ইরান-মার্কিন সমঝোতার খসড়া ‘ইসলামাবাদ ঘোষণা’ প্রকাশ

ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরায়েলি অতর্কিত হামলার ফলে শুরু হওয়া যুদ্ধের সমাপ্তি হতে যাচ্ছে ‘ইসলামাবাদ ঘোষণা’র মাধ্যমে। দীর্ঘ কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পর পাকিস্তান যুদ্ধ বন্ধের উদ্যোগে সফল হতে যাচ্ছে। বিশ্বের শান্তিকামী মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে।

আলোচনার মধ্যেই আবার হামলা-পাল্টা হামলা চলতে থাকে, ফলে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। সেই অনিশ্চয়তার অবসান ঘটতে যাচ্ছে ১৪ দফা ‘ইসলামাবাদ ঘোষণা’য় স্বাক্ষরের মাধ্যমে।

বুধবার, পাঠ্যটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশের আগেই, সিএনএন একজন মার্কিন কর্মকর্তার কাছ থেকে প্রাপ্ত খসড়া চুক্তির একটি কপি প্রকাশ করে। এই সপ্তাহে ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জি-৭ সম্মেলনে নথিটি দেখেছেন এমন একজন কূটনীতিক তা নিশ্চিত করেছে বলে সংবাদ মাধ্যমটি জানায়। এছাড়া, আলোচনার বিষয়ে অবগত আরও দুইজন কূটনৈতিক সূত্রও এর সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

সিএনএন সূত্রে ১৪ দফার খসড়া নিম্নরূপ:

১. যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান, এবং বর্তমান যুদ্ধে তাদের মিত্ররা, এই সমঝোতা স্মারক (MOU) স্বাক্ষরের মাধ্যমে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান অবিলম্বে ও স্থায়ীভাবে বন্ধ করার ঘোষণা দিচ্ছে। উভয় পক্ষ ভবিষ্যতে একে অপরের বিরুদ্ধে কোনো যুদ্ধ বা সামরিক অভিযান শুরু করবে না এবং বলপ্রয়োগ বা বলপ্রয়োগের হুমকি থেকেও বিরত থাকবে। পাশাপাশি লেবাননের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা নিশ্চিত করা হবে। চূড়ান্ত চুক্তিতে এসব বিষয় স্থায়ীভাবে নিশ্চিত করা হবে।

২. যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একে অপরের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতাকে সম্মান করবে এবং পরস্পরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না।

৩. উভয় দেশ সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তি নিয়ে আলোচনা ও সমঝোতায় পৌঁছাতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। পারস্পরিক সম্মতিতে এই সময় বাড়ানো যেতে পারে।

৪. এই সমঝোতা স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত নৌ অবরোধ ও অন্যান্য বাধা অপসারণ শুরু করবে এবং ৩০ দিনের মধ্যে সম্পূর্ণভাবে তা তুলে নেবে। এই সময়ে ইরান যুদ্ধ-পূর্ব পর্যায়ের জাহাজ চলাচল পুনঃস্থাপনের ব্যবস্থা করবে। চূড়ান্ত চুক্তির ৩০ দিনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের নিকটবর্তী এলাকা থেকে তার বাহিনী সরিয়ে নেওয়ারও অঙ্গীকার করছে।

৫.সমঝোতা স্বাক্ষরের পর ইরান সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়ে ৬০ দিনের জন্য কোনো ফি ছাড়া বাণিজ্যিক জাহাজকে পারস্য উপসাগর ও ওমান সাগরের মধ্যে নিরাপদে চলাচলের সুযোগ দেবে। বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল অবিলম্বে শুরু হবে এবং প্রযুক্তিগত ও সামরিক বাধা অপসারণ ও মাইন অপসারণের কাজ ৩০ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করা হবে। ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালীর প্রশাসন ও সামুদ্রিক সেবার বিষয়ে ইরান ওমান এবং অন্যান্য উপসাগরীয় উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে আলোচনা করবে।

৬. যুক্তরাষ্ট্র তার আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে মিলে ইরানের পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অন্তত ৩০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি পরিকল্পনা প্রণয়ন করবে। এই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন পদ্ধতি ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তির অংশ হিসেবে নির্ধারিত হবে। প্রয়োজনীয় সব লাইসেন্স, ছাড়পত্র ও অনুমোদন যুক্তরাষ্ট্র প্রদান করবে।

৭. চূড়ান্ত চুক্তির অংশ হিসেবে নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করবে। এর মধ্যে থাকবে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাব, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) গভর্নর বোর্ডের সিদ্ধান্ত এবং সব মার্কিন একতরফা (প্রাথমিক ও গৌণ) নিষেধাজ্ঞা। উভয় পক্ষ এ বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে স্বীকার করেছে।

