নিয়োগের কোটা পূরণে অপহরণ, জোরপূর্বক নিয়োগ ও অর্থের বিনিময়ে তরুণদের এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় হস্তান্তরের অভিযোগ উঠেছে মিয়ানমারের জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে। সামরিক বাহিনীতে লোকবলসংকটের সুযোগে গড়ে উঠেছে নিয়োগের অবৈধ বাণিজ্য। সবচেয়ে বেশি বিপাকে দরিদ্র পরিবারের তরুণেরা।
দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় কারেন রাজ্যের রাজধানী হপা-আনে সন্ধ্যার পর রাস্তায় বের হতে ভয় পান তরুণেরা। বিশেষ করে যাদের বয়স কম এবং শারীরিকভাবে সক্ষম, তাদের জন্য রাতের বেলা বাইরে থাকা এখন প্রায় নিষিদ্ধের মতো। গত কয়েক মাসে শহরটিতে এমন আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
কিন্তু ২৬ বছর বয়সী টুকটুকচালক জাও মিনের (নিরাপত্তার কারণে ছদ্মনাম) ঘরে বসে থাকার সুযোগ নেই। জীবিকার তাগিদে তাকে প্রতিদিন রাস্তায় নামতে হয়। আর প্রতিবার বের হওয়ার সময় পরিবারের সদস্যরা তাকে সতর্ক করে দেন- যাত্রী নিয়ে বেশি দূরে যাওয়া যাবে না, কাকে গাড়িতে তোলা হচ্ছে, সে বিষয়ে সাবধান থাকতে হবে।
জাও মিন বলেন, “আমি চরম উদ্বিগ্ন থাকি, কিন্তু কাজের জন্য আমাকে বের হতেই হয়। পরিবারের লোকজন বারবার ফোন করে সতর্ক করেন। সব সময় সতর্ক থাকতে হয়।”
তার ভাষায়, “মানুষ আতঙ্কিত ও ভীত। আমার পরিচিত কয়েকজনকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।”
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, মিয়ানমারের সামরিক জান্তার সাদাপোশাকধারী সদস্য ও সমর্থকেরা হপা-আনের রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তারা নির্বিচারে কিশোর, বিশের কোঠার তরুণ এবং ত্রিশের কাছাকাছি বয়সী পুরুষদের আটক করে সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করছেন।
বিবিসি বার্মিজের দেখা ফাঁস হওয়া নথি অনুযায়ী, বিভিন্ন প্রশাসনিক এলাকায় সেনাবাহিনীর নিয়োগের নির্ধারিত কোটা কঠোরভাবে পূরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী, গণতন্ত্রপন্থী সংগঠন ও বেসামরিক প্রতিরোধ আন্দোলনের বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে জান্তা যখন ক্রমাগত চাপের মুখে, তখন সেনাসদস্যের সংখ্যা বাড়াতেই এ উদ্যোগ।
নিয়োগের ভয়ে ঘরছাড়া তরুণেরা
জাও মিনের ভাইবোনদের মধ্যে তিনিই কেবল বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগের বয়সসীমায় পড়েছেন। তার ভাষ্য, তার বয়সী অনেক তরুণই বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়েছেন। কেউ গেছেন প্রতিবেশী দেশ থাইল্যান্ডে, কেউ আবার দূরের আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। যারা এখনও এলাকায় রয়েছেন, তাদের অনেকের জন্য পরিবারের নির্দেশ- সন্ধ্যা নামার আগেই বাড়ি ফিরতে হবে।
২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নির্বাচিত নেত্রী অং সান সু চিকে ক্ষমতাচ্যুত করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। এরপর থেকেই দেশটিতে রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ চলছে।
