যুক্তরাষ্ট্রের চাকরির বাজারে স্থবিরতা

চলতি বছরের জুলাই মাসে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজার অপ্রত্যাশিতভাবে স্থবির হয়ে পড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাত্র তিন মাস আগে এটি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য একটি রাজনৈতিক ধাক্কা হয়ে এসেছে। একই সঙ্গে দেশটির ফেডারেল রিজার্ভের নীতিনির্ধারকদের জন্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

জুলাই মাসে নিয়োগকর্তারা ২৩,০০০ হাজার কর্মসংস্থান ছাঁটাই করেছেন। এছাড়া ‘এপি’-র তথ্য অনুযায়ী, শ্রম বিভাগের সংশোধিত পরিসংখ্যানে মে ও জুন মাসের কর্মসংস্থানের তালিকা থেকে আরও ১,০৩,০০০ পদ কমিয়ে দেখানো হয়েছে।

বেকারত্বের হার কমেছে ঠিকই, অন্যদিকে হাজার হাজার মানুষ শ্রমবাজার থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। ফলে কাজের জন্য প্রতিযোগিতাকারীর সংখ্যা কমে গেছে। স্থানীয় সময় শুক্রবার(৮ জুলাই) শ্রম বিভাগের প্রকাশিত জুলাই মাসের কর্মসংস্থান সংক্রান্ত পরিসংখ্যান মার্কিন শ্রমবাজারের জন্য একটি বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা দিয়েছে। একইসঙ্গে মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির কংগ্রেসের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার প্রচেষ্টার ঠিক তিন মাস আগে এই ফলাফল ট্রাম্পের জন্যও একটি নেতিবাচক বার্তা বয়ে এনেছে।

বিশ্লেষকদের ধারণা ছিল, গত মাসে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির সংখ্যা ১ লাখের কাছাকাছি পৌঁছাবে। জুলাই মাসে স্থানীয় সরকারি স্কুলগুলোতে ৫০ হাজার, রেস্তোরাঁ ও বারে ২৬ হাজার এবং খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানে ১৯ হাজার কর্মসংস্থান কমে এসেছে।

গত বছরর জুনে দেশটিতে বেকারত্বের হার ছিল ৪.১ শতাংশ। এই হার কমার মূল কারণ হলো গত মাসে ২ লাখ ৬৪ হাজার মানুষ শ্রমবাজার থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। কর্মক্ষম বা কাজ খুঁজছেন এমন মানুষের হার কমে ৬১.৪ শতাংশে নেমে এসেছে, যা ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারির পর সর্বনিম্ন।

চাকরি বিষয়ক ওয়েবসাইট ‘গ্লাসডোর’-এর প্রধান অর্থনীতিবিদ ড্যানিয়েল ঝাও বলেন, ‘এটিকে কোনোভাবেই ভালো কিছু হিসেবে সাজিয়ে-গুছিয়ে উপস্থাপন করা সম্ভব নয়। তিনি আরও যোগ করেন, জুলাই মাসের জন্য এটি কোনো ভালো প্রতিবেদন নয়।

মার্কিন শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়া এবং উৎপাদন খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে বিশাল শুল্ক আরোপকারী ট্রাম্প প্রশাসন উল্লেখ করেছে, নির্মাণ কোম্পানিগুলোতে ২২ হাজার এবং কারখানাগুলোতে ৫ হাজার নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।

হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র কুশ দেশাই বলেছেন, ট্রাম্পের আমলে শিল্পখাতের পুনরুজ্জীবন সঠিক পথেই এগোচ্ছে। তিনি আরও যোগ করেন, সরকারি খাতে কর্মসংস্থান উল্লেখযোগ্যভাবে সংকুচিত হওয়া সত্ত্বেও জুলাই মাসে উৎপাদন ও কারখানা নির্মাণ খাতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট দীর্ঘদিন ধরেই দাবি করে আসছেন, তার অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় দেশের মাটিতে জন্ম নেওয়া নাগরিকদের জন্য কর্মসংস্থান বাড়ছে; তবে জুলাইয়ের পরিসংখ্যান সেই দাবিকে কিছুটা দুর্বল করে দিয়েছে। শুক্রবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত ১২ মাসে যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া নাগরিকদের কর্মসংস্থান ৭ লাখ ২০ হাজার কমেছে। যদিও এ বিষয়ে হোয়াইট হাউস কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

এ ধরনের পরিসংখ্যানের ক্ষেত্রে কিছু অসামঞ্জস্য থাকতে পারে। এগুলো ঋতুভিত্তিক পরিবর্তনের (সিজনাল চেঞ্জ) জন্য সমন্বয় করা হয় না এবং দেশের মাটিতে জন্ম নেওয়া নাগরিকদের মোট কর্মসংস্থানের নির্ভরযোগ্য পরিমাপক হিসেবেও বিবেচিত হয় না। তবে ট্রাম্পের অভিবাসন-বিরোধী কঠোর পদক্ষেপের কারণে দেশটিতে জন্ম নেওয়া মানুষের উপকারে আসছে। তার প্রমাণ হিসেবে প্রশাসন এই পরিসংখ্যানকেই তুলে ধরেছিল।

ফেডারেল রিজার্ভের নীতিনির্ধারকরা সুদের হার বাড়ানোর বিষয়ে দ্বিধাবিভক্ত। গত পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে মূল্যস্ফীতি তাদের ২ শতাংশের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে, যা নিয়ন্ত্রণে সুদের হার বাড়ানো উচিত কি না, তা নিয়ে এই মতভেদ। গত সপ্তাহের বৈঠকে ‘ফেড’ সুদের হার অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নিলেও তিনজন কর্মকর্তা এর বিরোধিতা করে সুদের হার বাড়ানোর পক্ষে মত দিয়েছিলেন। ওয়াল স্ট্রিটের ব্যবসায়ীরা ধারণা করছিলেন, এ বছরের শেষের দিকে সুদের হার বাড়ানো হতে পারে। তবে শুক্রবারের প্রতিবেদনটি সুদের হার বাড়ানোর প্রক্রিয়াকে অন্তত কিছুটা বিলম্বিত করতে পারে।

গ্লাসডোর-এর ঝাও বলেন, সুদের হার বাড়ানো যৌক্তিক কি না, তা নিয়ে আলোচনার সময় ফেডকে অবশ্যই শ্রমবাজারের পরিস্থিতির কথা বিবেচনায় রাখতে হবে। তিনি আরও যোগ করেন, আজকের প্রতিবেদনে উঠে আসা দুর্বল চিত্রটি ফেডকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে কিছুটা হলেও ভাবিয়ে তুলবে।

জুলাই মাসে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল সামান্য। গত মাসে গড় ঘণ্টা প্রতি মজুরি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩.২ শতাংশ বেড়েছে, যা ২০২১ সালের মে মাসের পর থেকে সর্বনিম্ন বার্ষিক বৃদ্ধির হার। জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয়ের চাপে আমেরিকান পরিবারগুলো যখন হিমশিম খাচ্ছে, ঠিক তখনই মজুরি বৃদ্ধির এই ধীরগতি দেখা যাচ্ছে।

নেভি ফেডারেল ক্রেডিট ইউনিয়নের প্রধান অর্থনীতিবিদ হেদার লং এটি কর্মসংস্থান বিষয়ক একটি হতাশাজনক প্রতিবেদন বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজার আবারও স্থবির হয়ে পড়ছে; এর ফলে ফেডারেল রিজার্ভের কাজ যেমন কঠিন হবে, তেমনি চাকরিপ্রার্থীদের জন্যও পরিস্থিতি আরও দুরূহ হয়ে উঠবে।

