সৌদি আরবের বিমানবন্দরে হুতিদের হামলার জেরে বেড়েই চলেছে ফ্লাইট বাতিলের সংখ্যা। রিয়াদের পর দাম্মামগামী সব ফ্লাইট ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত বাতিল করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত সৌদিগামী মোট ৮২টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। এর ফলে দেশে আটকা পড়েছেন প্রায় ১৩ হাজার বাংলাদেশি। জেদ্দা ও মদিনা বিমানবন্দরে সীমিত পরিসরে কিছু বিমান চলাচল করলেও সহজেই মিলছে না সেসব ফ্লাইটের টিকিট। এতে মহাভোগান্তিতে পড়েছেন সৌদিগামী যাত্রীরা। এদিকে হুতি নিয়ন্ত্রিত ইয়েমেরে রাজধানী সানায় সৌদি জোট ব্যাপক বিমান হামলার প্রস্তুতি নিয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। পাশাপাশি সৌদির রাজধানী রিয়াদে হুতির হামলার ঘটনাও ঘটছে। গতকালও তিনটি হুতি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে বলে সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) জানিয়েছে, সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোতে সীমিত পরিসরে ফ্লাইট পরিচালনার কারণে এখন পর্যন্ত ৮২টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩২টি সরাসরি ফ্লাইট এবং ট্রানজিট ফ্লাইট ৫০টি। এতে ১৩ হাজার ৭১ জন যাত্রী ভোগান্তিতে পড়েছেন। বাতিল হওয়া সরাসরি ফ্লাইটের মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ১০টি, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের ১০টি, সৌদি এয়ারলাইনসের ৫টি এবং রিয়াদ এয়ারওয়েজের ৭টি ফ্লাইট রয়েছে। এ ছাড়াও ইন্ডিগোর ২২টি, এমিরেটস এয়ারলাইনসের ১১টি, কাতার এয়ারওয়েজের ৬টি, ফ্লাই দুবাইয়ের ৬টি, সালামএয়ারের ৪টি এবং ইজিপ্টএয়ারের ১টি ট্রানজিট ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে।
রিয়াদের বাদশা খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পর দাম্মামের বাদশা ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগামী সব ফ্লাইট ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত বাতিল করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। গতকাল বিমানের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, যাত্রীদের নিরাপত্তার স্বার্থে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের দাম্মাম ও রিয়াদগামী সব ফ্লাইট আগামী ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত স্থগিত করা হয়েছে। যাত্রার সময়সূচি সম্পর্কে হালনাগাদ তথ্য বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে যথাসময়ে জানানো হবে। বিমান আরও জানিয়েছে, জেদ্দা ও মদিনা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ব্যবহার করে সৌদি আরবে যাতায়াত এবং বাংলাদেশে ফিরতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে টিকিট ও ভ্রমণসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় তথ্যের জন্য নিকটস্থ বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সেলস সেন্টারে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।
গতকাল দুপুরে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বহির্গমন টার্মিনালের বাইরে দেখা যায়, বিমানবন্দরের সেই চিরচেনা ভিড় নেই। সৌদিগামী ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় যাত্রীদের উপস্থিতি একেবারেই কম। তবে বিপরীত চিত্র দেখা গেছে বলাকা ভবনের বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের টিকিট বিক্রয় কেন্দ্রে। জেদ্দা ও মদিনা বিমানবন্দর হয়ে সৌদি আরবে যেতে সেখানে ভিড় করেছেন যাত্রীরা। তবে ফ্লাইট সংখ্যা সীমিত হওয়ায় টিকিট নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বলাকা ভবনের সামনে কথা হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবার মেহেদী হাসানের সঙ্গে। তিনি রিয়াদের একটি হাসপাতালে পরিচ্ছন্নতা কর্মী হিসেবে কাজ করছেন। তিন মাস আগে ছুটি কাটাতে দেশে এসেছিলেন। গতকাল বিকালের ফ্লাইটে তাঁর সৌদি আরবে ফেরত যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বিমান হামলার জেরে তাঁর ফ্লাইটটি বাতিল হয়। মেহেদী বলেন, ‘আগামী সপ্তাহে আমার আকামার (কাজের অনুমতিপত্র) মেয়াদ শেষ হবে। এর আগে সৌদিতে পৌঁছাতে না পারলে সমস্যায় পড়ব। সকাল থেকে এখানে মদিনাগামী ফ্লাইটের টিকিটের জন্য চেষ্টা করছি। তারা বলেছে, টিকিট ব্যবস্থা করে দেবে। কিন্তু এখনো টিকিট হাতে পাইনি।’
আরেক সৌদি প্রবাসী কর্মী আলমগীর হোসেন বলেন, ‘১৬ তারিখ দাম্মামগামী রিয়াদ এয়ারের ফ্লাইটে টিকিট করা ছিল। কিন্তু গতকাল হুট করে ফ্লাইটটি বাতিল করা হয়। ৩০ অক্টোবর ভিসার মেয়াদ শেষ হবে। তাই এর আগেই সৌদি আরবে ফেরার ব্যবস্থা করতে হবে।’
