ছোটবেলা থেকেই নাদিয়া আহমেদ আর্জেন্টিনার সমর্থক। ম্যারাডোনার গল্প শুনে জন্ম নেওয়া আর্জেন্টিনাপ্রেম বাতিস্তুতা হয়ে লিওনেল মেসির প্রজন্মে এসেও অটুট রয়েছে। অন্যদিকে এফ এস নাঈমের পছন্দের দল জার্মানি।
তবে মেসির মতো একজন কিংবদন্তির খেলা সরাসরি দেখার আগ্রহ তাঁরও ছিল। আর নাদিয়ার তো বলাই বাহুল্য। গত মঙ্গলবার তাঁদের দুজনের ইচ্ছাই পূরণ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় রাতে কানসাস সিটিতে আর্জেন্টিনা-আলজেরিয়া ম্যাচ গ্যালারিতে বসে সরাসরি দেখেছেন এই অভিনয়শিল্পী দম্পতি।
দেশের একটি গণমাধ্যমকে নাদিয়া বলেন, ‘আগে কোনো বিশ্বকাপ ম্যাচ মাঠে বসে দেখার সুযোগ হয়নি। এবারই প্রথম। খেলা দেখতে গিয়ে এতটাই এক্সাইটেড ছিলাম যে বিশ্বাসই হচ্ছিল না, সত্যি সত্যি আর্জেন্টিনার খেলা দেখছি। পুরো ব্যাপারটাই স্বপ্নের মতো লাগছিল।’ অনেক দিন থেকেই তাঁদের বিশ্বকাপের খেলা মাঠে বসে দেখার ইচ্ছা। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ বাংলাদেশের খুব কাছে হলেও ব্যস্ততার কারণে সেবার যেতে পারেননি। তখনই সিদ্ধান্ত নেন, সুযোগ পেলে পরের বিশ্বকাপে অবশ্যই মাঠে বসে খেলা দেখবেন। ২০২৬ বিশ্বকাপ যুক্তরাষ্ট্রে হবে জানার পর থেকেই শুরু করেন পরিকল্পনা।
নাদিয়া জানান, নির্ধারিত সময়ে একাধিক আইডি থেকে টিকিটের জন্য আবেদন করেন তাঁরা। পছন্দের তালিকায় ছিল আর্জেন্টিনা ও জার্মানির কয়েকটি ম্যাচ। কিন্তু শুরুতে বারবার হতাশ হতে হয়েছে। ‘ফিফার কাছ থেকে “সরি” লেখা ই-মেইল পেলেই মন খারাপ হয়ে যেত। মনে হতো, হয়তো এবারও মাঠে বসে বিশ্বকাপ দেখা হবে না। শেষ দিকে এসে কানসাস সিটির এই ম্যাচের টিকিট কেনার সুযোগ পাই। তখন মনে হয়েছিল, অনেক বড় একটা স্বপ্ন পূরণ হতে যাচ্ছে,’ বলেন নাদিয়া।
ম্যাচের দিন সকাল থেকেই স্টেডিয়ামের আশপাশে বিভিন্ন দেশের সমর্থকদের উপস্থিতি, গানবাজনা ও উচ্ছ্বাস তাঁদের মুগ্ধ করে। নাদিয়া বলেন, ‘খেলা শুরু হওয়ার বহু আগে আমরা চলে গিয়েছিলাম। চারপাশে উৎসবমুখর পরিবেশ। নাচ-গান, আনন্দ- সব মিলিয়ে অন্য রকম একটা অনুভূতি। স্টেডিয়ামে ঢোকার জন্য অনেকক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। তখন থেকেই দেখেছি, সবাই উৎসবের মুডে আছে। মাঠে ঢোকার পর সেই উচ্ছ্বাস আরও কয়েক গুণ বেড়ে যায়।’
