ওষুধের প্যাকেটে সৌদি আরবে ইয়াবা পাচার

সৌদি আরবগামী সাধারণ প্রবাসীদের হাতে ওষুধের নামে তুলে দেওয়া হচ্ছে ইয়াবার প্যাকেট। বাহক জানেনই না তাঁর লাগেজে মাদক রয়েছে।সৌদিতে পৌঁছানোর পর সেই চালান গ্রহণ করেন চক্রের সদস্যরা। চাঁদপুরের শাহরাস্তিতে পর পর দুটি চালান ধরা পড়ার পর এমন একটি সংঘবদ্ধ চক্রের সন্ধান
পাওয়া গেছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দুই চালানে উদ্ধার হয়েছে ৫২০টি ইয়াবা। এই চক্রটির মূল হোতা হিসেবে উঠে এসেছে শাহরাস্তির বাসিন্দা আরিফ হোসেন, মাহমুদুল হাসান ও মহিন উদ্দিনের নাম। তাঁদের মধ্যে আরিফ বর্তমানে দেশে অবস্থান করছেন। মাহমুদুল ও মহিন আছেন সৌদি আরবে।

অনুসন্ধানে পুলিশের তথ্য ও কয়েকটি কথোপকথনের অডিও বিশ্লেষণে জানা গেছে, এই তিনজনই বিভিন্ন সময়ে সৌদিতে প্রবাসীদের কাছ থেকে মাদকের চালান গ্রহণ করেন। দেশে থাকা সহযোগী ও পরিবারের সদস্যদের দিয়ে ওষুধের প্যাকেটে ইয়াবা ভরে যাত্রীর কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। চালান পৌঁছে দেওয়ার বিনিময়ে দেওয়া হয় ২০ হাজার টাকা। তবে অনেকেই ওষুধের চালান নিয়ে গেছেন ভেবে সেই টাকার ভাগ পান না।

ওষুধ বলে দেওয়া হয় ইয়াবা :

শাহরাস্তির টামটা ছৈয়াল বাড়ির সুজন মিয়া গত ২৭ আগস্ট সৌদি আরব যান। এর পাঁচ দিন আগে তাঁর সঙ্গে ফেসবুক মেসেঞ্জারে যোগাযোগ করেন একই এলাকার মাহমুদুল হাসান ওরফে হাসান।

মাহমুদুল ওই সময় জানতে চান, সুজন সৌদি আরব যাচ্ছেন কি না। সুজন হ্যাঁ বললে তিনি কিছু ওষুধ নেওয়ার অনুরোধ করেন। মাহমুদুল সুজনকে বলেন, ‘সৌদি আরবে ওষুধের দাম অনেক বেশি। তোমার খুব বেশি অসুবিধা না হলে আমার আধা কেজির মতো ওষুধের প্যাকেটটা নিয়ে আসো।’ পুলিশ ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ফিনিক্স-২০ ও গ্যাস্ট্রিকের ওষুধের প্যাকেটে বিশেষ কৌশলে ১৬০টি ইয়াবা লুকানো হয়েছিল। প্যাকেটটি সুজনের কাছে পৌঁছে দিতে যাচ্ছিলেন আব্দুর রাজ্জাক ওরফে অনিক ও আরিফ।

গোপন সংবাদের ভিত্তিতে শাহরাস্তি থানার পুলিশ মুন্সি গাজী পাটোয়ারী বাড়ির পশ্চিম পাশের সড়কে অভিযান চালায়। ইয়াবাসহ অনিককে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে অভিযানের সময় আরিফ দৌড়ে পালিয়ে যান বলে দাবি পুলিশের। এ ঘটনায় গত ২৫ আগস্ট শাহরাস্তি থানার উপপরিদর্শক মাহবুবুল আলম বাদী হয়ে থানায় একটি মামলা করেন। অনিককে আসামি করার পাশাপাশি অজ্ঞাতপরিচয় আরো কয়েকজনকে মামলায় রাখা হয়।