অভ্যুত্থানের তিন বছর পর, যুদ্ধক্ষেত্রে একের পর এক পরাজয়, সেনাসদস্যদের মনোবল কমে যাওয়া এবং পলায়নের ঘটনা বেড়ে যাওয়ার মধ্যে ২০২৪ সালে বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ আইন কার্যকর করে জান্তা সরকার। এ আইনে ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী সব পুরুষ এবং ১৮ থেকে ২৭ বছর বয়সী নারীদের অন্তত দুই বছর সামরিক বাহিনীর অধীনে কাজ করার বিধান রাখা হয়। নিয়োগ প্রত্যাখ্যান করলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ডের বিধানও রয়েছে।
মিয়ানমার ডিফেন্স অ্যান্ড সিকিউরিটি ইনস্টিটিউটের (এমডিএসআই) সামরিকবিষয়ক কর্মকর্তা এবং জান্তা ছেড়ে আসা সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর নাউং ইয়ে বলেন, বাধ্যতামূলক নিয়োগ আইন কার্যকর করা সামরিক অভ্যুত্থানের পর বেসামরিক জনগণের ওপর নেওয়া সবচেয়ে কঠোর ও সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপগুলোর একটি।
গত আড়াই বছরে এ ব্যবস্থায় আনুমানিক এক লাখ তরুণকে সেনাবাহিনীতে নেওয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাদের অনেককেই জোরজবরদস্তি, চাঁদাবাজি কিংবা অপহরণের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। হপা-আন এখন সেই অভিযানের নতুন লক্ষ্যবস্তু।
নাউং ইয়ের অভিযোগ, নিরাপত্তা বাহিনী তরুণদের চলাফেরা নজরদারিতে রাখছে, আইন অনুযায়ী নিয়োগযোগ্য হওয়ার অজুহাতে তাদের আটক করছে এবং আটকের ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় করছে। বাড়ির বাসিন্দাদের তালিকা যাচাইয়ের মতো প্রশাসনিক কার্যক্রমের সময়ও তরুণদের গ্রেফতার করা হচ্ছে।
বিবিসি এ প্রতিবেদনে উল্লিখিত জোরপূর্বক নিয়োগ ও সাম্প্রতিক অপহরণের অভিযোগ সম্পর্কে মিয়ানমার সরকারের সামরিক নিয়োগবিষয়ক কেন্দ্রীয় সংস্থার কাছে জানতে চেয়েছিল। তবে কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কোনও মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানায়।
স্বামীকে সেনাবাহিনীতে ‘বিক্রি’, অভিযোগ স্ত্রীর
বাধ্যতামূলক নিয়োগ আইনকে কেন্দ্র করে মিয়ানমারে গড়ে উঠেছে তরুণদের সেনাবাহিনীতে সরবরাহের একটি চক্র। নির্ধারিত কোটা পূরণে প্রশাসনের ওপর চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে নিয়োগকে ঘিরে অর্থ লেনদেন ও অনিয়মের সুযোগও তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ।
এর শিকার হয়েছেন ইয়াঙ্গুনের বাসিন্দা মা মোয়ে সান পান। ২০২৫ সালের ৮ মে সকালে তিনি তার ৩৩ বছর বয়সী স্বামী ফিও ওয়াইকে শেষবারের মতো দেখেছিলেন।
সেদিন স্বামীর সঙ্গে ঝগড়ার পর তিনি বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান। মন খারাপ হওয়ায় বিষয়টি তিনি তার এক আত্মীয়কে জানান। ওই আত্মীয় স্থানীয় ওয়ার্ড প্রশাসন কার্যালয়ে কাজ করতেন। স্ত্রী তাকে স্বামীকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনার অনুরোধ করেন।
এর দুই দিন পর ফিও ওয়াই ফোন করে জানান, তিনি শহরের অন্য প্রান্তে একটি সামরিক নিয়োগকেন্দ্রে রয়েছেন।
