষেত্রে চিত্রটি ভিন্ন। চলতি বছরের ১৮৪ মৃত্যুর মধ্যে পুরুষ ৯০ জন এবং নারী ৯৩ জন। অর্থাৎ মোট মৃত্যুর ৪৯ দশমিক ২ শতাংশ পুরুষ এবং ৫০ দশমিক ৮ শতাংশ নারী। ফলে আক্রান্তের অনুপাতে পুরুষ বেশি হলেও মৃত্যুর সংখ্যায় নারীরা একটু বেশি।

গত ২৪ ঘণ্টার মৃত্যুতেও অবশ্য পুরুষের সংখ্যা বেশি ছিল। ছয় মৃত্যুর মধ্যে পাঁচজন পুরুষ ও একজন নারী। মৃতদের মধ্যে ১১-১৫, ২১-২৫, ২৬-৩০, ৩৬-৪০ এবং ৪১-৪৫ বছর বয়সি পুরুষ এবং ২৬-৩০ বছর বয়সি একজন নারী রয়েছেন। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন বলেছেন, ‘আগামী ৩ মাসের মধ্যে ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে। ডেঙ্গু নিয়ে ডিএনসিসি কাজ করছে। এই কার্যক্রমের আওতায় প্রতিদিন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি, ডেঙ্গুর এডিস মশার লার্ভা ধ্বংস, ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান ও জরিমানা করা হচ্ছে।’ গতকাল গাবতলীর প্রস্তাবিত কাঁচা বাজারে ডিএনসিসির পরিবহন ডিপোতে ক্যারিয়ার ট্রাকের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন ডিএনসিসি প্রশাসক।

আক্রান্ত ও মৃত্যু লাফিয়ে বাড়ছে : মাসভিত্তিক হিসাবেও ডেঙ্গুর ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা স্পষ্ট। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে জানুয়ারিতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন ১ হাজার ৮১ জন। ফেব্রুয়ারিতে ৪০৯, মার্চে ৩৫৩, এপ্রিলে ৬৪০ এবং মে মাসে ৭১৪ জন ভর্তি হন। এরপর জুন থেকে পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে শুরু করে। জুনে হাসপাতালে ভর্তি হন ২ হাজার ৯০৭ জন। জুলাইয়ে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯ হাজার ২০৬ জনে। আগস্টে এক লাফে ২০ হাজার ৫৩৬ জনে পৌঁছে যায়। আর সেপ্টেম্বরের ২০ দিনেই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২৬ হাজার ১২৬ জন-যা এক মাসের পূর্ণ হিসাব নয়, তবুও আগস্টের পুরো মাসের সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে।

মৃত্যুর মাসভিত্তিক চিত্রেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। জানুয়ারিতে ডেঙ্গুতে দুজনের মৃত্যু হয়। ফেব্রুয়ারিতে দুজন এবং মে মাসে একজন মারা যান। জুনে মৃত্যু বেড়ে দাঁড়ায় ১৩ জনে। জুলাইয়ে ৩৬ জন এবং আগস্টে ৪৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। সেপ্টেম্বরের ২০ দিনেই মারা গেছেন ৮৭ জন।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আবদুস সালাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা কোনোভাবেই চাই না ডেঙ্গুতে মানুষের মৃত্যু হোক। এই রোগের জন্য ৮০ শতাংশ দায়ী মানুষের অসাবধানতা। ডেঙ্গু প্রতিরোধে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি চলছে এবং দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে সিটি করপোরেশনের অনেককে বরখাস্ত করা হয়েছে। সিটি করপোরেশনের পাশাপাশি জনগণকেও সচেতন হতে হবে। মোবাইল কোর্ট বিভিন্ন জায়গায় যাচ্ছে, ফাইন করা হচ্ছে। এটাকে আমরা আরও বাড়াব। তার পরেও যদি শুভবুদ্ধির উদয় না হয়, তাহলে উনাদের আইনের আওতায় নেওয়া ছাড়া বিকল্প নেই।’