পরিস্থিতি ঠিক হলে ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়া? প্রবাসীদের নিয়ে আলোচনা : যেসব প্রবাসী কর্মীর ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে তাদের বিষয়ে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর। গতকাল রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, অতীতে এ ধরনের সমস্যার সমাধানে আলোচনা হয়েছে।
তবে সৌদি আরব নিজেরাই যখন দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে, তখন বিষয়টি নিয়ে আলোচনার উপযুক্ত সময় নয়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে কর্মীদের কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করতে ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর মতো বিষয় নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে।
ফ্লাইট পরিচালনায় সর্বোচ্চ সতর্কতার নির্দেশ : সৌদি আরবের যেকোনো বিমানবন্দরে ফ্লাইট পরিচালনার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গতকাল শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদ সতর্কতামূলক এক চিঠিতে বলেন, সৌদি আরবের বিভিন্ন বিমানবন্দরে বিদ্যমান নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য বিঘ্ন ঘটছে বলে জানা গেছে। ফ্লাইটের বিলম্ব, বাতিল বা সময়সূচি পরিবর্তনের বিষয়ে ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীদের এসএমএস, ফোনকল, ই-মেইল, এয়ারলাইনসের ওয়েবসাইট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ অন্যান্য মাধ্যমে জানাতে হবে। পাশাপাশি ফ্লাইটের সর্বশেষ অবস্থা, পরিবর্তিত যাত্রার সময়, পুনরায় বুকিং, টিকিটের অর্থ ফেরত এবং অন্যান্য প্রযোজ্য ব্যবস্থা সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য দিতে হবে।
ইয়েমেনে সৌদি হামলার প্রস্তুতি : গতকাল সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল মালিকি বলেছেন, ইয়েমেনের রাজধানীতে তারা ব্যাপক বিমান হামলা চালাতে যাচ্ছেন।
এজন্য সানা থেকে সাধারণ মানুষকে সরে যেতে নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট সানার ‘ইয়েমেনি তেল কোম্পানি/ আল-সাবাহ কেন্দ্রীয় স্টেশন থেকে সাধারণ মানুষকে তাদের নিরাপত্তার জন্য সরে যাওয়ার অনুরোধ করছে।’ এর আগের এক্স পোস্টে তিনি উল্লেখ করেন, সানায় তারা ‘বিশেষ অভিযান’ চালাবেন। এ কারণে আগে থেকেই বেসামরিক নাগরিকদের সরে যাওয়ার সুযোগ দেওয়ার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
এদিকে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন জোটের পক্ষ থেকে এমন তথ্য জানানোর পর পাল্টা হুমকি দিয়েছে হুতি বিদ্রোহীরা। গোষ্ঠীটির সামরিক শাখার মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারে বলেছেন, ‘ইয়েমেনের রাজধানীতে যেকোনো হামলার জবাবে সৌদির রাজধানী রিয়াদে পাল্টা হামলা চালানো হবে। আর এই জবাব হবে কঠোর ও বেদনাদায়ক।’
রিয়াদের আকাশে তিন ড্রোন ভূপাতিত : রাজধানী রিয়াদের আকাশে নতুন করে তিনটি ড্রোন ভূপাতিত করেছে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট। জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালিকি গতকাল এ দাবি করেছেন। তবে ড্রোনগুলো রিয়াদের কোন অবকাঠামো টার্গেট করে ছোড়া হয়েছে এবং কোন জায়গা থেকে ছোড়া হয়েছে সেটি স্পষ্ট করেননি তিনি।
প্রাসাদ থেকে দফায় দফায় সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে সৌদি যুবরাজকে : হুতি বিদ্রোহীদের ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে চরম নিরাপত্তার ঝুঁকিতে পড়েছেন সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। পরিস্থিতি বিবেচনায় ৪১ বছর বয়সি এই যুবরাজকে কড়া নিরাপত্তাবেষ্টনীর মধ্যে বাংকার-সুবিধাসম্পন্ন বিভিন্ন রাজপ্রাসাদে দফায় দফায় সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এ তথ্য জানিয়েছে।
খবরে বলা হয়, গত ৬ অক্টোবর একটি জাতীয় রক্তদান কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার পর থেকে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে আর জনসমক্ষে দেখা যাচ্ছে না। তার সুরক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তারা জানান, ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের সঙ্গে লড়াই তীব্র হওয়ায় তার নিরাপত্তায় কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। লোকচক্ষুর আড়ালে রেখে বিশেষভাবে বাছাই করা একটি সুদক্ষ নিরাপত্তা দলের তত্ত্বাবধানে তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে। তবে উদ্ভূত পরিস্থিতির বিষয়ে মন্তব্যের জন্য সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাদের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।





