রাজধানীর ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরায় (আইসিসিবি) তিন দিনব্যাপী বাজুস মেলা শেষ হয় গতকাল। এদিন বিভিন্ন স্টলে পছন্দের অলংকার দেখতে ক্রেতার ভিড়। ছবি : কালের কণ্ঠজুয়েলারি শিল্পের আন্তর্জাতিক বাজার ধরার সুযোগ এখনই। এ জন্য সরকারকে আমদানি নীতিমালা সহজ করে, গার্মেন্টশিল্পের মতো বন্ডেড ওয়্যারহাউস ও শুল্কমুক্ত সুবিধা দিতে হবে। তা না হলে ভুল হয়ে যাবে।
গতকাল শনিবার বিকেলে রাজধানীর ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরার (আইসিসিবি) নবরাত্রি হলে জুয়েলারি শিল্পের সবচেয়ে বড় মেলা ‘বাজুস ফেয়ার-২০২৩’ শেষ হয়। এর আগে ‘অর্থনীতিতে জুয়েলারি শিল্পের অবদান ও বিনিয়োগ সম্ভাবনা’ শীর্ষক আলোচনাসভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম বলেন, ‘সামনে জুয়েলারি শিল্পের চাহিদা আরো বাড়বে। শুধু দেশের বাজার নয়, এখানে বিপুল রপ্তানি বাজার রয়েছে। আমাদের দেশের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ার কারণে বিশাল মার্কেট তৈরি হতে যাচ্ছে, সেই সুযোগ আমরা কেন হারাব।’ তিনি বলেন, ‘গার্মেন্টশিল্পকে নানা সুযোগ-সুবিধা না দিলে এই শিল্প আজকের অবস্থায় আসতে পারত কি না, চিন্তার বিষয়। সুতরাং এখন সোনার ব্যবসার যে সুযোগ দেশে ও আন্তর্জাতিক মার্কেটে দেখতে পাচ্ছি, তা যদি এখনই ধরতে না পারি, তাহলে আমরা ভুল করে ফেলব।’ তিনি আরো বলেন, ‘রপ্তানিতে যে সুবিধা গার্মেন্ট পায়, সেটা জুয়েলারি শিল্পেরও পাওয়া উচিত।’
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘জুয়েলারি শিল্পে আমাদের দক্ষ জনবল আছে। কিন্তু এ শিল্পকে আমরা রপ্তানিমুখী করতে পারিনি। সরকার যদি ট্যাক্সশূন্য করে দেয়, তাহলে এই শিল্প বিকশিত হবে। আমরা ভারতের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারব।’
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) গবেষণা পরিচালক মাহফুজ কবির বলেন, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ যতটা বাড়ানো যায়, বাড়াতে হবে। এটি গুরুত্বপূর্ণ। আর অলংকারের ডিজাইনের প্রতি নজর দিতে হবে। এ জন্য চারুকলার সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে হবে।বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান শাহ মোহাম্মদ মাহবুব বলেন, ‘আমাদের অর্থনীতির পরিসর বেড়েছে, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে। আগে সোনা কেনা অনেকের জন্য দূরের বিষয় ছিল। কিন্তু তাদের কাছে আস্তে আস্তে সহজলভ্য হচ্ছে। সে জন্য এই ব্যবসা সবার নজর কেড়েছে। বিডার পক্ষ থেকে আমরা সব সময়ই চাই, নতুন নতুন ব্যবসা আসুক। সেদিক থেকে এই জুয়েলারি খাতকে বড় করার সুযোগ আছে।’
লিগ্যাল ইকোনমিস্ট এম এস সিদ্দিক বলেন, বাংলাদেশের হাজার হাজার সোনার দোকান কাঁচামাল কোথা থেকে পায়, সেটি দেশের নীতিনির্ধাকরা কোনো দিনই ভাবেননি। অর্থাৎ এটিতে রাষ্ট্রীয়ভাবে একটি অবৈধ ব্যবসার আবরণ তৈরি করা হয়েছে। ব্যবসায়ীদের যে বদনাম, এটির জন্য আসলে এই ব্যবসায়ীরা দায়ী নন। সরকারের নীতিই এটির জন্য দায়ী। এখন যে নীতিমালা করা হয়েছে, সেখানে আমদানি করা যাবে। কিন্তু নীতিমালাটি এত কঠিন করা হয়েছে যে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে সাধারণ ব্যবসায়ীদের পক্ষে সোনা আমদানির অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন কাজ। এটি আরো সহজ করতে হবে।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘খনিপ্রধান দেশগুলো স্বর্ণ ব্যবসায় অগ্রসর হয়নি। যারা কাঁচামাল আমদানি করে স্বর্ণ রপ্তানি করেছে, তারা এগিয়েছে। রপ্তানি বাজারে আমাদের অংশগ্রহণ বাড়াতে গেলে আমাদের আমদানিও বাড়াতে হবে। প্রতিবছর চার হাজার ৭০০ টনের মতো স্বর্ণ লেনদেন হয়ে থাকে। ১০টি বড় দেশের মধ্যে ছয়টিই এশিয়ার দেশ। এটিও আমাদের জন্য একটি বড় সম্ভাবনা। আমাদের দেশে স্বর্ণের বাজার কত বড়, সেটি আমরা জানি না। এ জন্য একটি বিশ্বাসযোগ্য তথ্য থাকতে হবে বিনিয়োগকারীদের কাছে।