থানা সূত্রে জানা গেছে, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অনিক পুলিশকে জানান, বিদেশে পাচারের জন্যই ওষুধের প্যাকেটে ইয়াবাগুলো লুকানো হয়েছিল। তিনি ও তাঁর সহযোগীরা সেগুলো সুজনের কাছে পৌঁছে দিতে যাচ্ছিলেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে শাহরাস্তি থানার ওসি মীর মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘অনিককে ১৬০টি ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে। এই চক্রের সঙ্গে আরিফ ও মাহমুদুলের সংশ্লিষ্টতা গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। চক্রের অন্য সদস্যদের শনাক্ত করতে অনিককে রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করা হয়েছে।’

এর আগে একই কৌশলে আরেক সৌদিপ্রবাসীর কাছে ৩৬০টি ইয়াবা পাঠানোর চেষ্টা করা হয়। গত ১ আগস্ট শাহরাস্তির ভোলদিঘী বাজারে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সন্দেহে চালানটি ধরা পড়ে। অভিযোগ অনুযায়ী, সৌদিপ্রবাসী আরিফ হোসেনের স্ত্রী রুনা আক্তার একটি প্যাকেট হাক্কানী ট্রেডার্সের পরিচালক এনায়েত হোসেনের কাছে দেন। সেটি মালড়া গ্রামের সৌদিগামী রাশেদের কাছে পৌঁছানোর কথা ছিল।

প্যাকেটের ওজন ও আকার দেখে এনায়েতের সন্দেহ হয়। তিনি একা সেটি না খুলে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ডাকেন। এরপর ভিডিও ধারণ করে সবার সামনে প্যাকেটটি খোলা হয়। ভেতরে ফিনিক্স-২০ ও র‌্যাবিপ্রাজল সোডিয়ামের ১২টি প্যাকেট পাওয়া যায়। ওষুধ সরিয়ে প্রতিটি প্যাকেটে ৩০টি করে ইয়াবা রাখা হয়েছিল। মোট ইয়াবা ছিল ৩৬০টি।

খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে ইয়াবাগুলো জব্দ করে। পরে বেলাল হোসেন নামের একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ঘটনার পর রুনা আত্মগোপন করেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। সেদিনের ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে এনায়েত হোসেন বলেন, ‘প্যাকেটটি দেখে আমার সন্দেহ হয়েছিল। তাই আশপাশের লোকজনকে ডেকে ভিডিও চালু করে সেটি খুলি। ওষুধের আবরণ সরিয়ে ভেতরে এমনভাবে ইয়াবা রাখা হয়েছিল, বাইরে থেকে বোঝার উপায় ছিল না।’

সৌদিপ্রবাসী রাশেদ বলেন, আরিফ তাঁকে ফোন করে কয়েকটি ওষুধ নেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন। পরে আরিফের স্ত্রী প্যাকেটটি তাঁর বাড়িতে নিয়ে যান। তিনি সেটি বাড়িতে না রেখে বাজারের কোনো দোকানে রাখতে বলেন।

রাশেদ বলেন, ‘প্যাকেটটি ধরা না পড়লে আমি জানতেই পারতাম না, আমাকে দিয়ে ইয়াবা পাচারের পরিকল্পনা হয়েছিল। এটি নিয়ে বিমানবন্দরে ধরা পড়লে আমার কী হতো? আমার পরিবারেরই বা কী অবস্থা হতো?’

সৌদিতে চালান গ্রহণ করেন তিনজন :

অনুসন্ধানে জানা গেছে, চক্রটি সৌদি আরবগামী প্রবাসীদের আগেই শনাক্ত করে। পরে পরিচিত ব্যক্তি বা এলাকার লোক হিসেবে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। সৌদিতে ওষুধের দাম বেশি—এমন কথা বলে ছোট প্যাকেট নেওয়ার অনুরোধ করা হয়।

দেশে থাকা সহযোগীরা ওষুধের পাতা বা মোড়ক থেকে ওষুধ সরিয়ে সেখানে ইয়াবা রাখেন। এরপর সেটি এমনভাবে প্যাকেট করা হয়, যাতে বাইরে থেকে বোঝা না যায়। সৌদিতে পৌঁছানোর পর আরিফ, মাহমুদুল ও মহিনের মধ্যে কেউ চালান গ্রহণ করেন বলে একাধিক প্রবাসী জানিয়েছেন।

