১১ বছরেও বিচার পায়নি ফেলানীর পরিবার

ঢাকা: ফেলানী হত্যার বিচার ১১ বছরেও মেলেনি। এতে ক্ষুব্ধ তার মা-বাবা। এমনকি বন্ধ হয়নি সীমান্তে বিএসএফ-এর গুলিও।

এই হত্যাকাণ্ডে ভারত আন্তর্জাতিকভাবে চাপে পড়লেও এখনও সীমান্তে বিএসএফ-এর নির্যাতন বন্ধ হয়নি। ভারতীয় সীমান্ত রক্ষীদের হাতে গত ১১ বছরে শুধু কুড়িগ্রাম সীমান্তেই দুই ডজন বাংলাদেশি এবং ভারতীয় নাগরিক নিহত হয়েছে।

মানবাধিকার সংগঠন, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাব অনুযায়ী, গেলো তিন বছরে বিএসএফ এর গুলি ও নির্যাতনে মারা গেছেন শতাধিক। এরমধ্যে শুধু কুড়িগ্রাম সীমান্তেই মারা গেছেন, অন্তত সাতজন। যার একটিরও বিচার হয়নি।

ফেলানী হত্যা মামলার আইনজীবী জানান, ভারতের সুপ্রিম কোর্টে শুনানির তালিকায় থাকার পরও শুনানি না হাওয়া দুঃখজনক।

জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার রামখানা ইউনিয়নের কলোনীটারী গ্রামের নূর ইসলাম পরিবার নিয়ে থাকতেন ভারতের আসাম রাজ্যের বোয়াইলপাড়া জেলার বঙ্গাইগাঁও এলাকায়। কিশোরী ফেলানীর বিয়ে ঠিক হয় বাংলাদেশে। ২০১১ সালে বিয়ের উদ্দেশ্যে বাবার সঙ্গে ভারত থেকে দেশে আসছিল সে। ওইদিন শুক্রবার ভোর ৬টা ফুলবাড়ি উপজেলার কাশিপুর ইউনিয়নের অনন্তপুর সীমান্তের কাঁটাতার মই দিয়ে পার হচ্ছিল তারা। ভারতীয় বিএসএফ বাহিনীর সদস্যরা টের পেয়ে গুলি চালায়।

ফেলানীর বাবা বাংলাদেশ অভ্যন্তরে নেমে পড়ায় ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান। কিন্তু মইয়ের ওপরেই গুলিবিদ্ধ হয়ে কাঁটাতারে উল্টোভাবে ঝুলে পড়ে থাকে ফেলানী। প্রায় আধা ঘণ্টা ছটফট করে সে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। সকাল পৌনে ৭টা থেকে তার নিথর দেহ কাঁটাতারের ওপর ওভাবেই ঝুলে থাকে সাড়ে ৪ ঘণ্টা।

পরে করুণ এই দৃশ্য গণমাধ্যমসহ সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে পড়ে। এরপর বিশ্বের মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে ভারত। পরে বিএসএফ-এর বিশেষ কোর্টে দুই দফায় রায়ে খালাস পায় অভিযুক্ত বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষ। এ রায় প্রত্যাখান করে ভারতীয় মানবাধিকার সংগঠন মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চের (মাসুম) সহযোগিতায় ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টে রিট আবেদন করেন ফেলানীর বাবা নুর ইসলাম। কিন্তু এখনও সুষ্ঠু বিচার না পেয়ে হতাশ ফেলানীর পরিবার।

আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ২০১৩ সালের ১৩ আগস্ট ভারতের কোচবিহারে জেনারেল সিকিউরিটি ফোর্সেস কোর্টে ফেলানী হত্যা মামলার বিচার কার্যক্রম শুরু হয়। সাক্ষী দেন ফেলানীর বাবা এবং মামা হানিফ।

পরের মাসে ৬ সেপ্টেম্বর আসামি অমিয় ঘোষকে খালাস দেয় এ বিশেষ কোর্ট। রায় প্রত্যাখান করে পুনঃবিচারের দাবি জানান ফেলানীর বাবা। পরের বছর ২০১৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর পুনঃবিচার শুরু হলে ১৭ নভেম্বর আবারও আদালতে সাক্ষ্য দেন ফেলানীর বাবা। ২০১৫ সালের ২ জুলাই এ আদালত আবার আত্মস্বীকৃত আসামি অমিয় ঘোষ বেকসুর খালাস পান।

এই রায়েও সন্তুষ্ট হতে না পেরে ওই বছর ১৪ জুলাই ভারতের মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ ফেলানীর বাবার পক্ষে দেশটির সুপ্রিম কোর্টে রিট পিটিশন করে। ওই বছর ৬ অক্টোবর রিট শুনানি শুরু হয়। ২০১৬, ২০১৭ এবং ২০১৮ সালে কয়েক দফা শুনানি পিছিয়ে যায়। পরে ২০২০ সালের ১৮ মার্চ করোনা শুরুর আগে শুনানির দিন ঠিক হলেও শুনানি হয়নি এখনও।

মেয়ের হত্যার বিচার না পেয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন ফেলানীর বাবা-মা। ফেলানীর বাবা নূর ইসলাম জানান, ফেলানীকে বিয়ে দেওয়ার জন্য বাড়িতে নিয়ে আসছিলাম। পরদিন বিয়ে হতো তার। কিন্তু বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষ আর দালালরা মিলে আমার মেয়কে হত্যা করলো। আমি এই হত্যার বিচার চেয়ে অনেক ঘুরেছি। মানবাধিকার সংস্থাসহ বহুজনের কাছে গেছি। এখন ১১ বছর হয়ে গেল বিচার পেলাম না।

তিনি আরও বলেন, ভারতের সুপ্রিমকোর্টে রিট পিটিশনটি ২০২০ সালের ১৮ মার্চ শুনানির তারিখ থাকলেও তা হয়নি। করোনাকালীন সময়ে আর কোন খবর রাখা হয়নি।

ফেলানীর মা জাহানারা বেগম বলেন, ফেলানী হত্যার ১১ বছর হয়ে গেলো আজও বিচার পাইনি। আমি দুই দেশের সরকারের কাছে মেয়ে হত্যার সঠিক বিচার দাবি করছি।

প্রভাতনিউজ/এবিএস