‘দাঙ্গার’ বয়ানের আড়ালে নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকছে ফরাসি সরকার

ফ্রান্সজুড়ে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ও সহিংস অস্থিরতাকে কেন্দ্র করে সরকারের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক তীব্র হচ্ছে। ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, দোকানপাটে লুটপাট ও সরকারি-বেসরকারি সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতির ঘটনায় নিন্দা জানানো হলেও, এসব ঘটনাকে সামনে রেখে সরকার বিক্ষোভের মূল কারণগুলো আড়াল করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

জীবনযাত্রার মানের অবনতি, ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্য এবং শিক্ষাব্যবস্থার সংকট নিয়ে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ থেকেই এই আন্দোলনের সূত্রপাত- এমনটাই মনে করছেন সমালোচকেরা।

সমালোচকদের অভিযোগ, সহিংসতার ঘটনাগুলোকে কাজে লাগিয়ে সরকার বিক্ষোভ দমনে অতিরিক্ত নিরাপত্তানির্ভর পদক্ষেপের পক্ষে যুক্তি দাঁড় করাচ্ছে।

একই সঙ্গে নিজেদের নীতিগত ব্যর্থতা নিয়ে জনসমালোচনা এড়ানোর চেষ্টা করছে। তাদের মতে, বিশৃঙ্খলার দৃশ্য সামনে এনে সরকার নিজেকে জনশৃঙ্খলার রক্ষক হিসেবে তুলে ধরছে, অথচ যে সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মানুষের ক্ষোভ বাড়িয়েছে, তা মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

তবে বিক্ষোভের মধ্যে সহিংসতার ঘটনা ঘটলেও তার জন্য শিক্ষার্থীদের বৃহত্তর আন্দোলনের দাবিগুলোকে অগ্রাহ্য করা যায় না বলে মত দিয়েছেন সমালোচকেরা।

তাদের মতে, আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে পুলিশের বলপ্রয়োগের অভিযোগও সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

পুলিশের বলপ্রয়োগ ও ব্যাপক আটক
বিক্ষোভ দমনে পুলিশের অভিযানে বেশ কয়েকজন কিশোর গুরুতর আহত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ১৪ বছর বয়সী ইডেন পুলিশের নিক্ষেপ করা কাঁদানে গ্যাসের গ্রেনেডের আঘাতে চোয়ালের হাড় ভেঙে ফেলে এবং তার কয়েকটি দাঁত পড়ে যায়।

১৬ বছর বয়সী মায়েল পুলিশের রাবার বুলেটের আঘাত বলে সন্দেহ করা হচ্ছে- এমন ঘটনায় এক চোখের দৃষ্টিশক্তি হারায়। আর ১৫ বছর বয়সী ইভানের হাতে পুলিশের ছোড়া স্টান গ্রেনেডের বিস্ফোরণে গুরুতর ক্ষতি হয়, যার ফলে তার একটি হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

প্রতিবেদনে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসে বিক্ষোভ শুরুর পর ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত ৭ হাজার ৯৫০ জনকে পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়েছিল। তাদের ৮৫ শতাংশই ছিল অপ্রাপ্তবয়স্ক। এরপর ১৭ অক্টোবরের বিক্ষোভের ঘটনায় আরও ২ হাজার ৭০০ জনকে আটক করা হয়। এর পরদিন পুলিশ আরও এক হাজার জনকে গ্রেফতার করে।

বিক্ষোভ দমনে বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য মোতায়েন এবং ব্যাপক আটকের এই চিত্রকে চলতি শতাব্দীর অন্যতম কঠোরভাবে দমন করা প্রতিবাদ আন্দোলনের উদাহরণ হিসেবে দেখছেন সমালোচকেরা।

দারিদ্র্য ও বৈষম্যে বাড়ছে জনক্ষোভ
বিক্ষোভের পেছনে তাৎক্ষণিক সহিংসতার বাইরেও দীর্ঘদিনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট রয়েছে বলে মনে করছেন আন্দোলনের সমর্থকেরা। তাদের মতে, ফ্রান্সে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান ক্রমেই অবনতির দিকে যাচ্ছে। অথচ এ নিয়ে জনপরিসরের আলোচনায় যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৯০-এর দশকের পর ফ্রান্সে দারিদ্র্যের হার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। দেশটিতে প্রায় ৯৮ লাখ মানুষ সরকারি দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছেন।

অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থা অক্সফামের তথ্য অনুযায়ী, ফ্রান্সের ৫৩ জন ধনকুবেরের সম্মিলিত সম্পদের পরিমাণ দেশটির প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠীর মোট সম্পদের সমান।