আরিফ বর্তমানে দেশে থাকলেও এর আগে সৌদিতে অবস্থান করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, সেখানে তিনিও প্রবাসীদের কাছ থেকে মাদকের চালান গ্রহণ করতেন। বর্তমানে সৌদিতে থাকা মাহমুদুল ও মহিন একই কাজ করছেন। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, চক্রটির সদস্যদের ভূমিকা এক জায়গায় সীমাবদ্ধ নয়। তাঁরা কখনো সৌদিগামী যাত্রী খোঁজেন। কখনো দেশে সহযোগীদের দিয়ে প্যাকেট প্রস্তুত ও পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। আবার সৌদিতে চালান গ্রহণ ও বিক্রিও করেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক সৌদিপ্রবাসী বলেন, ২০২৪ সালে দেশে আসার পর মহিন তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। সৌদি ফেরার সময় কিছু ওষুধ নেওয়ার অনুরোধ করেন। তাড়াহুড়ার কারণে তিনি সেগুলো নেননি। পরে জানতে পারেন, এলাকার সৌদিগামী প্রবাসীদের ওষুধের কথা বলে ইয়াবা বহনে ব্যবহার করা হচ্ছে। হাতে আসা একটি অডিওতে মাহমুদুলের স্ত্রী নুসরাতকে বলতে শোনা যায়, তাঁর স্বামী সৌদিগামী কারো সন্ধান পেলে জানানোর কথা বলেছিলেন। পরে মহিন একটি চালান পাঠানোর বিনিময়ে ২০ হাজার টাকা দেওয়ার প্রস্তাব দেন।

নুসরাতকে বলতে শোনা যায়, তিনি স্বামীকে এই কাজ থেকে বিরত থাকার অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু তাঁর কথা না শুনে অনিকের মাধ্যমে সুজনের কাছে চালান পাঠানো হয়। পথে অনিক গ্রেপ্তার হন। ওই অডিওতে নুসরাত বলেন, যাঁদের মাধ্যমে এসব চালান পাঠানো হয়, তাঁদের বেশির ভাগই জানেন না প্যাকেটে ওষুধ, নাকি ইয়াবা। ঋণ ও ধারদেনা করে বিদেশে যাওয়া একজন প্রবাসী ধরা পড়লে তাঁর জীবন ও পরিবার ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক প্রবাসী জানান, চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে সৌদিগামী যাত্রীদের ব্যবহার করছে। দেশ থেকে মাদক পাঠানোর পাশাপাশি ফেরার সময় স্বর্ণ আনার অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। সৌদি আরবে মাদক কেনাবেচাসহ বিভিন্ন অপরাধে চক্রটির সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ করেছেন তাঁরা।

আরেকটি অডিও কথোপকথনে মাহমুদুলকে বলতে শোনা যায়, তিনি প্রায় ছয় বছর ‘মাল’ (ইয়াবা) বিক্রি করেছেন। তবে সাম্প্রতিক চালানের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি। অনিককে চেনেন না বলেও দাবি করেন। সুজনকে মেসেঞ্জারে বার্তা দেওয়ার কথা স্বীকার করলেও সেটি ইয়াবার জন্য ছিল না বলে জানান।

একই অডিওতে মহিন উদ্দিনকে এক প্রবাসীকে হুমকি দিতে শোনা যায়। তিনি বলেন, ‘তোরে বলছিলাম আমার বিষয়ে কোনো মহিলার সঙ্গে কথা না বলতে। তুই তবু কেন বলছস? তোর সঙ্গে আমার কথা হবে সামনাসামনি।’

এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের কর্মকর্তা রাকিব হাসান বলেন, বিমানবন্দরকেন্দ্রিক মাদক চোরাচালান, মানবপাচার ও অন্যান্য অপরাধ প্রতিরোধে তাঁদের বিশেষ দল কাজ করছে। সম্প্রতি এক যাত্রীর কাছ থেকে চার হাজার ৩৬৪টি ইয়াবা উদ্ধারের কথাও জানান তিনি।

রাকিব হাসান বলেন, ‘মাদকের বিরুদ্ধে আমরা সব সময় সতর্ক। বিদেশে মাদকপাচারের সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি।