জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কৃষিতে

বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পড়েছে দেশের অর্থনীতির মেরুদ্ন্ড হিসেবে বিবেচিত কৃষিতে। অথচ বাংলাদেশের দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) কৃষি খাতের অবদান প্রায় ১১ শতাংশ থেকে ১৪ শতাংশের মধ্যে। দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ বা তার বেশি মানুষের কর্মসংস্থান সরাসরি এই খাতের ওপর নির্ভরশীল। কৃষি দেশের মানুষের মৌলিক খাদ্য চাহিদা পূরণে প্রধান ভূমিকাও পালন করে। গ্রামীণ জনপদের জীবনযাত্রা এবং দারিদ্র্য বিমোচনে কৃষি এখনো অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তিও কৃষি।

কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোয় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব দেশের কৃষিকে সবচেয়ে বেশি আঘাত করেছে। বাড়তে থাকা তাপমাত্রা, অনিয়মিত বৃষ্টি, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ও খরা—এসব দুর্যোগ কৃষকের জীবন ও কৃষি উৎপাদনকে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে।

বিগত দশকে দেখা গেছে, বর্ষা মৌসুমে কখনো অতিরিক্ত বৃষ্টি হয়ে জমি তলিয়ে যায়, আবার কখনো দীর্ঘ খরায় ফসল নষ্ট হয়। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার সমস্যা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের কারণে লবণাক্ত পানি কৃষিজমিতে ঢুকে মাটির উর্বরতা শক্তি নষ্ট করে দিচ্ছে। এ কারণে ধান, পাট, ডাল, সবজি—সব ধরনের ফসল উৎপাদনে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। লবণাক্ততার কারণে অনেক জায়গায় ঐতিহ্যবাহী আমন বা বোরো চাষই এখন আর সম্ভব হচ্ছে না।

আন্তর্জাতিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান জার্মান ওয়াচে প্রকাশিত গ্লোবাল ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতির বিচারে শীর্ষ ১০ দেশের মধ্যে প্রথমেই বাংলাদেশের অবস্থান। দেশের উপকূলীয় অঞ্চল ও দূরবর্তী দ্বীপগুলোর নিকটবর্তী অঞ্চলে লোনাপানি প্রবেশ করায় সেসব অঞ্চলে উন্মুক্ত জলাশয় ও ভূগর্ভস্থ পানি লবণাক্ত হয়ে পড়েছে। প্রায় ১০ দশমিক ৫৬ লাখ হেক্টর চাষযোগ্য জমি লবণাক্ততার বিভিন্ন মাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ কারণে এসব অঞ্চলের বিশাল পরিমাণ আবাদি জমি পতিত থাকছে।

শুষ্ক মৌসুমে নিয়মিত সামুদ্রিক জোয়ারের সঙ্গে ভূভাগের অনেক গভীরে লবণাক্ত পানি প্রবেশ করে নদীর পানিকে সেচের কাজে ব্যবহারের অনুপযোগী করে তুলছে। গ্যাস নির্গমন বাড়ার কারণে বায়ুমণ্ডল ক্রমেই উত্তপ্ত হচ্ছে। এর প্রভাবে বাংলাদেশে ২০৩০ সাল নাগাদ গড় তাপমাত্রা ১ দশমিক শূন্য ডিগ্রি, ২০৫০ সালে ১ দশমিক ৪ ডিগ্রি এবং ২১০০ সালে ২ সালে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে যেতে পারে। সম্প্রতি দেশে উষ্ণতা ও শৈত্যপ্রবাহের মাত্রা বেড়েছে। শীতকালের ব্যাপ্তি ও শীতের তীব্রতা দুই-ই ক্রমেই কমে আসছে।

বেশির ভাগ রবি ফসলেরই স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়ে ফলনের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। এ ছাড়া শীত মৌসুমে উষ্ণপ্রবাহ দেখা দিলে বেশি সংবেদনশীল ফসল, বিশেষ করে গমের ফলন হ্রাস পাচ্ছে। ধানের ক্ষেত্রে ফুল ফোটা বা পরাগায়নের সময় তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার ওপরে গেলে চিটার সংখ্যা বেড়ে গিয়ে শিষে ধানের সংখ্যা কমে যেতে পারে, যা ধানের ফলনকে কমিয়ে দেবে। উষ্ণতা বাড়ার কারণে গাছের প্রস্বেদনের পরিমাণ বেড়ে যায় এবং অতিরিক্ত সেচের কারণে পানির অভাব হয়। শৈত্যপ্রবাহের কারণে আমের মুকুল নষ্ট হয় ও নারকেলের ফল ধারণ ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনে কৃষি ক্ষেত্রে বন্যা, খরা, লবণাক্ত, জলাবদ্ধতাসহ কৃষি পরিবেশের পরিবর্তনের কারণে জমির উর্বরতা দিন দিন কমে যাচ্ছে। সঙ্গে ফসলের উৎপাদনশীলতাও কমে যাচ্ছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নদীভাঙনের কারণে প্রচুর উৎপাদনশীল জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। প্রতিবছরই নদীর কূল ভেঙে অনেক কৃষিজমি, বসতি, স্থাপনা নদীতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। এতে মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে এবং অনিশ্চিত জীবনের দিকে ধাবিত হচ্ছে। পাহাড়ি এলাকায় অতিবর্ষণের সময় উঁচু এলাকার উপরিভাগের উর্বর মাটি ধুয়ে ক্ষয়ে যায়, এ কারণে প্রায়ই ভূমিধস দেখা দেয়। ফলে এসব এলাকার মাটি ক্রমান্বয়ে উর্বরতা শক্তি হারিয়ে ধীরে ধীরে ফসল উৎপাদনের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। শুধু তা–ই নয়, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশের উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলো মরূকরণসহ জীববৈচিত্র্যকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করছে। ফলে বিভিন্ন উদ্ভিদ ও প্রাণিকুলের বিলুপ্তি ঘটছে।