জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের নারীকাণ্ডে তোলপাড় সারা দেশ। সোমবার রাতে এক তরুণীর (১৮) সঙ্গে নজরুল ইসলামের (৭৭) ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
এরপর দলটির নেতা-কর্মীরা দাবি করেন, ভিডিওটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে। পরে ফ্যাক্ট চেকিং প্ল্যাটফর্ম রিউমর স্ক্যানার জানায়, জামায়াত এমপির ভাইরাল হওয়া ভিডিওটি আসল।
এদিকে গতকাল ভিডিওতে থাকা তরুণীকে নিজের স্ত্রী বলে দাবি করেন সাতক্ষীরা-৪ আসনের এই এমপি। গত ১৭ জুন তাঁরা বিয়ে করেন বলে ফেসবুক পোস্টে দাবি করেছেন গাজী নজরুল ইসলাম।
তিনি জানান, মরিয়ম তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী। প্রথম স্ত্রীর সম্মতিতে ওই নারীকে বিয়ে করেছেন তিনি। এদিকে এমপি নজরুল ইসলামের ঘটনায় তথ্য-উপাত্ত নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো ভিডিওর কয়েকটি অংশে দেখা যায়, ওই তরুণীর সঙ্গে গাজী নজরুল ইসলাম একটি কক্ষে অবস্থান করছেন। কোনো অংশে তাঁদের অন্তরঙ্গ অবস্থায় বসে থাকতে দেখা গেছে। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা মুখে পড়েছেন জামায়াতের এই নেতা।
পৃথক আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, কয়েকজন যুবক গাজী নজরুল ইসলামকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘আপনি ওরে কয়দিন আনছেন?’ তখন গাজী নজরুল উত্তরে বলেন, ‘বিশ্বাস করেন, একবার। ওরে নিয়ে আমি একবারই এসেছি।’ এ সময় তিনি জামায়াতের নেতা হয়েও মেয়ে নিয়ে এসে অন্যায় করেছেন বলে স্বীকার করেন।
স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, ভিডিওর ওই তরুণী সম্প্রতি চাকরির জন্য গাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ওই তরুণীর জীবনবৃত্তান্ত (সিভি) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। দেখা যায়, গত ২২ জুন এমপি নজরুল সেই সিভিতে সই করেন।
সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিবকে উদ্দেশ করে এমপি নজরুল ইসলাম সিভিতে লিখেছেন, ‘জোর সুপারিশ করছি’। সেই সিভিতে মরিয়ম খাতুনের বৈবাহিক অবস্থা ‘অবিবাহিত’ লেখা রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে যে ১৭ জুন বিয়ে করে থাকলে ২২ জুন এমপির স্বাক্ষরিত মরিয়মের সিভিতে অবিবাহিত লেখা থাকে কীভাবে?
এদিকে গতকাল দুপুরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে জামায়াতের এমপি গাজী নজরুল ইসলাম ভিডিওতে থাকা সেই তরুণীকে নিজের দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে দাবি করেন। ফেসবুক পোস্টে তিনি বলেন, ‘এ বছরের ১৭ জুন পারিবারিকভাবে এবং আমার প্রথম স্ত্রীর সম্মতিতে আমার দ্বিতীয় স্ত্রীর বাবার বাসায় আমাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়।
আমাদের বিরুদ্ধে প্রচারিত অপপ্রচার ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের কোনো সত্যতা নেই। যারা আমাদের সামাজিক মর্যাদা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও নৈতিক চরিত্র ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে এই ষড়যন্ত্র ও অপপ্রচারে লিপ্ত হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।’
প্রথম ও দ্বিতীয় স্ত্রীর নাম উল্লেখ করে ফেসবুক পোস্টে এই সংসদ সদস্য বলেন, ১৩ জুলাই তিনি প্রথম ও দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিয়ে রাজধানীর মগবাজারে যান। সেখানে তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রীর বাবার ব্যবসায়িক অফিসে সোয়া এক ঘণ্টা অবস্থান করেন।
এ সময় তাঁর গাড়িচালক ও দ্বিতীয় স্ত্রীর মামা ওবায়দুল্লাহ গাড়ি দেখার কথা বলে বাইরে যান। পরে তিনি (ওবায়দুল্লাহ) পাঁচ-সাতজন অপরিচিত ব্যক্তিকে নিয়ে তাঁদের কক্ষে ঢোকেন। তাঁদের জিম্মি করে ১ লাখ টাকা আদায় করেন।
