ভারতের একজন শীর্ষ বিচারপতির একটি মন্তব্য থেকেই জন্ম নিয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক এক ব্যতিক্রমী আন্দোলন। গত মাসে তিনি দেশের বেকার তরুণদের একাংশকে ‘তেলাপোকা’ ও ‘পরজীবী’র সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। সেই মন্তব্য যে এত বড় প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেবে, তা হয়তো তিনি কল্পনাও করেননি।
বিচারপতির ওই বক্তব্য ঘিরে ভারতের তরুণ সমাজের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হওয়া প্রতিবাদ অল্প সময়েই ব্যাপক আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দীর্ঘ শাসনামলে এটিকে অন্যতম বড় অনলাইন প্রতিবাদ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
এই ক্ষোভ থেকেই গড়ে ওঠে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)। অনলাইনে বিপুল জনপ্রিয়তা পাওয়া এই ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক উদ্যোগ বাস্তব জগতেও প্রভাব ফেলতে পারে কি না, তার প্রথম বড় পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় দিল্লির রাজপথে। আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা, ৩০ বছর বয়সী অভিজিৎ দীপকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশে ফিরে প্রথমবারের মতো সরাসরি বিক্ষোভ কর্মসূচির নেতৃত্ব দেন।
দ্য টেলিগ্রাফকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দীপকে বলেন, রাষ্ট্রব্যবস্থার চোখে তরুণেরা যেন মূল্যহীন কীটপতঙ্গ। তাঁদের সহজেই উপেক্ষা করা হয়। কিন্তু তেলাপোকার মতোই তারা প্রতিকূল পরিবেশেও টিকে থাকতে জানে। তাঁদের দমন করা যেতে পারে, কিন্তু পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়।
ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তের বিতর্কিত মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় দীপকে সিজেপি গঠন করেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নামের সঙ্গে মিল রেখে তিনি দলের নাম দেন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’।
একটি শুনানির সময় প্রধান বিচারপতি মন্তব্য করেছিলেন, কিছু তরুণ চাকরি বা পেশাগত অবস্থান তৈরি করতে না পেরে গণমাধ্যমকর্মী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী, তথ্য অধিকারকর্মী বা অ্যাকটিভিস্ট হয়ে অন্যদের সমালোচনায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন। পরে তিনি দাবি করেন, মন্তব্যটি মূলত ভুয়া ডিগ্রিধারীদের উদ্দেশে করা হয়েছিল। কিন্তু ততক্ষণে তা তরুণদের মধ্যে প্রতিবাদের প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
প্রথমে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের মাধ্যমে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ দ্রুত ভারতের অন্যতম আলোচিত অনলাইন আন্দোলনে রূপ নেয়। শুধু ইনস্টাগ্রামেই সিজেপির অনুসারীর সংখ্যা ২ কোটি ২০ লাখ ছাড়িয়েছে। এই জনপ্রিয়তা তরুণদের হতাশা ও ক্ষোভের গভীরতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে। তাঁদের অভিযোগ, দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব তাঁদের সমস্যাকে গুরুত্ব দিচ্ছে না।
দীপকের ভাষায়, তাঁর দল ‘অলস, বেকার ও চিরসত্যবাদীদের’ প্রতিনিধিত্ব করে। ভারতের ১৪২ কোটি জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি মানুষের বয়স ৩০ বছরের নিচে। এই বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীর উদ্বেগ ও হতাশাই আন্দোলনের প্রধান শক্তি।
বিশেষ করে দেশের পরীক্ষাব্যবস্থাকে ঘিরে চলমান সংকট তরুণদের মধ্যে অসন্তোষ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রতি বছর লাখ লাখ শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা ও সরকারি চাকরির আশায় কঠিন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশ নেন। কিন্তু প্রশ্নপত্র ফাঁস, মূল্যায়নে ভুল এবং প্রযুক্তিগত ত্রুটির মতো ঘটনা শিক্ষার্থীদের আস্থায় বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে। অনেকেই এসব ঘটনাকে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন।