মা মোয়ে সান পানের অভিযোগ, তার আত্মীয় প্রথমে ফিও ওয়াইকে ওয়ার্ড প্রশাসন কার্যালয়ে নিয়ে যান। পরে ওই কার্যালয় থেকে তাকে অন্য একটি ওয়ার্ডের কাছে ৪০ লাখ কিয়াটের বিনিময়ে হস্তান্তর করা হয়, যাতে ওই ওয়ার্ড সামরিক নিয়োগের নির্ধারিত কোটা পূরণ করতে পারে। সে সময় ৪০ লাখ কিয়াটের মূল্য ছিল প্রায় ৯০০ মার্কিন ডলার।
বিবিসি ওই মা মোয়ে সান পানের ওই আত্মীয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেনি।
স্বামীকে ফিরিয়ে আনার মরিয়া চেষ্টায় মা মোয়ে সান পান আরও প্রতারণার শিকার হন। কয়েকজন ব্যক্তি তার স্বামীকে মুক্ত করে দেওয়ার মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে তার কাছ থেকে সাড়ে ৪৫ লাখ কিয়াট হাতিয়ে নেন।
যে ওয়ার্ডে ফিও ওয়াইকে পাঠানো হয়েছিল, সেই ওয়ার্ডের প্রশাসক উ মাউং মাউং লুইন পরে বিবিসির কাছে স্বীকার করেন, ফিও ওয়াইকে সামরিক নিয়োগ কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানোর প্রক্রিয়ায় তার ভূমিকা ছিল।
নিজ এলাকার বাইরে থেকে লোক এনে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কোনও ওয়ার্ড নিজেদের নির্ধারিত কোটা পূরণ করতে না পারলে অন্য এলাকা থেকে লোক নেওয়ার ঘটনা ঘটে। তবে এ ধরনের হস্তান্তরে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি। ফিও ওয়াইকে জোর করে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রেও অর্থ লেনদেন হয়নি বলে দাবি করেন।
মা মোয়ে সান পান বলেন, “আমার স্বামী আমাকে জানিয়েছিলেন, তাকে সাহায্য করার কথা বলে কিছু কাগজে সই করানো হয়েছিল।”
তিনি আরও বলেন, “স্বামীকে যদি স্বাভাবিক ও আইনসম্মত প্রক্রিয়ায় সামরিক নিয়োগের জন্য বাছাই করা হতো, তাহলে হয়তো আমি তা মেনে নিতে পারতাম। কিন্তু আমাদের নিজেদের ওয়ার্ড প্রশাসন কার্যালয় তাকে অন্য একটি ওয়ার্ডের কাছে বিক্রি করে দিয়েছে- এটা আমি মেনে নিতে পারি না। আত্মীয়ের ওপর বিশ্বাস করেছিলাম, সেটাও এখন আমার অনুশোচনার কারণ।”
স্বামীকে নিয়ে যাওয়ার পর থেকে মা মোয়ে সান পান দুটি বিষয়ে পুলিশের কাছে অভিযোগ করেছেন- স্বামীকে সামরিক বাহিনীতে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ এবং মুক্ত করে দেওয়ার মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে তার কাছ থেকে সাড়ে ৪৫ লাখ কিয়াট হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনা।
তার দাবি, পুলিশ অভিযোগ গ্রহণ করলেও মানব পাচারের অভিযোগ যুক্ত করতে অস্বীকৃতি জানায়। পুলিশের যুক্তি ছিল, কাউকে বিদেশে বিক্রি করা হলেই কেবল মানব পাচারের মামলা করা যায়।
স্বামী এখন কোথায় আছেন, তা জানেন না মা মোয়ে সান পান।
কোটা পূরণে অপহরণ ও অর্থের বিনিময়ে নিয়োগ
ফিও ওয়াইয়ের ঘটনা জান্তা সরকারের বাধ্যতামূলক নিয়োগব্যবস্থার একটি উদ্বেগজনক দিক তুলে ধরেছে। কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে নিয়োগের চাপ বাড়তে থাকায় স্থানীয় প্রশাসন ও নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে নির্ধারিত কোটা পূরণের জন্য অনিয়মের প্রবণতা তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ।
