এলডিসি থেকে টেকসই ও স্থিতিশীল উত্তরণের জন্য এসএমই, কৃষি, ঔষধসহ অন্যান্য শিল্পের জন্য খাতভিত্তিক সুনির্দিষ্ট কর্মকৌশল গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন শিল্পদ্যোক্তারা। তাদের মতে, শুধু কর্মকৌশল গ্রহণ করলেই হবে না, তার সঠিক বাস্তবায়ন এবং নিয়মিত মনিটরিং নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া, স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধি, দক্ষতা উন্নয়ন, গবেষণা ও উদ্ভাবন, প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি, সহজ অর্থায়ন, লজিস্টিকস সাপোর্ট, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিতকরণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ।
সোমবার (৩১ আগস্ট) মতিঝিলে এফবিসিসিআই’র উদ্যোগে আয়োজিত এলডিসি উত্তরণের জন্য সংস্কার কার্যক্রমে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধিকল্পে কর্মকৌশল নির্ধারণ সংক্রান্ত মতবিনিময় সভায় এসব কথা উঠে আসে। সভায় সভাপতিত্ব করেন এফবিসিসিআই’র প্রশাসক মো. ফজলুল হক।
সভার শুরুতে বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনার ওপর একটি প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন এফবিসিসিআই’র মহাসচিব মো. আলমগীর। প্রতিবেদনে জানানো হয়, এলডিসি উত্তরণের ফলে অন্যতম রপ্তানি বাজার ইউরোপে জিএসপি, ইবিএ -এর মতো শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা হারাবে বাংলাদেশ। কড়াকড়ি আসবে ঔষধ শিল্পসহ বিভিন্ন শিল্পের মেধাস্বত্ব বিধিবিধানেও। এমন পরিস্থিতিতে, সরকারের সংস্কার কার্যক্রমে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।
সভার মুক্ত আলোচনায় অংশ নিয়ে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা জানান, এলডিসি উত্তরণের জন্য কর্মকৌশল বাস্তবসম্মত না হলে কার্যকর সুফল মিলবে না। এ জন্য মাঠপর্যায় থেকে সঠিক তথ্য ও উপাত্ত সংগ্রহ করে খাত সমূহের অগ্রাধিকারভিত্তিক প্রয়োজন কোনটি তা খুঁজে বেড় করার প্রস্তাব দেন আলোচকরা।
এ সময় ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) এর সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট রাজিব এইচ চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশের দর কষাকষির সক্ষমতা (নেগোসিয়েশন ক্যাপাসিটি) নাই। এখানে আমাদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডোকে সম্পূর্ণ কার্যকর করতে হবে।
বাংলাদেশ প্লাস্টিক পণ্য প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি শামীম আহমেদ জানান, দেশের প্লাস্টিক শিল্পের বড় অংশই কপি পণ্য তৈরি করে। এলডিসি উত্তরণের পর ঔষধ শিল্পের মতো এই খাতের জন্যও মেধাস্বত্ব ইস্যু বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাড়াবে। এমন পরিস্থিতিতে – প্লাস্টিক, হালকা প্রকৌশলসহ কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের সুরক্ষায় সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে দ্রুত অ্যাকশন প্ল্যান গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
টেকসই এলডিসি উত্তরণের জন্য গৃহীত কর্মকৌশল যেন শুধু ঢাকা কেন্দ্রীক শিল্পের জন্য না হয় সে বিষয়ে এফবিসিসিআই‘কে সজাগ থাকার পরামর্শ দিয়েছেন পটুয়াখালী উইমেন চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি ইসমাত জেরিন খান। প্রান্তিক পর্যায়ের নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং লজিস্টিকস সহযোগিতা আহ্বান করেছেন তিনি।
এলডিসি উত্তরণের পর শিল্পের ইন্টেলেকচুয়্যাল প্রোপার্টি রাইট (মেধাস্বত্ব অধিকার) নিয়ে বাংলাদেশ বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে বলে জানান বাংলাদেশ অ্যাগ্রো কেমিক্যাল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএএমএ) সভাপতি কে এস এম মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, এলডিসি উত্তরণের পর ঔষধ শিল্প, কৃষি, এগ্রো কেমিক্যাল খাত প্রভৃতি ভুক্তভোগি হবে। এ জন্য বাংলাদেশ প্যাটেন্টের আওতাভুক্ত যেসব পণ্য উৎপাদন করে দ্রুত সেগুলোর নিবন্ধন সম্পন্ন করতে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।
সভায় উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বাংলাদেশ রেজিওনাল কানেক্টিভিটি প্রজেক্টে- ১ এর জাতীয় বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ মো. মুনির চৌধুরী। তিনি বলেন, বেসরকারি খাতকে নিজ নিজ চ্যালেঞ্জ গুলোকে সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করতে হবে। সেগুলো সমাধানের জন্য সরকার ও বেসরকারি খাতের সমন্বয়ে কাউন্সিল গঠন এবং ফলাফল ভিত্তিক কর্মকৌশল গ্রহণের পরামর্শ দেন তিনি।
এ সময়, সভায় সকল জেলা চেম্বার ও খাতভিত্তিক অ্যাসোসিয়েশন সমূহকে নিজ নিজ খাতের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনাসমূহ লিখিতভাবে এফবিসিসিআই‘কে জানানোর আহ্বান জানান এফবিসিসিআই’র প্রশাসক মো. ফজলুল হক। সেসব প্রস্তাবনা বিশ্লেষণ করে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তুলে ধরা হবে বলে জানান তিনি।
মো. ফজলুল হক বলেন, তিন বছর বাড়তি যে সময় পাওয়া গেল সেটিকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে হবে। বেসরকারি খাতের সক্ষমতা বাড়ানো গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাও বৃদ্ধি পাবে। এ জন্য সকল জেলা চেম্বার ও খাত ভিত্তিক অ্যাসোসিয়েশনের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
মতবিনিময় সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন, এফবিসিসিআই’র সাবেক প্রশাসক মো. হাফিজুর রহমান, সাপোর্ট টু সাস্টেইনেবল গ্রেজুয়েশন প্রজেক্টের ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড এক্সপার্ট নেছার আহমেদ, এফবিসিসিআই’র সহায়ক কমিটির সদস্যবৃন্দ, এফবিসিসিআই’র সাবেক পরিচালকবৃন্দ, এফবিসিসিআই’র মহাসচিব মো. আলমগীর, বিজিএমইএ’র পরিচালক শেখ হোসেন মোহাম্মদ মুস্তাফিজ, বিকেএমইএ’র ভাইস প্রেসেডেন্ট মোহাম্মদ রাশেদ, বিজেএমএ’র চেয়ারম্যান আবুল হোসেন, বিটিএমএ’র পরিচালক সাজিদ ইশরাক, বাংলাদেশ উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি সংগীতা আহমেদ, বাংলাদেশ বহুমুখী পাটজাত পণ্য প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মো. রাশেদুল করিম মুন্না, বিভিন্ন চেম্বার ও অ্যাসোসিয়েশনের নেতৃবৃন্দ, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয়, বিএসটিআই এবং আইসিটি ডিভিশনের প্রতিনিধিবৃন্দ।




