যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন ইস্যু আবারও জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে উঠে এসেছে। একদিকে আইসের অভিযান ঘিরে দেশজুড়ে বিক্ষোভ, অন্যদিকে সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করা লাখো অভিবাসীর ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা- সব মিলিয়ে ওয়াশিংটনে অভিবাসন সংস্কার নিয়ে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে কিছু নীতিনির্ধারক ও গবেষক “রেড কার্ড” নামে একটি বিকল্প কর্মসূচি সামনে এনে বলছেন, বর্তমান সংকটের বাস্তবসম্মত সমাধান খুঁজতে হলে প্রচলিত রাজনৈতিক অবস্থানের বাইরে নতুন পথ খুঁজতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন সংকট কোনো একক প্রশাসনের সৃষ্টি নয়। কয়েক দশক ধরে আইন প্রয়োগে অসঙ্গতি, সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা এবং কংগ্রেসের দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থার ফলে আজকের জটিল পরিস্থিতির জন্ম হয়েছে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বিপুলসংখ্যক অনথিভুক্ত অভিবাসীর একটি অংশ মনে করেন, তারা সরাসরি বা পরোক্ষভাবে ফেডারেল সরকারের অনুমোদন বা উৎসাহের ভিত্তিতেই দেশে প্রবেশ করেছেন। বিশেষ করে বাইডেন প্রশাসনের সময় মোবাইল অ্যাপভিত্তিক আবেদন ব্যবস্থা, মানবিক প্যারোল কর্মসূচি, অস্থায়ী সহায়তা এবং অন্যান্য প্রশাসনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে অনেক অভিবাসী যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের সুযোগ পেয়েছিলেন।
এ কারণেই এখন তাদের অনেকেই যুক্তি দিচ্ছেন যে তাদের অবস্থানকে সরলভাবে “অবৈধ” হিসেবে চিহ্নিত করা আইনি ও নৈতিকভাবে জটিল।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত কয়েক মিলিয়ন মানুষের বিরুদ্ধে একযোগে বহিষ্কার কার্যক্রম পরিচালনা করা শুধু রাজনৈতিকভাবে নয়, বাস্তবিক অর্থেও অত্যন্ত কঠিন। অভিবাসন আদালতগুলো ইতোমধ্যেই কয়েক মিলিয়ন মামলার জটের মুখে রয়েছে। এর মধ্যে নতুন করে ব্যাপক বহিষ্কার অভিযান শুরু হলে বিচারিক ব্যবস্থা আরও চাপের মুখে পড়বে।
অন্যদিকে অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগকারী সংস্থা ইউএস ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্টের কর্মকর্তারাও সীমাহীন জনবল ও সম্পদের অধিকারী নন। ফলে কে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বহিষ্কারের মুখোমুখি হবে এবং কাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা নিয়ে নীতিগত প্রশ্নও সামনে আসছে।
এই বিতর্কের মধ্যেই আবার আলোচনায় এসেছে ডিফার্ড অ্যাকশন ফর চাইল্ডহুড অ্যারাইভলস বা ডাকা কর্মসূচি। ডাকা মূলত শিশু অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রে আসা অনথিভুক্ত তরুণদের সাময়িক সুরক্ষা দেওয়ার জন্য চালু করা হয়েছিল। এটি একটি অস্থায়ী সমাধান হিসেবে শুরু হলেও এক দশকেরও বেশি সময় পার হয়ে গেছে, অথচ কংগ্রেস এখনো স্থায়ী কোনো আইন প্রণয়ন করতে পারেনি।
ফলে লাখো ডাকা সুবিধাভোগী এখনো অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবনযাপন করছেন। তাদের অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রে বড় হয়েছেন, পড়াশোনা করেছেন এবং কর্মজীবনে প্রবেশ করেছেন, কিন্তু তাদের দীর্ঘমেয়াদি আইনি অবস্থান এখনো ঝুলে আছে।