নিয়োগযোগ্য তরুণের চাহিদা বাড়লেও তাদের পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ায় অবৈধ বাজার গড়ে উঠেছে। নাউং ইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, সড়কের তল্লাশিচৌকিতে তরুণদের আটক করা, কর্মস্থলে যাতায়াতের পথে তাদের গতিবিধি অনুসরণ করে ধরে ফেলা, ভুয়া চাকরির বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ফাঁদে ফেলা এবং জোর করে বাড়িতে ঢুকে লোক ধরে নিয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটছে।
তিনি বলেন, “বাধ্যতামূলক নিয়োগ আইনের আড়ালে এসব জবরদস্তিমূলক আটক ও নিয়োগ অভিযান কার্যত আধুনিক দাসত্ব এবং মানব পাচারের একটি ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে।”
গত আগস্টের শেষ দিকে ইয়াঙ্গুনে চার তরুণকে অপহরণ করে সামরিক নিয়োগের জন্য বিক্রি করার চেষ্টার অভিযোগে অগ্নিনির্বাপণ বিভাগের এক সদস্য এবং তার জামাতাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। অগ্নিনির্বাপণ বিভাগটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন।
অভিযোগ অনুযায়ী, রিজার্ভ ফায়ার ব্রিগেডের ওই ইউনিট কমান্ডার চাকরির সুযোগ দেওয়ার কথা বলে চার তরুণকে প্রলুব্ধ করে নিজের বাড়িতে নিয়ে যান। সেখানে বিশেষভাবে তৈরি কয়েকটি আটককক্ষে তাদের আটকে রাখা হয়। ২৫ আগস্ট পুলিশ বাড়িটিতে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করে।
কাউকে বেআইনিভাবে আটকে রাখার উদ্দেশ্যে অপহরণ বা তুলে নেওয়ার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। এ অপরাধে তার সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। তাকে যেখানে আটক রাখা হয়েছে, সেই থানার সঙ্গে যোগাযোগের একাধিক চেষ্টা করেও সফল হয়নি বিবিসি বার্মিজ।
নাউং ইয়ে বলেন, স্থানীয় প্রশাসনের নিম্নপর্যায়ের কর্মকর্তা, সামরিক সদস্য এবং অপরাধী চক্র নানা কৌশলে তরুণদের ধরে সেনাবাহিনীতে পাঠাচ্ছে। জনবলের ঘাটতিতে থাকা সামরিক ইউনিট ও আঞ্চলিক কমান্ডের কাছে তাদের হস্তান্তর করা হচ্ছে। আবার আর্থিকভাবে সচ্ছল ব্যক্তিরা নিজেরা নিয়োগ এড়াতে অর্থ দিলে তাদের পরিবর্তে দরিদ্র পরিবারের লোকজনকে নিয়োগের জন্য পাঠানো হচ্ছে।
দরিদ্রদের ওপরই সবচেয়ে বেশি চাপ
আইন অনুযায়ী, প্রতিটি গ্রাম, ওয়ার্ড বা শহরকে জনসংখ্যার অনুপাতে নির্দিষ্টসংখ্যক নিয়োগপ্রার্থী সরবরাহ করতে হয়। কাগজে-কলমে এই নিয়ম সবার জন্য সমান হলেও বাস্তবে অর্থের বিনিময়ে নিয়োগ এড়ানোর সুযোগ থাকায় বৈষম্য বাড়ছে বলে অভিযোগ।
সচ্ছল ব্যক্তিরা অর্থ দিয়ে নিজেদের বদলে অন্য কাউকে সামরিক বাহিনীতে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে পারছেন। অন্যদিকে দরিদ্র পরিবারের তরুণদের সেই সুযোগ নেই। ফলে তাদেরই বেশি ঝুঁকি নিতে হচ্ছে।
নাউং ইয়ের মতে, প্রতি মাসে নিয়োগের কোটা পূরণ করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে তরুণদের নিয়োগের জন্য হাতবদল করে অর্থ উপার্জনের সুযোগ তৈরি হওয়ায় এ ধরনের কর্মকাণ্ড আরও বাড়ছে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও ফোর্টিফাই রাইটসের মতো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোও মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বেসামরিক মানুষকে অপহরণ করে জোরপূর্বক সামরিক বাহিনীতে নিয়োগের অভিযোগ তুলেছে।