ক্রমবর্ধমান এই বৈষম্য ও আর্থসামাজিক সংকটের প্রভাব পড়েছে শিক্ষাব্যবস্থায়ও। বিশেষ করে দরিদ্র ও প্রান্তিক অঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো অবকাঠামোগত দুরবস্থা, শিক্ষকসংকট এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার অভাবে ভুগছে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অবকাঠামোগত সংকট
ফ্রান্সের মূল ভূখণ্ডের বাইরে মায়োত দ্বীপের আকুয়া এলাকায় অবস্থিত সিতে দ্য নর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে গত ৩১ আগস্ট থেকেই অবরোধ শুরু হয়।

প্যারিস অঞ্চলের বিক্ষোভ আন্তর্জাতিক মনোযোগ পাওয়ার অনেক আগেই শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষক-কর্মীরা উন্নত শিক্ষা ও পাঠদানের পরিবেশের দাবিতে প্রতিবাদে নামেন।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ৯০০ শিক্ষার্থীর জন্য নির্মিত বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে প্রায় ২ হাজার ৩০০ শিক্ষার্থীকে গাদাগাদি করে পড়াশোনা করতে হচ্ছে। শ্রেণিকক্ষগুলোতে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা নেই। এর পাশাপাশি শিক্ষকসংকট, পানির সরবরাহে বিঘ্ন এবং শৌচাগারের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্যারিসের উপকণ্ঠে সেভরঁ এলাকার ব্লেজ-সঁদ্রার মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা ২০২৪ সাল থেকেই ভবনের ছাদ বা দেয়াল দিয়ে পানি চুইয়ে পড়া, ছত্রাকের বিস্তার, ব্যবহার অনুপযোগী শৌচাগার এবং টেবিল-চেয়ারের ঘাটতি নিয়ে অভিযোগ জানিয়ে আসছেন।

একই অঞ্চলের পাঁতাঁ এলাকার মার্সেলাঁ-বের্তলো মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের জানালাগুলো আর খোলা যায় না। অথচ তাপপ্রবাহের সময় সেখানে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।

অন্যদিকে, প্যারিসের উপকণ্ঠে বাগনোলের পলিতজে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে জানতে পারেন, বিদ্যালয়ের পানি পান করার জন্য নিরাপদ নয়। অথচ জুন মাসেই পানির নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছিল।

এগুলো দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত অবনতির কয়েকটি উদাহরণ মাত্র। বিশেষ করে দরিদ্র এলাকাগুলোতে পরিস্থিতি আরও খারাপ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এক বছরে বাতিল ২ কোটি শিক্ষণঘণ্টা
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত সমস্যার পাশাপাশি পাঠদানের ক্ষেত্রেও ঘাটতি প্রকট হয়ে উঠেছে। ফ্রান্সের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে মায়োতকে বাদ দিয়ে দেশটির সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ শিক্ষণঘণ্টা অনুষ্ঠিত হয়নি। নির্ধারিত মোট শিক্ষণঘণ্টার প্রায় ১০ শতাংশই এভাবে বাদ পড়ে।

এর মধ্যে ১ কোটি ৫০ লাখ শিক্ষণঘণ্টা নষ্ট হয়েছে অনুপস্থিত শিক্ষকদের পরিবর্তে অন্য শিক্ষক নিয়োগ না দেওয়ায়।

ফরাসি অর্থনীতিবিদ লুকাস শানসেলের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৭ সালে ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ক্ষমতায় আসার পর থেকে শিক্ষার্থীপ্রতি সরকারি ব্যয় ২০ শতাংশ কমেছে।

আন্দোলনকারীদের দাবি, শিক্ষাব্যবস্থার এই অবনতি এবং শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার অভাবই তাদের প্রতিবাদের অন্যতম প্রধান কারণ। তাদের মতে, এসব সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে সরকার দমনমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করছে এবং আন্দোলনকে ঘিরে ভিন্ন বয়ান তৈরি করছে।

ম্যাক্রোঁর নিরাপত্তানির্ভর পদক্ষেপ নিয়ে সমালোচনা
ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এক ভাষণে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ বোঝার কথা বললেও পুলিশের প্রতি তার মতো সমর্থন শিক্ষার্থীদের জন্য প্রকাশ করেননি বলে সমালোচনা রয়েছে। শুক্রবার ২০ জন শিক্ষার্থীর সঙ্গে বৈঠকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আবেদন ও নির্বাচনসংক্রান্ত প্ল্যাটফর্ম সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। কিন্তু শিক্ষার্থীদের প্রধান দাবিগুলো সমাধানের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে, নিরাপত্তানির্ভর পদক্ষেপ আরও জোরদার করেছেন ম্যাক্রোঁ। তিনি ৭০ হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েনের পরিকল্পনা করেছেন এবং বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করার অঙ্গীকার করেছেন। একই সঙ্গে তার অভিযোগ, ‘চরম বামপন্থীরা’ প্রজাতন্ত্রকে উৎখাত করতে চাইছে।