এই প্রেক্ষাপটে কিছু নীতিনির্ধারক আবারও সামনে আনছেন তথাকথিত “রেড কার্ড” মডেল। ২০১২ সালে অভিবাসন সংস্কার বিষয়ক গবেষক হেলেন ক্রিয়েবল এই ধারণা প্রথম উপস্থাপন করেন। সাবেক হাউস স্পিকার নিউট গিনগ্রিচ-সহ কয়েকজন রক্ষণশীল নেতা তখন এই প্রস্তাবকে সমর্থন করেন।
রেড কার্ড ধারণার মূল ভিত্তি হলো- নাগরিকত্বের পথ থেকে আলাদা একটি বৈধ কর্মসংস্থান অনুমতি ব্যবস্থা গড়ে তোলা। এতে যারা অপরাধে জড়িত নন এবং কাজ করতে ইচ্ছুক, তারা নিবন্ধনের মাধ্যমে বৈধভাবে কাজের অনুমতি পেতে পারেন। তবে এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে গ্রিন কার্ড বা নাগরিকত্বের সুযোগ দেবে না।
সমর্থকদের মতে, এই ব্যবস্থার ফলে আইস তাদের সীমিত সম্পদ ব্যবহার করে সহিংস অপরাধী, মাদক চক্র এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি বিবেচিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করতে পারবে। একই সঙ্গে অনথিভুক্ত কিন্তু কর্মরত লাখো মানুষ বৈধ কর্মসংস্থানের আওতায় আসতে পারবেন।
রেড কার্ড মডেলের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো এটি বেসরকারি খাতনির্ভর। প্রস্তাব অনুযায়ী, লাইসেন্সপ্রাপ্ত কর্মসংস্থান সংস্থাগুলো অভিবাসীদের যাচাই, নিয়োগ এবং কর্মসংস্থানের প্রক্রিয়া পরিচালনা করবে। এতে সরকারের প্রশাসনিক ব্যয় কমবে বলে দাবি করা হচ্ছে।
প্রস্তাবটির সমর্থকরা আরও বলছেন, অংশগ্রহণকারীদের বায়োমেট্রিক পরিচয়, নিরাপত্তা যাচাই এবং বাজারমূল্যের সমপরিমাণ মজুরি নিশ্চিত করা হলে মার্কিন শ্রমিকদের সঙ্গে অন্যায্য প্রতিযোগিতার আশঙ্কাও কমবে।
তবে সমালোচকরা বলছেন, রেড কার্ড পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে তা একটি নতুন ধরনের অস্থায়ী শ্রমিক শ্রেণি তৈরি করতে পারে, যারা বছরের পর বছর যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করলেও স্থায়ী নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত থাকবে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হতে হলে নাগরিকত্ব বা স্থায়ী বসবাসের একটি সুস্পষ্ট পথও থাকতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন বিতর্ক বর্তমানে দুই চরম অবস্থানের মধ্যে আটকে আছে। এক পক্ষ মনে করে অধিকাংশ অনথিভুক্ত অভিবাসীকে দেশে থাকার সুযোগ দেওয়া উচিত, অন্য পক্ষ দ্রুত ও ব্যাপক বহিষ্কারের পক্ষে। কিন্তু বাস্তবতা সম্ভবত এই দুই অবস্থানের মাঝামাঝি কোথাও।
অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ মনে করেন, কৃষি, নির্মাণ, আতিথেয়তা, স্বাস্থ্যসেবা ও সেবা খাতের অনেক অংশ বর্তমানে অভিবাসী শ্রমশক্তির ওপর নির্ভরশীল। ফলে অভিবাসন নীতির যেকোনো বড় পরিবর্তন সরাসরি শ্রমবাজার এবং অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলবে।
ফলে প্রশ্ন এখন শুধু সীমান্ত নিরাপত্তা বা আইসের অভিযান নিয়ে নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্র ভবিষ্যতে কী ধরনের অভিবাসন ব্যবস্থা চায়, সেই মৌলিক প্রশ্ন নিয়েও। কংগ্রেস যদি দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা ভেঙে কার্যকর আইন প্রণয়ন করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে ডাকা, আইস অভিযান এবং লাখো অভিবাসীর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ আরও বহু বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি ও সমাজে বিতর্কের কেন্দ্রে অবস্থান করবে।





