অ্যান্টার্কটিকায় শীতকালেও বরফ সংকট, বিজ্ঞানীদের সতর্ক বার্তা

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আবারও চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে অ্যান্টার্কটিকা। মহাদেশটির শীতকালীন সমুদ্রের বরফের বিস্তার রেকর্ড করা চালুর পর থেকে এ বছর তৃতীয় সর্বনিম্ন স্তরে নেমে এসেছে। বিজ্ঞানী ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, সমুদ্র বরফের অভাব এখন আর ভবিষ্যতের কোনো সংকট নয়, এটি বর্তমানেরই এক মারাত্মক সমস্যায় পরিণত হয়েছে।

উপগ্রহ তথ্যের ভিত্তিতে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত করেছেন যে, গত ১৪ সেপ্টেম্বর অ্যান্টার্কটিকার বরফের সর্বোচ্চ বিস্তার ছিল ১ কোটি ৭৫ লাখ ৯০ হাজার বর্গকিলোমিটার। দীর্ঘমেয়াদি গড়ের তুলনায় এই পরিমাণ প্রায় ১০ লাখ বর্গকিলোমিটার কম, যা আয়তনে স্পেনের মতো দুটি দেশের আয়তনের সমান। এই ঘোষণার ফলে এটি স্পষ্ট হয়ে উঠল যে, অ্যান্টার্কটিকায় সর্বনিম্ন সমুদ্র বরফের শীর্ষ চারটি ঘটনা গত চার বছরেই ঘটেছে।

বিশ্ববিদ্যালয় অব কলোরাডোর ন্যাশনাল স্নো অ্যান্ড আইস ডাটা সেন্টারের জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী ড. ওয়াল্ট মেয়ার জানান, অ্যান্টার্কটিকার বরফের পরিবর্তনশীল প্রকৃতির কারণে তারা সর্বোচ্চ পরিমাপ ঘোষণা করার ক্ষেত্রে কিছুটা সময় নিচ্ছিলেন। তবে ১৪ সেপ্টেম্বরের পর থেকে বরফের পরিমাণ টানা কমতে থাকায় তারা নিশ্চিত হয়েছেন যে বরফ বৃদ্ধির সর্বোচ্চ সীমা অতিক্রম করেছে।

অ্যান্টার্কটিকার সমুদ্র বরফ প্রতি বছর গ্রীষ্মে প্রায় ২০ লাখ বর্গকিলোমিটারের নিচে নেমে যায় এবং শীতকালে বেড়ে ১৭ লাখ বর্গকিলোমিটার ছাড়িয়ে যায়। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চরম বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে শীত ও গ্রীষ্ম উভয় মৌসুমেই বরফ গলে নতুন রেকর্ড গড়ছে।

মেলবোর্নের মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাউদার্ন ওশান বিশেষজ্ঞ ড. আরিয়ান পিউরিচ বলেন, পরপর চার বছর সর্বনিম্ন বরফ পাওয়া এটাই প্রমাণ করে যে পুরো জলবায়ু ব্যবস্থা বদলে গেছে। এটি কোনো একক বা সাময়িক ঘটনা নয়, বরং বরফের আচরণ বদলে যাওয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত। এটি ভবিষ্যতের নয়, আজকের সমস্যা।

চলতি বছরের জুনে অ্যান্টার্কটিক উপদ্বীপে স্বাভাবিকের চেয়ে ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় এবং সাগরের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে জমে থাকা বরফের জায়গায় খোলা পানি দৃশ্যমান হতে দেখা যায়। এছাড়া আগস্টের শুরুতে আমুন্ডসেন সাগরেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বরফ কমে যায়। ড. পিউরিচ এবং অস্ট্রেলিয়ার আবহাওয়া ব্যুরোর ড. ফিল রিড জানান, প্রশান্ত মহাসাগরের এল নিনো জলবায়ু প্রবাহ এবং বায়ুপ্রবাহের পরিবর্তনের কারণে বরফ ক্ষয় ত্বরান্বিত হয়েছে। তবে এল নিনো ছাড়াও সমুদ্রের পানির উচ্চ তাপমাত্রার কারণে বরফ গলছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

বিজ্ঞানীদের মতে, বরফ কমে যাওয়ায় উন্মুক্ত মহাসাগর আরও বেশি তাপ শোষণ করবে। ভাসমান এই বরফ গলে সরাসরি সমুদ্রের উচ্চতা না বাড়ালেও, উপকূলীয় হিমবাহকে সুরক্ষিত রাখা আইস শেলফগুলোকে দুর্বল করে দেয়। আইস শেলফ ধ্বংস হলে মহাদেশের বিশাল বরফখণ্ড মহাসাগরে গিয়ে মিশবে এবং সমুদ্রের উচ্চতা কয়েক মিটার পর্যন্ত বাড়িয়ে দিতে পারে। এছাড়া এটি অ্যালগি, ক্রিল এবং এম্পেরর পেঙ্গুইনসহ বহু জলজ প্রাণীর প্রজনন ও আবাস্থল মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলছে।

তাসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বরফ বিশেষজ্ঞ ড. উইল হবস জানিয়েছেন, চূড়ায় পৌঁছানোর পর থেকে অ্যান্টার্কটিকার সমুদ্রের বরফ স্বাভাবিকের চেয়ে দ্রুত গতিতে কমছে। যদি আগামী গ্রীষ্মেও রেকর্ড পরিমাণ বরফ গলে যায়, তবে সংকট আরও ঘনীভূত হবে। বৈশ্বিক জলবায়ু ব্যবস্থা বরফ হারানোর প্রতি কতটা সংবেদনশীল, তা নিশ্চিত করার আগেই জলবায়ু পরিবর্তনের গতি আমাদের বোঝার ক্ষমতাকে ছাপিয়ে যাচ্ছে।

সূত্র: গার্ডিয়ান