দীপকের মতে, পরীক্ষা–সংক্রান্ত অনিয়ম আসলে বৃহত্তর একটি সংকটের বহিঃপ্রকাশ। বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল অর্থনীতিগুলোর একটি হওয়া সত্ত্বেও ভারতের বিপুলসংখ্যক তরুণ মনে করেন, তাঁদের যোগ্যতা ও আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে না।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ১৫ থেকে ২০ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার ৯ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে এসেছে, যা আগের বছরের তুলনায় কিছুটা কম। তবে বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার প্রায় ১৬ শতাংশ। অন্যদিকে আজিম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০ থেকে ২৯ বছর বয়সী বেকারদের ৬৭ শতাংশই বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতক। এ তথ্য শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মধ্যকার গভীর বৈষম্যকে স্পষ্ট করে।
দীপকে মনে করেন, সিজেপি মূলত বেকারত্ব, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি ক্রমবর্ধমান অসন্তোষের প্রতিফলন। তাঁর ভাষায়, ভারতের তরুণেরা নিজেদের ক্রমশ অবহেলিত মনে করছেন। শিক্ষাব্যবস্থা ও সরকারি পরীক্ষা পদ্ধতি নিয়ে তাঁদের আস্থা ভেঙে পড়ছে, আর সরকার এসব বিষয়ে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে না।
দিল্লিতে অনুষ্ঠিত প্রথম বড় বিক্ষোভে শত শত তরুণ অংশ নেন। অনেকের হাতে ছিল তেলাপোকার প্রতীক ও বিভিন্ন স্লোগানসংবলিত প্ল্যাকার্ড। আন্দোলনের প্রধান দাবি ছিল শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ।
দীপকের অভিযোগ, একের পর এক পরীক্ষাজনিত বিতর্কের পরও সরকার জবাবদিহি এড়িয়ে যাচ্ছে। তাঁর প্রশ্ন, এত বড় বিশৃঙ্খলার পরও একজন শিক্ষামন্ত্রী কীভাবে দায়িত্বে বহাল থাকেন? বিক্ষোভে অংশ নেওয়া তরুণেরা স্লোগান দেন—‘তেলাপোকা আসছে, ধর্মেন্দ্র প্রধান যাচ্ছে।’
তরুণদের কাছে দীপকের জনপ্রিয়তার একটি কারণ তাঁর ব্যক্তিগত জীবনসংগ্রাম। মহারাষ্ট্রের সম্ভাজি নগরে দলিত পরিবারে জন্ম নেওয়া দীপকে বলেন, জাতিগত বৈষম্য ও সামাজিক অসমতার অভিজ্ঞতা তাঁর রাজনৈতিক চেতনা গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
২০২৪ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার আগে তিনি আম আদমি পার্টির যোগাযোগ কৌশলবিদ হিসেবে কাজ করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেন্দ্রিক রাজনৈতিক প্রচারণায় অভিজ্ঞতা থাকায় অনলাইন আন্দোলন সংগঠনে তিনি বিশেষ সুবিধা পেয়েছেন।
দীপকে নিজেকে সাধারণ একজন তরুণ হিসেবেই তুলে ধরেন। তাঁর দাবি, উন্নত ভবিষ্যতের সন্ধানে দেশ ছাড়ার অভিজ্ঞতা কিংবা চাকরি ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ—এসব অনুভূতি ভারতের লাখো তরুণের সঙ্গে তাঁর মিল তৈরি করেছে।
তাঁর মতে, অনুসারীদের কাছ থেকে তিনি সবচেয়ে বেশি যে দুটি বিষয় শুনেছেন, তা হলো উদ্বেগ এবং আশা। অনেক শিক্ষার্থী বছরের পর বছর প্রস্তুতির পর পরীক্ষা বাতিল হওয়ার বেদনার কথা জানিয়েছেন। আবার অনেকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, আন্দোলন আরও বড় হলে তাঁরা সরাসরি অংশ নেবেন।
এমন সময়ে সিজেপির উত্থান ঘটেছে, যখন বিজেপি এখনো ভারতের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। যদিও প্রধানমন্ত্রী মোদি বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় নির্বাচিত নেতাদের একজন হিসেবে বিবেচিত হন, তবু তরুণদের এই অসন্তোষ নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
গত মার্চে প্রকাশিত মর্নিং কনসাল্টের জরিপে দেখা যায়, ৬৮ শতাংশ ভারতীয় মোদির কাজের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। ফলে যেকোনো বিরোধী আন্দোলনের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবেই বিবেচিত হয়।
তবে সিজেপির দ্রুত বিস্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে—মোদি যুগে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের মধ্যে কি বিজেপির প্রতি আস্থার ঘাটতি তৈরি হচ্ছে?