স্টেডিয়ামে ঢুকেই তাঁদের চোখে পড়ে নীল-সাদা জার্সির সমুদ্র। গ্যালারিজুড়ে আর্জেন্টাইন সমর্থকদের উচ্ছ্বাস, পতাকা আর স্লোগানে তৈরি হয়েছিল অন্য রকম এক আবহ। নাদিয়া বলেন, ‘সরাসরি খেলা না দেখলে এই অনুভূতি বোঝানো কঠিন। সবাই অপেক্ষা করছিল, কখন মেসি মাঠে নামবেন। এর মাঝেও একটু চিন্তা হচ্ছিল। এবারের বিশ্বকাপে অনেক অঘটন ঘটছে, বড় দলগুলোও প্রত্যাশামতো খেলছে না। তবে একটা বিষয় ভেবে ভালো লাগছিল- আজ অন্তত মেসিকে সরাসরি দেখতে পারব।’
মেসির মাঠে নামার মুহূর্তটি ছিল নাদিয়ার কাছে পুরো সফরের সবচেয়ে স্মরণীয় অংশ। তিনি বলেন, ‘আমরা সবাই অপেক্ষা করছিলাম, কখন মেসি মাঠে আসবেন। এরপর স্টেডিয়ামজুড়ে কাউন্টডাউন শুরু হলো- টেন, নাইন, এইট…ওয়ান বলার সঙ্গে সঙ্গে মেসি এসে দাঁড়ালেন। তখন এমন চিৎকার দিয়েছি যে আমার গলার স্বরই বসে গেছে।’ আর্জেন্টিনার সমর্থকদের আবেগও তাঁকে মুগ্ধ করেছে।
নাদিয়া বলেন, ‘খেলা শুরুর আগেই তাঁরা একের পর এক দেশাত্মবোধক গান গাইছিলেন। পুরো একটা অংশ শুধু আর্জেন্টিনার সমর্থকে ভরা ছিল। সবাই মেসির নাম নিচ্ছিল, তাঁকে সম্মান জানাচ্ছিল। খেলা শেষে বের হওয়ার সময়ও তারা গান গাইছিল, রেলিংয়ে তাল মিলিয়ে বাজনা তুলছিল। অসাধারণ একটা অভিজ্ঞতা।’
বাংলাদেশ থেকে এসেছেন শুনে আর্জেন্টাইন সমর্থকদের প্রতিক্রিয়াও ছিল উষ্ণ। নাদিয়া বলেন, ‘স্টেডিয়ামে পৌঁছানোর আগপর্যন্ত অনেকের সঙ্গে কথা হয়েছে। তারা জানতে চেয়েছে, আমরা কোন দেশ থেকে এসেছি। বাংলাদেশ বলার সঙ্গে সঙ্গেই অনেকে বলেছে, “তোমরা আমাদের বন্ধু।” মাঠেও পাশে বসা কয়েকজন বলছিল, আমাদের সঙ্গে খেলা দেখে তাদের খুব ভালো লাগছে।’
ম্যাচ শেষে নাঈম বলেন, ‘টেলিভিশনে মেসির খেলা অনেকবার দেখেছি; কিন্তু স্টেডিয়ামে বসে তাঁর মুভমেন্ট, বল কন্ট্রোল, খেলার গতি বদলে দেওয়ার ক্ষমতা এসব কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা একেবারেই আলাদা। গ্যালারিতে এসে বুঝতে পারছি, কেন তাঁকে বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার বলা হয়। সত্যি বলতে, এটা একটা লাইফটাইম অভিজ্ঞতা।’
নাদিয়া বলেন, ‘প্রথমবার প্রিয় দলের খেলা দেখতে এসে মেসির এমন একটি ম্যাচ দেখার সুযোগ পাব, ভাবিনি। তাঁর খেলা দেখা, সেই আবহের মধ্যে থাকা-সব মিলিয়ে এটি আমাদের জীবনের অন্যতম সেরা অভিজ্ঞতা হয়ে থাকবে। অনেক বছর পরও আমরা এই দিনের কথা মনে রাখব।’
কয়েক মাস ধরেই যুক্তরাষ্ট্রে আছেন নাঈম। সে কারণে গত ২৪ এপ্রিল মেরিল-দেশের একটি গণমাধ্যম পুরস্কারে সেরা অভিনয়শিল্পীর সম্মাননা সশরীরে গ্রহণ করতে পারেননি। তাঁর হয়ে পুরস্কার গ্রহণ করেন স্ত্রী নাদিয়া।