৮. ইরান পুনরায় নিশ্চিত করছে যে তারা পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন বা তৈরি করবে না। উভয় দেশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত কীভাবে নিষ্পত্তি করা হবে সে বিষয়ে একটি পারস্পরিকভাবে সম্মত প্রক্রিয়া নির্ধারণ করবে। ন্যূনতম পদ্ধতি হিসেবে আএইএ -এর তত্ত্বাবধানে ইরানের অভ্যন্তরেই উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামকে নিম্নমাত্রায় নামিয়ে আনা হবে। এছাড়া ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও অন্যান্য পারমাণবিক চাহিদা নিয়ে আলোচনা হবে। চূড়ান্ত চুক্তিতে এসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

৯. চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত উভয় দেশ বর্তমান অবস্থা বজায় রাখবে। ইরান তার বর্তমান পারমাণবিক কর্মসূচিতে কোনো পরিবর্তন আনবে না এবং যুক্তরাষ্ট্র নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে না বা অঞ্চলে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করবে না।

১০. সমঝোতা স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গে এবং নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় ইরানের অপরিশোধিত তেল, পেট্রোলিয়াম পণ্য ও সংশ্লিষ্ট সেবার (ব্যাংকিং, বীমা, পরিবহন ইত্যাদি) জন্য প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র প্রদান করবে।

১১. এই সমঝোতা বাস্তবায়নের পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের জব্দ বা সীমাবদ্ধ তহবিল ও সম্পদ ব্যবহারের জন্য সম্পূর্ণভাবে উন্মুক্ত করবে। এ অর্থ মুক্ত করার পদ্ধতি আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে। ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক যাকে চূড়ান্ত সুবিধাভোগী হিসেবে নির্ধারণ করবে, তার কাছে অর্থ ব্যবহারের সুযোগ নিশ্চিত করা হবে। যুক্তরাষ্ট্র এ জন্য প্রয়োজনীয় সব অনুমোদন দেবে।

১২. সমঝোতার সফল বাস্তবায়ন এবং ভবিষ্যৎ চূড়ান্ত চুক্তি মেনে চলা নিশ্চিত করতে একটি কার্যকর পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গঠন করা হবে।

১৩. সমঝোতা স্বাক্ষরের পর এবং ১, ৪, ৫, ১০ ও ১১ নম্বর অনুচ্ছেদের বাস্তবায়ন শুরু হওয়ার শর্তে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান বাকি বিষয়গুলো নিয়ে চূড়ান্ত চুক্তির আলোচনা শুরু করবে।

১৪. চূড়ান্ত চুক্তি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের (ইউএনসি) একটি বাধ্যতামূলক প্রস্তাবের মাধ্যমে অনুমোদিত হবে।

সংক্ষেপে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো

যুদ্ধ ও সামরিক সংঘাত স্থায়ীভাবে বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি।
হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়া।
ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা ধাপে ধাপে প্রত্যাহারের পরিকল্পনা।
ইরানের আটকে থাকা অর্থ ও সম্পদ মুক্ত করার প্রতিশ্রুতি।
ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না বলে পুন-অঙ্গীকার
আইএইএ-এর তত্ত্বাবধানে উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কম সমৃদ্ধ পর্যায়ে নামিয়ে আনার প্রস্তাব।
৬০ দিনের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ চূড়ান্ত চুক্তির লক্ষ্য।
ইরানের পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পরিকল্পনা।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—উভয় পক্ষই নথিটির ভাষা সম্পর্কে গোপনীয়তা বজায় রাখায়, সিএনএনের হাতে পৌঁছানো খসড়া পাঠ্যটি শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে সরাসরি স্বাক্ষরিত হওয়ার অপেক্ষায় থাকা চূড়ান্ত নথির হুবহু ভাষা প্রতিফলিত করবে কি না, তা স্পষ্ট ছিল না। তবে বুধবার সকালে হোয়াইট হাউসের এক মুখপাত্র জানান যে, ওই খসড়া পাঠ্যটি প্রকৃত স্মারকলিপির (মেমোর্যান্ডামের) আসল বিষয়বস্তু প্রতিফলিত করে না।

খসড়া নথি ও চূড়ান্ত পাঠ্যের মধ্যে একটি প্রধান পার্থক্য হলো—ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ নিষ্ক্রিয় করার জন্য একটি ‘ন্যূনতম পদ্ধতি’ (মিনিমাম মেথডোলজি) অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বোমা তৈরির উপযোগী মাত্রার কাছাকাছি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামকে আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার পর্যবেক্ষণের অধীনে নিম্নমাত্রার ইউরেনিয়াম উপাদানের সঙ্গে মিশিয়ে এর সমৃদ্ধির মাত্রা কমিয়ে আনা হবে। খসড়া নথিতে এ ধরনের ভাষা ছিল না।

সূত্র: সিএনএন