গাজী নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আমি চলাচলের জন্য যে ভাড়া গাড়িটি ব্যবহার করি, ওবায়দুল্লাহর যোগসাজশে পরবর্তী সময়ে সেটিও আটকে রেখে দফায় দফায় আমাদের কাছে কয়েক লাখ টাকা দাবি করা হয়। আমরা টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে আমাদের বিভিন্ন ধরনের হুমকি দেওয়া হয়।
দ্বিতীয় স্ত্রীর পিতার সঙ্গে ওবায়দুল্লাহর পূর্বশত্রুতা ও পারিবারিক বিরোধের জের ধরে এই ষড়যন্ত্রের ঘটনা ঘটানো হয়েছে। পরবর্তী সময়ে হিংসা ও ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে ওবায়দুল্লাহ আমাদের স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও ধারণ করে ও বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়।’
এরপর জামায়াতের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে পাঠানো এক ভিডিওবার্তায় গাজী নজরুল ইসলামের প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ইসলামকে বলতে দেখা যায়, ‘আমার স্বামীর সঙ্গে মরিয়মের বিয়ে হয়েছে। এটা নিয়ে যারা কুৎসা রটাচ্ছে, আমি সেটার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। এ ধরনের অসত্য প্রচার থেকে বিরত না থাকলে আমি আইনি ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হব।’
পরবর্তী সময়ে দ্বিতীয় স্ত্রী দাবি করা মরিয়মের বাবা মাসুম বিল্লাহ এক ভিডিওবার্তায় বলেন, ‘গত ১৩ জুলাই এমপি সাহেবকে নিয়ে যে ভিডিও পোস্ট করা হয়েছে তা আমাদের সামাজিকভাবে হেনস্তা করার উদ্দেশ্যে করা হয়েছে। গত ১৭ জুন আমার বড় মেয়ে মরিয়মের সঙ্গে এমপি সাহেবের বিয়ে হয়। বিয়ের সময় তাঁর প্রথম স্ত্রীসহ আমরা উভয় পরিবারের সকলে উপস্থিত ছিলাম।’
একই ভিডিওতে মরিয়ম বলেন, ‘আমি সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী। আমাদের বিয়ে কোনো গোপন বা অনৈতিক বিষয় নয়। ২০২৬ সালের ১৭ জুন শ্যামনগরে আমার বাবার বাসায় উভয় পরিবারের সম্মতিতে আমাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়। এ সময় আমার স্বামীর প্রথম স্ত্রীও উপস্থিত ছিলেন।
গত ১৩ জুলাই দুই স্ত্রীকে নিয়ে ঢাকা মগবাজারে আমার বাবার অফিসে যাওয়া একটি সম্পূর্ণ পারিবারিক সফর ছিল। সেখানে পরিকল্পিতভাবে একটি অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি তৈরি করা হয় এবং আমাদের স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে মানহানি ও হেনস্তা করা হচ্ছে।’
এদিকে এমপি গাজী নজরুল ইসলামের আত্মগোপনে থাকা সাবেক ড্রাইভার ওবায়দুর রহমান নিজের নিরাপত্তা চেয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন করেছেন। গত ২০ জুলাই প্রধামন্ত্রীর কার্যালয়ে তিনি এ লিখিত আবেদন করেন।
গাজী নজরুল ইসলামের নারীকাণ্ডের প্রকৃত ঘটনার তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে সাংগঠনিক নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। গতকাল সংগঠনটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি এহসানুল মাহবুব জুবায়ের এক বিবৃতিতে বলেন, অতিসম্প্রতি সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে জড়িয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের দিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নজর রাখছে।
ইতোমধ্যেই বিষয়টি নিয়ে গাজী নজরুল ইসলামের নিজের বিবৃতি, তাঁর প্রথম ও দ্বিতীয় স্ত্রী এবং দ্বিতীয় স্ত্রীর পিতার ভিডিও বক্তব্য গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এ বিষয়ে আরও খোঁজখবর নিয়ে এবং প্রকৃত ঘটনার তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সাংগঠনিক নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।