শ্রম বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত মাসে নারীরা ৩২,০০০ কর্মসংস্থান হারিয়েছেন। অর্থাৎ জুলাই মাসে মোট যে সংখ্যক চাকরি কমেছে, তার পুরোটাই ছিল নারীদের ক্ষেত্রে। তবে সামগ্রিক বিচারে নারীদের কর্মসংস্থানের চিত্রটি ইতিবাচকই ছিল। গত ১২ মাসে তারা ৩,২১,০০০ নতুন চাকরি পেয়েছেন, যেখানে একই সময়ে পুরুষরা হারিয়েছেন ৫,০০০ চাকরি।

অর্থনীতিবিদরা উল্লেখ করেছেন, জুলাই মাসে বেসরকারি খাতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি অব্যাহত ছিল। অন্যদিকে সরকারি স্কুলগুলোতে কর্মী সংখ্যায় বড় ধরনের পতন দেখা গেছে, তা হয়তো ‘সিজনাল অ্যাডজাস্টমেন্ট’ বা ঋতুভিত্তিক পরিসংখ্যান সমন্বয়ের কারণে সৃষ্ট কোনো ত্রুটি হতে পারে।

পারস্য উপসাগরীয় সংঘাতের ফলে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং পারিবারিক বাজেটের ওপর চাপের মুখেও এ বছর নিয়োগ কার্যক্রম বেশ ভালোভাবেই ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার ছিল সন্তোষজনক, যদিও তা খুব একটা চমকপ্রদ ছিল না। কিছু প্রতিষ্ঠান শূন্যপদ পূরণে হিমশিম খাচ্ছে; আবার অনেকে মানুষের পরিবর্তে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াচ্ছে।

বর্তমানে কর্মরত আমেরিকানরা এক অস্বাভাবিক রকমের চাকরির নিরাপত্তা উপভোগ করছেন। ঐতিহাসিকভাবে বিচার করলে কর্মী ছাঁটাইয়ের হার এখন বেশ কম। কয়েক বছর আগে কোভিড-১৯ লকডাউনের পরবর্তী সময়ে হঠাৎ কর্মী সংকটের মুখে পড়ে যেসব কোম্পানি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, তারা এখন আর বর্তমান কর্মীদের হারিয়ে ফেলার ঝুঁকি নিতে চাইছে না।

জুলাই মাসের এক সপ্তাহে বেকারত্ব ভাতার জন্য আবেদনকারী আমেরিকানদের সংখ্যা গত ৫০ বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছিল। ডেটা ফার্ম ‘ফ্যাক্টসেট’-এর জরিপ অনুযায়ী, জুন মাসে বেকারত্বের হার কমে ৪.২ শতাংশে (যা গত এক বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন) নেমে এসেছিল এবং গত মাসেও তা একই অবস্থানে ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তবে যেসব আমেরিকান চাকরি হারিয়েছেন অথবা যারা প্রথমবারের মতো শ্রমবাজারে প্রবেশের চেষ্টা করছেন তাদের জন্য পরিস্থিতি বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে। অর্থনীতিবিদরা শ্রমবাজারের এই অস্বাভাবিক অবস্থাকে বর্ণনা করতে ‘নো হায়ার, নো ফায়ার’ (নতুন নিয়োগও নেই, ছাঁটাইও নেই) পরিভাষাটি ব্যবহার করছেন।

চলতি বছরে নিয়োগকর্তারা প্রতি মাসে গড়ে ৬১,০০০ নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করছেন; তুলনায় ২০২৫ সালে এই সংখ্যাটি ছিল মাত্র ৯,৭০০। যা ২০০২ সালের পর মন্দা-বহির্ভূত সময়ে নিয়োগের ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন হার ছিল। তবে এ বছরের কর্মসংস্থান সৃষ্টির হার ২০২৩-২০২৪ সালের মাসিক গড় ১,৬৬,০০০-এর চেয়ে বেশ কম; এমনকি কোভিড-১৯ লকডাউন-পরবর্তী ২০২১-২০২২ সালের নিয়োগ-উচ্ছ্বাসের সময়ের তুলনায়ও তা অনেক কম।

