ইনকিলাব থেকে যেভাবে অমিতাভ

অমিতাভ বচ্চনের ওপরে সম্প্রতি প্রকাশিত বই ‘অমিতাভ বচ্চন দ্য ফরএভার স্টার’-এর লেখক প্রদীপ চন্দ্রা বলছিলেন, ‘যেদিন অমিতাভ বচ্চনের জন্ম হলো, সেদিনই তাঁদের বাড়িতে থাকতে এসেছিলেন হিন্দি ভাষার প্রখ্যাত কবি সুমিত্রানন্দন পন্থ। তিনি অন্য কারও বাড়িতে উঠেছিলেন। অমিতাভের বাবা হরিবংশ রাই বচ্চন দেখা করতে গিয়েছিলেন তাঁর সঙ্গে। তিনি মি. পন্থকে বলেন, এখানে আছেন কেন, আপনি আমাদের বাড়িতে চলুন। মি. পন্থ রাজি হয়ে গেলেন বচ্চন পরিবারের সঙ্গে থাকতে। সেদিনই শিশুসন্তান এসেছে বাড়িতে। সদ্যোজাত শিশুটিকে দেখার পরে সুমিত্রা নন্দন পন্থ তার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘এর নাম তো অমিতাভ হওয়া উচিত।’ আর পণ্ডিত অমরনাথ ঝাঁ শিশুটির নাম রেখেছিলেন ইনকিলাব। কিন্তু সেই নাম বেশি দিন থাকেনি। বচ্চন পরিবার অমিতাভ নামটাকেই বেছে নিয়েছিলেন,’ বিবিসিকে বলছিলেন প্রদীপ চন্দ্রা।

প্রথমে অভিনয় নাটকে-

নৈনিতালের শেরউড স্কুলে পড়াশোনার পরে অমিতাভ দিল্লি চলে আসেন, ভর্তি হন কিরোরিমল কলেজে। সেখানেই নাটক করার প্রচুর সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। কলেজের ড্রামা সোসাইটির প্রধান ফ্র্যাঙ্ক ঠাকুরদাস অমিতাভ বচ্চনের সেই গুরুগম্ভীর গলার স্বরে অভিভূত হয়ে গিয়েছিলেন। একদিনের ঘটনা, সেই সময়ের নামকরা থিয়েটার অভিনেতা প্রতাপ শর্মার ভাইকে একটা নাটকের প্রধান চরিত্রের জন্য বাছা হয়েছিল। কোনো এক ব্যক্তিগত কাজের জন্য শেষ মুহূর্তে তিনি নাটকে অভিনয় করতে অপারগ বলে জানান। ফ্র্যাঙ্ক ঠাকুরদাসের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। প্রধান চরিত্রটা তাহলে কাকে দিয়ে করাবেন? অমিতাভ বচ্চন এগিয়ে গিয়েছিলেন ওই চরিত্রে অভিনয় করার জন্য। রাজি হয়ে গেলেন ঠাকুরদাস। আর সুযোগটা কাজে লাগিয়ে অমিতাভ বচ্চন অসাধারণ অভিনয় করলেন।

৪৬০ টাকা বেতনের চাকরি

বিএ পাস করার পর অমিতাভ বচ্চন কলকাতায় বার্ডস অ্যান্ড কোম্পানিতে চাকরি নেন। সেটা ছিল গত শতাব্দীর ষাটের দশক। বার্ডস কোম্পানির কয়লা খনি, চটকল, কাগজ কলসহ বিভিন্ন ব্যবসা ছিল। কলকাতার ডালহৌসি এলাকায় মহাকরণের কাছেই ছিল ওই কোম্পানির সদর দপ্তর। ১৯৭৪ সালে ওই কোম্পানি সরকার অধিগ্রহণ করে। তাদের হাতে রয়ে যায় শুধু চটকলের ব্যবসা। ২০১১ সালে অমিতাভ বচ্চন টুইট করেছিলেন পুরোনো সেই দিনের কথা মনে করে। ‘কলকাতা… তখনকার ক্যালকাটা… প্রথম চাকরি বার্ড অ্যান্ড কোং-এ.. বেতন ৫০০ টাকা প্রতি মাসে, কেটে কুটে ৪৬০ টাকা।’ দুই বছর পরে আরেকটা সংস্থা ব্ল্যাকার অ্যান্ড কোম্পানিতে যোগ দেন তিনি। সেখানে তাঁর বেতন তো বেড়েছিলই, সঙ্গে অফিস যাতায়াতের জন্য একটা মরিস মাইনর গাড়িও দেওয়া হয়েছিল।

প্রথম সিনেমায় ৫ হাজার টাকা-

অমিতাভকে প্রথম সিনেমায় নেন প্রখ্যাত চিত্র পরিচালক খাজা আহমেদ আব্বাস। পরিচালক টিনু আনন্দের বন্ধু নীনা সিং মি. আনন্দকে অনুরোধ করেছিলেন যে অমিতাভ বচ্চনের কিছু ছবি যেন তিনি মি. আব্বাসকে দেখান। আব্বাস সাহেব বললেন, ডাকো একে। দুই ভাই অমিতাভ আর অজিতাভ কলকাতা থেকে মুম্বাই গেলেন দেখা করতে। প্রথমে তাঁরা টিনু আনন্দের সঙ্গে দেখা করেন। টিনু আনন্দ তাঁকে আব্বাস সাহেবের কাছে নিয়ে যান। তাঁর পছন্দ হয়ে গেল। অমিতাভ বেরিয়ে যাওয়ার পরে আব্বাস সাহেব বলেন একে বলে দাও যে ছবিতে নেব, কিন্তু পাঁচ হাজার টাকা দিতে পারব। এটা বলতে পারব না যে ছবিটা তৈরি হতে পাঁচ মাস লাগবে না একবছর”, বলছিলেন প্রদীপ চন্দ্রা।

১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ এ অমিতাভ তাঁর প্রথম ছবি ‘সাত হিন্দুস্তানি’র জন্য চুক্তি সই করেন। প্রথম ছবির জন্যই অমিতাভ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছিলেন।

উত্তম কুমারের পরিবর্তে অমিতাভ

একবার খাজা আহমেদ আব্বাসের সঙ্গে অমিতাভ বচ্চন হৃষিকেশ মুখার্জির বাড়িতে গিয়েছিলেন। সেই সময়ে মি. মুখার্জি তাঁর পরবর্তী ছবি ‘আনন্দ’-এর জন্য একজন অভিনেতা খুঁজছিলেন। অমিতাভ বচ্চনকে দেখেই তিনি বুঝলেন যে তিনি তাঁর ‘বাবুমশায়’ খুঁজে পেয়েছেন। এর আগে ওই চরিত্রের জন্য তিনি উত্তম কুমারকে নেওয়ার কথা ভাবছিলেন।

পরে এক সাক্ষাৎকারে হৃষিকেশ মুখার্জি বলেছিলেন, ‘অমিতাভের গম্ভীর গলার আওয়াজ আর তার চাহনির জন্য আমি তাকে বেছেছিলাম। আমার বলতে কোনো দ্বিধা নেই, ওই ছবিতে অমিতাভ রাজেশ খান্নার থেকেও ভালো অভিনয় করেছিল।’

১৯৭৩ সালে সুপারহিট-

বলিউডের বিখ্যাত চিত্রনাট্যকার জাভেদ আখতার বলেছিলেন, প্রকাশ মেহেরা যখন ‘জঞ্জির’ বানাচ্ছেন, তখন ধর্মেন্দ্র, রাজকুমার আর দেবানন্দ কোনো না কোনো অজুহাত দেখিয়ে ছবিতে কাজ করতে চাইলেন না। ‘অমিতাভের কথা জাভেদ আখতারের মনে আসে। তিনি অমিতাভের যেসব ছবি চলেনি, সেগুলো মন দিয়ে দেখলেন। তাঁর মনে হলো খুবই শক্তিশালী অভিনেতা, কিন্তু তাঁর ছবিগুলো চলছে না কেন!’ বলছিলেন মি. চন্দ্রা। জঞ্জিরের অন্যতম কাহিনিকার ছিলেন জাভেদ আখতার। আরেকজন হলেন সেলিম খান।

তাঁর কথায়, কোনোভাবে ফোন নম্বর জোগাড় করে একদিন জাভেদ আখতার অমিতাভকে ফোন করেন। একটা ছবির গল্প শোনার জন্য অনুরোধ করেন অমিতাভকে। গল্পটা শোনানোর আগে জাভেদ আখতার তাকে বলেন, একটাই অনুরোধ এই ছবিটা করতে আপনি আপত্তি করবেন না। গল্পটা শোনার পরে তাঁর খুব পছন্দ হয়ে যায়, কিন্তু আবার সন্দেহ দানা বাঁধে যে, তিনি চরিত্রটা করতে পারবেন তো আদৌ? জাভেদ সাহেবকে জিজ্ঞাসাও করেছিলেন অমিতাভ যে তার কী সত্যিই মনে হয় যে তিনি চরিত্রটা ঠিক করে করতে পারবেন? জবাবে জাভেদ আখতার বলেছিলেন এই চরিত্রটা শুধু আপনিই করতে পারবেন। সেলিম খানকে জাভেদ আখতার জানালেন, অমিতাভ রাজি হয়েছেন, প্রকাশ মেহেরার কাছে গেলেন দুজনে। পরের দিন প্রকাশ মেহেরাকে নিয়ে জাভেদ আখতার আর সেলিম খান গেলেন রূপতারা স্টুডিওতে। সেখানে অমিতাভ বচ্চন, জিতেন্দ্র আর হেমা মালিনী শুটিং করছিলেন। সেখানেই কথা পাকা হয়ে গেল আর চুক্তি সই হয়ে গেল, বলছিলেন প্রদীপ চন্দ্রা। ১৯৭৩ সালে রিলিজ হওয়া জঞ্জির সুপার হিট হয়ে গেল। ফিল্মফেয়ার পুরস্কারে নয়টা আলাদা ক্যাটেগরিতে নমিনেশন পেল ছবিটা। এ ছবিটাই একজন অভিনেতাকে সুপারস্টার বানিয়ে দিল। এখান থেকেই তাঁর ‘অ্যাংরি ইয়াং ম্যান’ ভাবমূর্তির শুরু। সারা দেশে শুরু হলো তাঁকে নিয়ে উন্মাদনা। তবে অমিতাভ বচ্চন নিজে মনে করেন যে, তাঁর ওই অ্যাংরি ইয়াং ম্যান ভাবমূর্তিটা শুরু হয়েছিল ১৯৭৩ এই রিলিজ হওয়া হৃষিকেশ মুখার্জির চলচ্চিত্র ‘নেমকহারাম’ থেকে। সেই অ্যাংরি ইয়াং ম্যান আজ ৮৪ পেরিয়ে ৮৫-তে পা রাখলেন।