অনুষ্ঠানে বাজুসের সাবেক সভাপতি ডা. দিলীপ রায়ের সভাপতিত্বে আরো উপস্থিত ছিলেন বাজুসের সহসভাপতি দেওয়ান আমিনুল ইসলাম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সুমিত ঘোষ অপুসহ সারা দেশ থেকে আসা স্বর্ণ ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা।
জুয়েলারি শিল্প সম্ভাবনাময় হয়ে উঠেছে : গতকাল মেলায় পৃথকভাবে ‘জুয়েলারি শিল্পের দ্বিতীয় প্রজন্মের উদ্যোক্তাদের ভাবনা’ শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। এতে বক্তারা বলেন, একসময় দেশের চরম নিরাপত্তাহীন জুয়েলারি শিল্প বর্তমান নেতৃত্বের মাধ্যমে সম্ভাবনাময় এবং সাহসী হয়ে উঠেছে। উদ্ভাবন আর প্রযুক্তির সমন্বয়ে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের বড় খাত হবে বলে আশা দ্বিতীয় প্রজন্মের জুলেয়ারি উদ্যোক্তাদের।
সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন বাজুসের সাবেক সভাপতি দিলীপ কুমার রায়।
সংগঠনের উপদেষ্টা রুহুল আমিন রাসেলের সঞ্চালনায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন বাজুস কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি দেওয়ান আমিনুল ইসলাম শাহীন। মূল বক্তা ছিলেন বাজুস স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য উইমেন অ্যাফেয়ার্স তাসনিম নাজ মুনা। প্রধান অতিথির বক্তব্যে দিলীপ কুমার রায় বলেন, অতীতে একটি ভয়ংকর অধ্যায় ছিল স্বর্ণ ব্যবসার। আইন ছিল না, নিরাপত্তা ছিল না। ফলে উদ্যোক্তাদের সকালে ঘুম ভাঙত আতঙ্ক নিয়ে। কখনো চোরাই স্বর্ণ বা ভ্যাট-ট্যাক্স নিয়ে হয়রানির শিকার হতে হতো। আজ সেই অন্ধকার যুগের অবসান হয়েছে। বাজুসের নতুন নেতৃত্বে এখন আর সেই ভয় নেই। তিনি আরো বলেন, গত এক বছরে তিলে তিলে গড়ে ওঠা এই শিল্প গোলাপের মতো প্রস্ফুটিত হয়েছে। ফলে আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে ভবিষ্যতে এই শিল্প আরো এগিয়ে যাবে। একই সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের বড় খাত হবে এই শিল্প।
মূল বক্তব্যে তাসনীম নাজ মুনা বলেন, বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা বাড়াতে হলে এ শিল্পেও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। এ জন্য প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এতে অর্থ ও সময় সাশ্রয়ের পাশাপাশি নকশায়ও ভিন্নতা আসবে। এ জন্য স্বর্ণশিল্পীদের জন্য ডিজাইন ইনস্টিটিউট করার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, এ শিল্পে উৎপাদন এবং ভোক্তার মধ্যেও স্বচ্ছতা আনতে হবে।
জড়োয়া হাউসের পরিচালক অভি রায় বলেন, বিশ্ববাজারের সঙ্গে তাল মেলাতে প্রযুক্তির সঙ্গে সময়োপযোগী শিক্ষাসহ আধুনিক মেশিনারিজের সঙ্গে নিজেদের খাপ খাওয়াতে হবে। এ জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ওপর জোর দিতে হবে।
বাজুস স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান ও আপন জুয়েলার্সের কর্ণধার আজাদ আহমেদ বলেন, বিশ্ববাজারে টিকে থাকতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে।
সেমিনারে আরো বক্তব্য দেন বাজুস কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আসলাম খান, রিপনুল হাসান প্রমুখ।