তবে স্বস্তির বিষয় হলো, বেকারত্বের হার বাড়তে না দেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের এখন আর আগের মতো বিপুল সংখ্যক নতুন কর্মসংস্থানের প্রয়োজন নেই। ট্রাম্পের কঠোর অভিবাসন নীতি এবং ‘বেবি বুমার’ প্রজন্মের (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে জন্ম নেওয়া বিশাল জনগোষ্ঠী) অবসর গ্রহণের ফলে চাকরির বাজারে প্রতিযোগীর সংখ্যা কমেছে।

ফেডারেল রিজার্ভের একটি গবেষণার তথ্যমতে, মাসিক নিয়োগের পর্যায়ে বেকারত্বের হার স্থিতিশীল থাকে। অর্থাৎ ‘ব্রেক-ইভেন’ হার ২০২৩-২০২৪ সালের ১,৫৫,০০০ থেকে কমে সম্ভবত শূন্যের কাছাকাছি নেমে এসেছে।

কর্মসংস্থানের ভবিষ্যৎ পরিস্থিতির ওপর কিছু অনিশ্চয়তার ছায়া পড়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে চলমান সংঘাত, যা জ্বালানির দাম বাড়িয়ে দিয়েছে এবং পরিবারগুলোর বাজেটের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। পাশাপাশি রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উত্থান, যা কর্মীদের আরও দক্ষ ও অধিক আয়ের সুযোগ করে দিতে পারে। অথবা তাদের চাকরি কেড়েও নিতে পারে।

ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অফ সান ফ্রান্সিসকোর গবেষক ইনগ্রিড চেন, মারিয়ানা কুডলিয়াক এবং রিভা মিখলিন এই সপ্তাহে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখেছেন, গত কয়েক বছরে চাকরি পাওয়া বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে, যা সত্যিই বিস্ময়কর।

সাধারণত, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির এমন পর্যায়ে সর্বশেষ মন্দার পর ছয় বছরেরও বেশি সময় পার হওয়ার পর নিয়োগকর্তাদের কর্মীদের এতই প্রয়োজন হয়। তারা তরুণ এবং কম শিক্ষিতদের নিয়োগের ক্ষেত্রেও ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত থাকেন। কিন্তু এবার চিত্রটা ভিন্ন।

চেন, কুডলিয়াক এবং মিখলিন লিখেছেন, কর্মসংস্থানের সুযোগে নতুনদের অন্তর্ভুক্ত করার পরিবর্তে বরং সেই পথটিই সংকুচিত হয়ে আসছে। ফলে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের সুফল আর প্রান্তিক পর্যায়ের কর্মীদের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। তাছাড়া, যেসব বেকার ব্যক্তি সাধারণত সবচেয়ে দ্রুত কাজে ফিরে আসেন। এছাড়া কর্মক্ষম জীবনের সেরা সময়ে (২৫ থেকে ৫৪ বছর বয়সী) থাকা কলেজ-শিক্ষিত ব্যক্তিরা এখন নতুন চাকরি পেতে হিমশিম খাচ্ছেন।

ঠিক কী কারণে চাকরি খোঁজার প্রক্রিয়াটি এত কঠিন হয়ে পড়েছে, সে বিষয়ে সান ফ্রান্সিসকো ফেডের গবেষকরা নিশ্চিত নন। তাদের ধারণা, এর পেছনে অভিবাসন সংক্রান্ত কঠোর পদক্ষেপ, বিশেষ করে প্রযুক্তি কোম্পানি ও সরকারি ঠিকাদারদের মধ্যে নিয়োগের গতি কমে যাওয়া, সরকারি নীতির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নিয়ে অনিশ্চয়তা কিংবা ‘সামগ্রিকভাবে শ্রমবাজারের পরিস্থিতির অবনতির প্রাথমিক লক্ষণ’ এসব কারণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সূত্র: অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস।