শুভ জন্মদিন মহানায়ক

বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সর্বকালের ‘মহানায়ক’ খেতাবটি একান্ত নিজের করে নিয়েছেন উত্তম কুমার। সুদর্শন চেহারা, চোখ ধাঁধাঁনো চাহনী আর সুদক্ষ অভিনয় দিয়ে তিনি চলচ্চিত্রকে করেছেন সমৃদ্ধ। নিজেকে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়। যেখানে যাওয়ার স্বপ্ন দেখে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের অভিনেতারা। আজ সেই মহানায়ক উত্তম কুমারের জন্মদিন। ১৯২৬ সালের আজকের দিনে কলকাতায় জন্ম নেন অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায়। কলকাতার সাউথ সাবার্ন স্কুল থেকে ম্যাট্রিক এবং গোয়েঙ্কা কলেজ থেকে নেন উচ্চশিক্ষা। পরিবারের টানাপোড়েনের কারণে উত্তম কুমারকে শিক্ষাজীবনেই পা বাড়াতে হয়েছে চাকরিতে। পরে নিজের নাম বদলে উত্তম কুমার হয়ে যোগ দেন সিনেমায়, তাও ১৯৪৭ সালেই।

সে বছর ‘মায়াডোর’ নামের একটি সিনেমায় অভিনয়ের সুযোগ পান উত্তম। বড় কোনো চরিত্র নয়; এক্সট্রা আর্টিস্ট হিসেবে। এরপর ১৯৪৮ সালে ‘দৃষ্টিদান’- এ অভিনয়। ১৯৪৯ সালে নায়ক হয়ে অভিনয় করলেন ‘কামনা’ সিনেমায়। নায়িকা ছবি রায়। সিনেমাটি মুক্তির পর মুখ থুবড়ে পড়ল। উত্তমের নায়করূপে আত্মপ্রকাশ হলো ভরাডুবির মধ্য দিয়ে। এখানেই শেষ নয়, এরপর থেকে টানা আট বছরে আটটি সিনেমায় অভিনয় করেছেন উত্তম কুমার। যার সবগুলোই হয়েছে ব্যর্থ। এজন্য তিনি পেয়েছিলেন ‘ফ্লপমাস্টার’- এর খেতাব। সেই ফ্লপমাস্টারই একসময় হয়ে ওঠলেন সুপারস্টার; হিটমাস্টার। কোটি দর্শকের প্রাণের স্পন্দন, তরুণী-যুবতীদের স্বপ্নের নায়ক।

পরিবর্তনের গল্পটা শুরু হয়েছিল ১৯৫৪ সালে। অবশ্য তার আগে ১৯৫২ সালে ‘বসু পরিবার’ এবং ১৯৫৩ সালে ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ সিনেমায় অভিনয় করে নজর কাড়েন উত্তম কুমার। ৫৪ সালে তিনি চলে আসেন জনপ্রিয়তার শীর্ষে। সে বছর তিনি ১৪টি সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন। যার অধিকাংশই ছিল সফল। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ‘অগ্নিপরীক্ষা’। এই সিনেমায় জুটি বেঁধে অভিনয় করেছিলেন উত্তম কুমার ও সুচিত্রা। এরপরই তারা বাংলা সিনেমার সবচেয়ে জনপ্রিয় ও কালজয়ী জুটি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যান। এই জুটির অভিনীত অন্যতম সিনেমাগুলো হচ্ছে- ‘হারানো সুর’, ‘পথে হলো দেরি’, ‘সপ্তপদী’, ‘চাওয়া-পাওয়া’, ‘বিপাশা’, ‘জীবন তৃষ্ণা’ ও ‘সাগরিকা’।

উত্তম কুমার অসংখ্য সিনেমায় অভিনয় করেছেন। বাংলা সিনেমায় তার সিংহভাগ কাজ হলেও হিন্দিতেও তিনি সিনেমা করেছেন। তার অভিনীত সিনেমাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- ‘মৌচাক’, ‘দেয়া নেয়া’, ‘সাড়ে চুয়াত্তর’, ‘ইন্দ্রাণী’, ‘সবার উপরে’, ‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’, ‘নায়ক’, ‘অমানুষ’, ‘ত্রিযামা’, ‘চিড়িয়াখানা’, ‘সদানদের মেলা’, ‘শ্যামলী’, ‘কাল তুমি আলেয়া’, ‘রাজকুমারী’, ‘চৌরঙ্গী’, ‘একটি রাত’, ‘শেষ অঙ্ক’, ‘এখানে পিঞ্জর’, ‘সন্ন্যাসী রাজা’, ‘মেম সাহেব’, ‘উত্তর ফাল্গুনী’, ‘অবাক পৃথিবী’, ‘সেই চোখ’, ‘আনন্দ আশ্রম’, ‘নায়িকা সংবাদ’, ‘বন পলাশীর পদাবলী’, ‘দুই পৃথিবী’, ‘শিল্পী’, ‘অভয়ের বিয়ে’, ‘কিতাব’, ‘শাপমোচন’, ‘স্ত্রী’, ‘আগ্নীশ্বর’, ‘ওরা থাকে ওধারে’ ও ‘ছোটি সি মুলাকাত’ ইত্যাদি।

উত্তম কুমার কেবল বাণিজ্যিক সিনেমায় নায়ক হিসেবে সাফল্যের মালা গলে পরেননি, তিনি বিকল্প ধারায়ও হয়েছেন সফল। তার প্রাপ্তির খাতার দিকে তাকালে সেটার প্রমাণ মেলে। ‘নায়ক’, ‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি‘ ও ‘চিড়িয়াখানা’ সিনেমায় অভিনয় করে সেরা অভিনেতা হিসেবে অর্জন করেছিলেন ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। এছাড়া ‘উত্তর ফাল্গুনী’ সিনেমার জন্য প্রযোজক হিসেবেও পেয়েছেন জাতীয় সম্মান।

ব্যক্তিগত জীবনে উত্তম কুমার বিয়ে করেছিলেন গৌরী দেবীকে। ক্যারিয়ার শুরুর একেবারে প্রথম সময়ে ১৯৪৮ সালে তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। এই সংসারে তাদের একমাত্র সন্তান গৌতম চট্টোপাধ্যায়। গৌতমের পুত্র গৌরব চট্টোপাধ্যায় বর্তমানে টালিউডের জনপ্রিয় অভিনেতা। ১৯৬৩ সালে উত্তম কুমার সংসার ছেড়ে চলে যান। লিভ টুগেদার করেন সেই সময়ের জনপ্রিয় অভিনেত্রী সুপ্রিয়া দেবির সঙ্গে। উত্তম কুমারের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দীর্ঘ ১৭ বছর তারা একসঙ্গে থেকেছেন।

১৯৮০ সালে ‘ওগো বন্ধু সুন্দরী’ সিনেমার শুটিং চলাকালে স্ট্রোক করেন উত্তম কুমার। এরপত তাকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। চিকিৎসকরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালান। কিন্তু সে বছরের ২৪ জুলাই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন উত্তম। সিনেমার মহানায়ক উত্তম কুমার আর নেই। না থেকেও তো তিনি দর্শক হৃদয়ে আজো আছেন এক অনন্ত হয়ে, অসীম হয়ে। শুভ জন্মদিন মহানায়ক।