কৃষকদের জন্য বিশাল সুখবর, মেগা প্রণোদনা ও কৃষক কার্ডের সুবিধা

কৃষি ও কৃষকের জন্য প্রায় ছয় মাসে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নিয়েছে বিএনপি সরকার। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার গঠনের পর কৃষকের ঋণের বোঝা কমানো থেকে শুরু করে নগদ সহায়তা, সার-বীজে প্রণোদনা, কৃষক কার্ড, সরকারি ব্যবস্থাপনায় কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান-চাল সংগ্রহ, কৃষি বিমার উদ্যোগসহ এ খাতে নেওয়া হয়েছে বেশ কিছু নতুন পদক্ষেপ।

সেচব্যবস্থা সম্প্রসারণে খাল খনন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। সরকারের নীতিনির্ধারকদের দাবি, এসব উদ্যোগের মূল লক্ষ্য মধ্যস্বত্বভোগী ও অনিয়ম কমিয়ে প্রকৃত কৃষকের কাছে সরকারি সুবিধা পৌঁছে দেওয়া এবং উৎপাদন ব্যয় কমানো।

এ প্রসঙ্গে কৃষিমন্ত্রী আমিন-উর রশীদ বলেন, ‘গত নির্বাচনে বিএনপির প্রতিশ্রুতির বেশির ভাগই ছিল কৃষক ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই কৃষকের কল্যাণে নানামুখী পদক্ষেপ নিচ্ছে। নগদ সহায়তা, সার বীজ প্রদান, কৃষক কার্ড চালু, কৃষি ঋণ মওকুফ ও কৃষি বিমা চালু করা হয়েছে।

তিনি বলেন, সরকার বিশ্বাস করে ৭০ ভাগ লোক যে পেশায় আছে তার উন্নতি করা দরকার। ৭০ ভাগ লোক ভালো থাকলে সরকার স্বস্তিতে থাকবে। এ সরকার কৃষি খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে।’

জানা গেছে, গত ২৬ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রিসভায় কৃষকদের জন্য সরকারের অন্যতম বড় সিদ্ধান্ত ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ করা হয়েছে। এ ছাড়া শস্য, ফসল, মৎস্য ও পশুপালন খাতে নেওয়া ঋণ এ সুবিধার আওতায় রয়েছে।

এতে প্রায় ১২ লাখ কৃষক উপকৃত হওয়ার কথা। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এ কর্মসূচির জন্য প্রায় ১ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

কৃষকের কাছে সরকারি সুবিধা সরাসরি পৌঁছে দিতে চালু করা হয়েছে ‘কৃষক কার্ড’। গত ১৪ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে এ কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে কয়েকটি জেলার নির্বাচিত কৃষকদের এ কার্ড দেওয়া হয়েছে।

পর্যায়ক্রমে দেশের বিপুলসংখ্যক কৃষককে এ কার্ডের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। কৃষক কার্ডের মাধ্যমে নগদ সহায়তা, সার-বীজ ও কৃষি উপকরণে ভর্তুকি, স্বল্পসুদের কৃষিঋণ, কৃষিযন্ত্র ব্যবহারের সুবিধা, সেচ, ফসল বিমা এবং কৃষিপণ্য ন্যায্যমূল্যে বিক্রির সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

ভূমিহীন, ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য বছরে ২ হাজার ৫০০ টাকা নগদ সহায়তার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। সরকারের প্রত্যাশা, কৃষক কার্ড চালু হলে প্রকৃত কৃষক শনাক্ত করা সহজ হবে এবং প্রণোদনা বিতরণে অনিয়ম কমবে।

প্রণোদনাএদিকে উৎপাদন বাড়াতে এবং কৃষকের খরচ কমাতে সার ও বীজ সরবরাহে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কৃষি প্রণোদনা ও পুনর্বাসন কর্মসূচির আওতায় ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের বিনামূল্যে সার ও বীজ দেওয়া হচ্ছে। সরকারের হিসাবে, ইতোমধ্যে ২৫ লাখের বেশি ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক বিভিন্ন ধরনের উপকরণ সহায়তা পেয়েছেন।

কৃষকের উৎপাদিত ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চলতি বোরো মৌসুমে সরকার মোট ১৮ লাখ মেট্রিক টন ধান ও চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।

এর মধ্যে ৫ লাখ টন ধান, ১২ লাখ টন সিদ্ধ চাল এবং ১ লাখ টন আতপ চাল সংগ্রহের কথা রয়েছে। কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনার সরকারি মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে কেজিপ্রতি ৩৬ টাকা। সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান সংগ্রহের ফলে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমবে বলে আশা করছে সরকার।

ধান সংগ্রহে ডিজিটাল পদ্ধতির ব্যবহারও বাড়ানো হচ্ছে। কৃষকের নিবন্ধন, নির্বাচন এবং ধান সরবরাহের ক্ষেত্রে প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে প্রকৃত কৃষককে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং সরকারি খাদ্যশস্য সংগ্রহে স্বচ্ছতা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।

কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণের ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে। ট্রাক্টর, হারভেস্টার, রিপারসহ বিভিন্ন কৃষিযন্ত্রে ভর্তুকি দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। কৃষি যান্ত্রিকীকরণ বাড়ানো গেলে একদিকে উৎপাদন ব্যয় কমবে, অন্যদিকে শ্রমিক সংকটের কারণে ফসল কাটতে দেরি হওয়ার ঝুঁকিও কমবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সেচ ব্যবস্থা সম্প্রসারণে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। কৃষি উৎপাদনের জন্য পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা এবং ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমানো এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।

পাশাপাশি কৃষিতে আধুনিক সেচব্যবস্থা সম্প্রসারণের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে কৃষকের ক্ষতি কমাতে কৃষি ও ফসল বিমা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কৃষক কার্ডের সঙ্গে এ সুবিধাকে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, অতিবৃষ্টি বা খরার মতো দুর্যোগে ফসল নষ্ট হলে কৃষক যাতে পুরোপুরি নিঃস্ব হয়ে না পড়েন, এ ব্যবস্থার মাধ্যমে সেই ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। সম্প্রতি বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসনেও উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ধানের বীজ ও চারা সরবরাহের পাশাপাশি গবাদিপশুর চিকিৎসা ও টিকাদান কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। এতে দুর্যোগের পর কৃষকদের দ্রুত উৎপাদনে ফেরানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। কৃষিপণ্যের বহুমুখীকরণ এবং বাজার সম্প্রসারণের বিষয়টিও সরকারের নীতিতে গুরুত্ব পেয়েছে।

পচনশীল কৃষিপণ্য সংরক্ষণে কোল্ড স্টোরেজ ও কোল্ড চেইন সম্প্রসারণ এবং কৃষিপণ্য রপ্তানি বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। রপ্তানিকারকদের জন্য ওয়ান-স্টপ সেবা চালুর উদ্যোগও রয়েছে।