গত জুলাইয়ে উন্মুক্ত তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণকারী সংস্থা মিয়ানমার উইটনেস জানায়, তারা ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ফেসবুকে প্রকাশিত নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান চেয়ে দেওয়া শত শত বিজ্ঞপ্তি বিশ্লেষণ করেছে। তাদের অনুসন্ধানে দেখা যায়, জানুয়ারি মাসে নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিষয়ে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তির সংখ্যা ২০২১ সালে ছিল চারটি; ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮২টিতে।
গবেষকদের উপসংহারে বলা হয়, মিয়ানমারের সেনাবাহিনীতে নিয়োগের বড় একটি অংশ আনুষ্ঠানিকভাবে ডেকে পাঠানোর পরিবর্তে আটক, জবরদস্তি ও নিখোঁজ করে দেওয়ার মাধ্যমে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই পরিবারের সদস্যদের কিছু জানানো হচ্ছে না। নিখোঁজদের মধ্যে পুরুষ ও কিশোরদের সংখ্যাই বেশি।
জনবলসংকটে জান্তার মরিয়া চেষ্টা
সামরিক নিয়োগের ভয়ে তরুণদের পালিয়ে যাওয়া শুধু পরিবারগুলোকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলছে না, দেশের অর্থনীতি ও শ্রমবাজারেও প্রভাব ফেলছে। কেউ সশস্ত্র প্রতিরোধে যোগ দিতে বাড়ি ছাড়ছেন, আবার কেউ নিজ দেশের মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নেওয়া এড়াতে পালিয়ে যাচ্ছেন।
বছরের পর বছর ধরে চলা গৃহযুদ্ধের মধ্যে তরুণদের অপহরণ ও জোরপূর্বক নিয়োগের আশঙ্কা অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি বাড়াচ্ছে। একই সঙ্গে শ্রমিকসংকটে বিপর্যস্ত অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি হচ্ছে। অনেকে নিরাপত্তার খোঁজে প্রতিবেশী দেশগুলোতে পাড়ি জমাচ্ছেন।
সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সামরিক অধ্যয়নবিষয়ক শিক্ষক ও গবেষক সানদীপ সিংয়ের মতে, অনিচ্ছুক তরুণদের যুদ্ধে নামানোর জন্য জান্তার এটি আরেকটি পদক্ষেপ। তার ভাষায়, এই উদ্যোগ দেশটির গৃহযুদ্ধে জান্তার নাজুক অবস্থারই প্রতিফলন।
তিনি বলেন, নিয়মিত অপহরণের আশঙ্কা মিয়ানমারের তরুণদের ওপর নতুন করে দুর্ভোগ চাপিয়ে দিয়েছে। দীর্ঘদিনের গৃহযুদ্ধেই তারা আগে থেকে বিপর্যস্ত; এখন তাদের পরিবারগুলোকেও প্রতিনিয়ত উদ্বেগের মধ্যে থাকতে হচ্ছে।
মিয়ানমারের ডিফেন্স অ্যান্ড সিকিউরিটি ইনস্টিটিউট জুনে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলেছে, সামরিক আইন ব্যবহার করে নাগরিকদের একে অপরের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামানোর সুযোগ নিয়ে জেনারেলরা লাভবান হচ্ছেন।
নিজ দেশের মানুষের বিরুদ্ধে ছয় বছরেরও বেশি সময় ধরে যুদ্ধ চালানোর পর জান্তা সরকার এখন বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ আইনকে দমন-পীড়নের আরেকটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা। তরুণদের ধরে নিয়ে সেনাবাহিনীতে পাঠানোর অভিযোগ সেই সংকটকেই সামনে আনছে- যে বাহিনী যুদ্ধ চালিয়ে যেতে জনবল খুঁজছে, আর সেই জনবল জোগাড়ের চাপে সাধারণ মানুষই হয়ে উঠছেন সবচেয়ে অসহায়। সূত্র: বিবিসি





