সংকটের সমাধান হতে পারে ছাদবিদ্যুৎ

সাশ্রয়ী এবং টেকসই সমাধানের অংশ হিসেবে সোলার বা সৌরবিদ্যুতে বিনিয়োগ বাড়ানোর নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। কম বিনিয়োগে বেশি বিদ্যুৎ এবং টেকসই নীতি নেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে আগামী তিন বছরে জাতীয় গ্রিডে ৫ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ যোগ করার পরিকল্পনা নিয়েছে বিএনপি সরকার।

এ খাতে প্রযুক্তিগত সর্বোচ্চ সহায়তা দেবে চীন। শহরে থেকে গ্রাম পর্যন্ত সৌরবিদ্যুতের জাল বিস্তৃতির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে নেট মিটারিংব্যবস্থা সহজ ও দ্রুততর করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

এ খাতে দ্রুত বিনিয়োগ বাড়াতে সরকারি ভবনের ছাদে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের সোলার প্ল্যান্ট স্থাপনের মতো বিনিয়োগ উন্মুক্ত রাখা হয়। যার মাধ্যমে বেসরকারি উদ্যোক্তারা সরকারের কাছে সোলার প্ল্যান্ট থেকে বিদ্যুৎ বিক্রি করতে পারবেন।

এজন্য সৌরবিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগ, উৎপাদন ও সরবরাহসংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়ন করছে সরকার। মোটাদাগে, সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে বিদ্যুতের তীব্র সংকটের কিছুটা সমাধান খুঁজছে সরকার। এই লক্ষ্যেই এত সব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ‘পৃথিবী এখন ক্লিন-গ্রিন এনার্জি পরিচালিত। আমরাও ধীরে ধীরে গ্রিন ফাইন্যান্সের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। এটাই মূলত বিদ্যুৎ খাতের টেকসই বিনিয়োগ। আগামী তিন বছরের মধ্যে বড় অগ্রগতি আনতে পরিল্পনা নিয়ে কাজ করছি।’

অর্থ বিভাগ সূত্র জানায়, জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে বিদ্যুৎ খাতে স্বনির্ভরতার পথে এগোতে বড় ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে আগামী তিন বছরের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে ৫ হাজার মেগাওয়াট নতুন সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে নেট মিটারিংব্যবস্থা সহজ ও দ্রুততর করা হবে।

গত সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের একটি বৈঠকে ওই নীতিমালার খসড়া উপস্থাপন করা হয়। সেই খসড়া অনুমোদনের জন্য শিগগিরই মন্ত্রিসভার বৈঠকে উপস্থাপন করা হবে।

সরকারের এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের জ্বালানি মিশ্রণে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। পাশাপাশি গ্যাস, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), তেল ও কয়লার ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।

তিন বছরে বড় সক্ষমতা : অর্থ বিভাগ সূত্র জানায়, বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা, আমদানি করা জ্বালানির উচ্চমূল্য এবং সাম্প্রতিক জ্বালানিসংকটের প্রেক্ষাপটে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ দ্রুত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এজন্য আগামী তিন বছরে ৫ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে বড় আকারের গ্রাউন্ড-মাউন্টেড সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের পাশাপাশি রুফটপ সোলার প্রকল্প বাস্তবায়নে জোর দেওয়া হচ্ছে।

দেশের বিভিন্ন জেলায় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য উপযুক্ত জমি চিহ্নিত করা, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত এবং দ্রুত টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নথিতে নগরাঞ্চলে নির্দিষ্ট স্থানে ৭০ মেগাওয়াট এবং ন্যূনতম ৬০ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগের কথাও উল্লেখ রয়েছে।

সহজ হচ্ছে নেট মিটারিং : সরকারের পরিকল্পনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে নেট মিটারিং সম্প্রসারণ। সরকারি নথিতে নতুন আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তি এবং বর্তমান প্রক্রিয়ার জটিলতা দূর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থাগুলোকে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।

পাশাপাশি নেট মিটারিং সম্পর্কে প্রচারপ্রচারণা বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে শিল্পকারখানা, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও আবাসিক গ্রাহকের মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে আগ্রহ বাড়ে। নেট মিটারিং সহজ হলে গ্রাহক নিজস্ব ভবনের ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপন করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারবেন। প্রয়োজনের অতিরিক্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহের সুযোগ থাকায় এ ব্যবস্থায় বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।

সরকারি ছাদে বেসরকারি বিনিয়োগ : সরকারি ভবন, প্রতিষ্ঠান ও অবকাঠামোর অব্যবহৃত ছাদকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে লাগানোর পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ভবনে রুফটপ সোলার স্থাপনের বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

এ ক্ষেত্রে বেসরকারি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। ফলে সরকারের নিজস্ব অর্থায়নের বাইরে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগের মাধ্যমে দ্রুত সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।

কমতে পারে জ্বালানি আমদানির চাপ

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ এখনো তুলনামূলকভাবে কম। ফলে ৫ হাজার মেগাওয়াট নতুন সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত করা সম্ভব হলে বিদ্যুৎ খাতের জ্বালানি মিশ্রণে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসবে। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য গ্যাস বা আমদানি করা এলএনজি, তেল ও কয়লার প্রয়োজন হয় না। ফলে দীর্ঘ মেয়াদে এসব জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় ও জ্বালানি আমদানিতে বৈদেশিক মুদ্রার চাপ কমতে পারে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, রুফটপ সোলার ও নেট মিটারিং বাড়লে দিনের বেলায় গ্রিডের ওপর চাপও কমবে। বিশেষ করে শিল্প ও বাণিজ্যিক ভবনে নিজস্ব সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের সুযোগ বাড়লে প্রচলিত বিদ্যুতের চাহিদার ওপর চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব হবে।

নতুন বিনিয়োগের বাজার

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ৫ হাজার মেগাওয়াটের লক্ষ্য বাস্তবায়নে সৌর প্যানেল, ইনভার্টার, ব্যাটারি, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, প্রকৌশল ও নির্মাণ খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে। ফলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হতে পারে। তবে নির্ধারিত সময়ে লক্ষ্য অর্জনের জন্য দ্রুত প্রকল্প অনুমোদন, জমি নির্বাচন, অর্থায়ন, গ্রিড সংযোগ এবং টেন্ডার প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে নেট মিটারিংয়ের বিদ্যমান জটিলতা পুরোপুরি দূর করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সরকারের এ উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে এটি শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর কর্মসূচি হবে না; বরং জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা কমানো, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি বড় নীতিগত পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হবে।