প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নুও বামপন্থীদের ‘একটি পক্ষ বেছে নেওয়ার’ আহ্বান জানিয়েছেন। তার বক্তব্যে প্রজাতন্ত্রের পক্ষে থাকা-যাকে তিনি পুলিশের প্রতি সমর্থনের সঙ্গে যুক্ত করেছেন- এবং দাঙ্গাকারীদের সহিংস কর্মসূচির বিরোধিতার মধ্যে একটি দ্বৈত অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে।

সমালোচকদের মতে, এ ধরনের বক্তব্যের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে অংশগ্রহণকারীদেরও রাষ্ট্রবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

সহিংসতার ঘটনায় সুযোগ নিচ্ছে চরম ডানপন্থীরা
ফ্রান্সের অস্থির পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে দেশটির চরম ডানপন্থী রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। সহিংসতার ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় ও সম্ভাব্য অভিবাসী পটভূমির ওপর জোর দিয়ে তারা বৃহত্তর রাজনৈতিক বিতর্ককে অন্যদিকে নেওয়ার চেষ্টা করছে বলে প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে।

চরম ডানপন্থী কয়েকজন রাজনীতিক বিদেশি বংশোদ্ভূত ব্যক্তিদের ‘দুষ্কৃতকারীদের দল’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। অন্যরা নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার ক্ষমতা আরও বিস্তৃত করার আহ্বান জানিয়েছেন।

সমালোচকদের মতে, এ ধরনের বক্তব্য ম্যাক্রোঁর রাজনৈতিক শিবিরকেও সুবিধা দিচ্ছে। কারণ, এর মাধ্যমে সরকার নিজেকে চরম ডানপন্থীদের উত্থানের বিরুদ্ধে শেষ প্রতিরোধ হিসেবে তুলে ধরতে পারছে। এতে সরকারের নীতিগত সাফল্য বা ব্যর্থতার পরিবর্তে মানুষের মধ্যে ভয়কে রাজনৈতিক সমর্থন আদায়ের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

ফলে ভোটারদের সামনে ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে রাজনৈতিক বিকল্প। একদিকে এমন নীতির সমালোচনা রয়েছে, যা মানুষের ক্ষোভ বাড়িয়েছে; অন্যদিকে সেই ক্ষোভকে জাতিগত বিদ্বেষে রূপ দেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

আন্দোলন থামলেও নতুন বিক্ষোভের আশঙ্কা
সমালোচকদের মতে, শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো বাস্তবায়নে সরকারের আন্তরিকতার ঘাটতি স্পষ্ট। কারণ, এসব দাবি মেনে নেওয়ার অর্থ হবে ম্যাক্রোঁর সরকারের নীতিগত অগ্রাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলা-বিশেষ করে ধনীদের সম্পদ সুরক্ষা এবং বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর প্রয়োজন উপেক্ষা করার অভিযোগের মুখোমুখি হওয়া।

তাদের আশঙ্কা, সরকার হয়তো আন্দোলনকে ক্লান্ত হয়ে পড়তে দেবে, ভয়ভীতি বা সহিংসতার বিতর্কের মধ্যে দুর্বল হতে দেবে কিংবা জনসমর্থন হারানোর অপেক্ষা করবে। শেষ পর্যন্ত আন্দোলন নিজে থেকেই স্তিমিত হয়ে যাবে- এমন কৌশলের ওপর নির্ভর করতে পারে সরকার।

তবে সমালোচকদের মতে, এ ধরনের কৌশল দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা কম। বর্তমান আন্দোলন থেমে গেলেও জীবনযাত্রার মান, দারিদ্র্য, বৈষম্য ও শিক্ষাব্যবস্থার সংকটের সমাধান না হলে নতুন আন্দোলন গড়ে উঠতে পারে।

ফ্রান্সের চলমান অস্থিরতা তাই শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সামাজিক বৈষম্য, জনসেবা খাতের অবনতি এবং তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা। এসব সমস্যার কার্যকর সমাধান ছাড়া কেবল কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থার মাধ্যমে জনঅসন্তোষ দীর্ঘমেয়াদে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হতে পারে। সূত্র: আল-জাজিরা