দীপকে অবশ্য সিজেপিকে সরাসরি নির্বাচনী শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে চান না। তাঁর মতে, পরিসংখ্যানই বাস্তবতা তুলে ধরছে। লাখ লাখ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পরও সরকার যদি দায়ী ব্যক্তিদের রক্ষা করে, তাহলে একটি পুরো প্রজন্মের আনুগত্য ধরে রাখা কঠিন হবে।
নাগরিক সমাজভিত্তিক সংগঠন ‘ভারত জোড়ো অভিযান’-এর জাতীয় আহ্বায়ক যোগেন্দ্র যাদব অবশ্য এই আন্দোলনের তাৎপর্য নিয়ে অতিরিক্ত উচ্ছ্বাস দেখাতে সতর্ক করেছেন। তাঁর মতে, সিজেপিকে এখনই পূর্ণাঙ্গ আন্দোলন না বলে একটি রাজনৈতিক ‘মুহূর্ত’ হিসেবে দেখা বেশি যৌক্তিক।
যাদব বলেন, এটি মূলত মোদি সরকারের প্রতি, বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে বাড়তে থাকা অস্বস্তির বহিঃপ্রকাশ। একই সঙ্গে এটি বিরোধী রাজনীতির দুর্বলতা এবং তৃণমূল পর্যায়ে জমে থাকা অর্থনৈতিক চাপ, হতাশা ও ক্ষোভের প্রতিফলন।
তাঁর মতে, সমসাময়িক ভারতের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য হলো—একদিকে মানুষের অসন্তোষ বাড়ছে, অন্যদিকে নির্বাচন, গণমাধ্যম ও বিচারব্যবস্থার মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর সরকারের প্রভাবও শক্তিশালী হচ্ছে।
যাদব আরও বলেন, বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো জনগণের এই ক্ষোভকে কার্যকরভাবে সংগঠিত করতে পারছে না। ফলে সেই শূন্যস্থান থেকেই সিজেপির মতো উদ্যোগের উত্থান ঘটছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দেখা গেছে, কৌতুক, মিম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেন্দ্রিক আন্দোলন অনেক সময় প্রথাগত বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির চেয়েও বেশি প্রভাব ফেলতে পারে। যাদবের মতে, তেলাপোকা পার্টি সেই প্রবণতারই একটি উদাহরণ।
দীপকেরও বিশ্বাস, বর্তমান তরুণ প্রজন্মের ক্ষোভ কোনো একক রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে নয়; বরং পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতিই তাঁদের অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। তাঁর ভাষায়, প্রথাগত দলগুলো তরুণদের কেবল ভোটব্যাংক হিসেবে দেখে। নির্বাচনের সময় তাঁদের প্রয়োজন হয়, কিন্তু তাঁদের বাস্তব সমস্যাগুলো নিয়ে সারা বছর কাজ করা হয় না।
তিনি বলেন, রাজনীতি কোনো মৌসুমি কর্মকাণ্ড নয়। এটি প্রতিনিয়ত জবাবদিহি দাবি করার এবং নাগরিকদের সমস্যার সমাধান খোঁজার একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া।





