সার্কাসে নানা শারীরিক কসরত দেখিয়ে বা নাচ-গান করে মানুষকে তাক লাগিয়ে দেওয়া কিংবা কুংফু প্রদর্শনীতে হাততালি কুড়ানো এক কথা, আর কারখানার জটিল কিংবা দৈনন্দিন সাধারণ কাজে দক্ষ মানুষের বিকল্প হয়ে ওঠা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত হিউম্যানয়েড বা মানবসদৃশ রোবটের প্রযুক্তিতে চীন বর্তমানে বিশ্বজুড়ে নিজেদের আধিপত্য জাহির করতে চাইলেও সাম্প্রতিক নানা গবেষণায় এই রোবটগুলোর প্রকৃত কাজের দক্ষতা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন উঠেছে।
কুংফু প্রদর্শনী কিংবা চমৎকার নাচ দিয়ে তারা ইন্টারনেটে ব্যাপক সাড়া ফেললেও শিল্পকারখানায় বাস্তবে কাজ করার ক্ষেত্রে এসব রোবট এখনো অত্যন্ত ধীরগতির এবং ব্যাপক ভুলত্রুটিতে ভরা। চীনের উচ্চাভিলাষী শিল্পনীতির সাথে বাস্তব প্রযুক্তির ক্ষমতার মারাত্মক ব্যবধান তৈরি হয়েছে। যার ফলে বাজারে চাহিদার তুলনায় এই কৃত্রিম প্রযুক্তিপণ্যটির উৎপাদন ক্ষমতা কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
চীনের দক্ষিণাঞ্চলের লিউঝৌ শহরের একটি ট্রেনিং সেন্টারের দিকে তাকালেই রোবটিক্স জগতের এই বৈপরীত্য স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। সেখানে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা শতাধিক মানবসদৃশ রোবটকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন একদল কর্মী। হেডসেট ও নিয়ন্ত্রক যন্ত্রের সাহায্যে তারা রোবটগুলোকে নুডলস প্যাকেট করা, কফি বানানো বা বাক্স সরানোর মতো নিতান্তই সহজ কিছু কাজ শেখানোর চেষ্টা করছেন। তবে এই রোবটগুলোর কাজ অত্যন্ত ধীর এবং অপ্রকৃতিস্থ।
প্রশিক্ষণদাতাদের মতে, একজন নতুন কর্মীর নির্দেশনায় একটি রোবট প্রায় ৩০০ বার চেষ্টা করার পর হয়তো মাত্র একটি সঠিক অঙ্গভঙ্গি করতে পারে। অভিজ্ঞ প্রশিক্ষণদাতাদের ক্ষেত্রেও ৫০ বারে মাত্র একবার সঠিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া সম্ভব হয়। এই প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর মূল উদ্দেশ্য হলো রোবটগুলোর জন্য ভিশন-ল্যাঙ্গুয়েজ-অ্যাকশন ডাটা বা শারীরিক বুদ্ধিমত্তা তৈরি করা, যাতে তারা মানুষের চারপাশের পরিবেশ দেখে সিদ্ধান্ত নিয়ে বাস্তব জগতে কাজ করতে পারে। কিন্তু চরম সত্য হলো, বিপুল সরকারি ভর্তুকি আর বিশাল পরিচালন খরচের বিপরীতে পর্যাপ্ত বাণিজ্যিক চাহিদা না থাকায় এসব ডাটা সেন্টার বা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর লাভজনক হওয়ার কোনো স্পষ্ট পথ খোলা নেই।
চীন সরকার যেভাবে বৈদ্যুতিক গাড়ি ও সোলার প্যানেল শিল্পে বিপুল ভর্তুকি দিয়ে বৈশ্বিক বাজার দখল করেছিল, রোবটিক্স খাতেও ঠিক একই কৌশল প্রয়োগ করা হচ্ছে। কিন্তু গাড়ি বা সৌর শক্তি যখন মূলধারার শিল্পে রূপ নিয়েছিল, তখনকার বাজার পরিস্থিতি আর বর্তমানের প্রাথমিক পর্যায়ের হিউম্যানয়েড প্রযুক্তির অবকাঠামো একেবারেই এক নয়। চীনে বর্তমানে দেড় শতাধিক রোবট প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যা সে দেশের মোট বৈদ্যুতিক গাড়ি ব্র্যান্ডের সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে।
ব্যাংক অব আমেরিকা গ্লোবাল রিসার্চের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর বিশ্বব্যাপী সরবরাহ করা প্রায় ২০ হাজার মানবসদৃশ রোবটের ৯৫ শতাংশই চীনের তৈরি। তবে বাস্তবে বাজারের প্রকৃত চাহিদার বদলে সরকারি অনুদান এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর কৃত্রিম ক্রয়ের ওপর ভিত্তি করেই এই উৎপাদন বিশাল রূপ ধারণ করেছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি চীন সরকারের একটি পরিকল্পিত কৃত্রিম প্রতিযোগিতা তৈরি করার কৌশল হলেও এর ফলে একটি বিশাল প্রযুক্তিগত বুদবুদ তৈরি হওয়ার চরম ঝুঁকি দেখা দিয়েছে।
কারখানার কাজের ক্ষেত্রে মূল বিবেচ্য বিষয় হলো সময় এবং নির্ভুলতা। কিন্তু সেই স্থানে সাধারণ ইন্ডাস্ট্রিয়াল বা রোবোটিক আর্ম অনেক বেশি সস্তা, দ্রুতগতি সম্পন্ন এবং বিশ্বাসযোগ্য। স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি ও মানবসদৃশ রোবট প্রস্তুতকারকদের পরীক্ষায় দেখা গেছে, গাড়ি তৈরির মতো সংবেদনশীল ও দ্রুততম উৎপাদন ব্যবস্থায় এসব রোবট এখনো মানুষ বা প্রচলিত যন্ত্রের তুলনায় অনেক পিছিয়ে। তাছাড়া ফার্মেসির মতো তুলনামূলক নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে সামান্য সফলতার মুখ দেখলেও সামান্য আলো বা কোণের পরিবর্তন হলেই এসব রোবট চরম বিভ্রান্তিতে পড়ে যায়। হিউম্যানয়েড রোবটগুলোকে অন্তত মানুষের সমকক্ষ শারীরিক বুদ্ধিমত্তায় পৌঁছাতে কোটি কোটি ঘণ্টার বাস্তব ডাটা প্রয়োজন, যা কেবল বিপুল মূলধন বা দ্রুত উৎপাদন করে রাতারাতি অর্জন করা সম্ভব নয়। ফলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে সরকারি ভর্তুকির ধাক্কা সামলাতে না পেরে চীনের অনেক রোবট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এক মারাত্মক দেউলিয়া বা বাজার সংকোচনের মুখে পড়তে যাচ্ছে বলে মনে করছেন এই খাতের প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা।
সূত্র: রয়টার্স





