দেশে প্রতিদিন প্রায় দেড় হাজার রোগী ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। এ রোগীদের চিকিৎসায় বাড়ছে রক্ত ও রক্তের উপাদানের চাহিদা। গত তিন মাস ধরে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য রক্তের চাহিদা বেড়েছে প্রায় তিন গুণ। এই সংকটে বিপদে পড়েছেন থ্যালাসেমিয়া, ক্যানসার, দুর্ঘটনায় আহত এবং জরুরি অপারেশন প্রয়োজন রোগীরা। এমনিতেই সবসময় রক্তের চাহিদা থাকেই, তার মধ্যে বিপদ বাড়িয়েছে ডেঙ্গু। ডেঙ্গু, ইনফ্লুয়েঞ্জাসহ বিভিন্ন জ্বরে নিয়মিত স্বেচ্ছায় রক্তদাতাদের অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়ায় রক্ত সংগ্রহে চাপ তৈরি হচ্ছে।
বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া সমিতি ও হাসপাতালের নির্বাহী পরিচালক ড. এ কে এম একরামুল হোসেন বলেন, আমাদের হাসপাতালে প্রতি মাসে প্রায় ১ হাজার ২০০ ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন হয়। এর ৪০ শতাংশ স্বেচ্ছাসেবক এবং বাকিটা রোগীর স্বজনদের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়। এমনিতেই কিছুটা সংকট থাকে। কিন্তু ডেঙ্গুর মৌসুমে রক্তের সংকট আরও বেড়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, দেশে এ বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ১৮ হাজার ৫০২ জন, মারা গেছেন ৩৬৮ জন। ডেঙ্গু হলেই প্লাটিলেট কমে যাওয়ার আশঙ্কায় রোগীর স্বজনদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
রাজারবাগ কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালের ব্লাড ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, আগস্টে ডেঙ্গু রোগীর জন্য প্লাটিলেট সরবরাহ করা হয়েছে ১৬১ ব্যাগ, সেপ্টেম্বরে ২৪৬ ব্যাগ, অক্টোবরের ২০ দিনে ১৭৪ ব্যাগ সরবরাহ করা হয়েছে। অন্য সময়ের তুলনায় ডেঙ্গুর মৌসুমে চাহিদা বেড়েছে। সপ্তাহের সাত দিন ২৪ ঘণ্টায় এই ব্লাড ব্যাংক থেকে রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে, ক্লিনিকে চিকিৎসারত রোগীদের রক্ত সরবরাহ করা হয়।
এ ব্যাপারে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ট্রান্সফিউশন মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. আশরাফুল হক বলেন, ‘এবার ডেঙ্গুর প্রকোপ হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় অন্যান্য বছরের তুলনায় রক্ত ও রক্তের উপাদানের চাহিদা অনেকটা বেড়েছে। এই বাড়তি চাহিদার সঙ্গে রক্তদাতাদের সমন্বয় করার জন্য পর্যাপ্ত সময় পাওয়া যায়নি। এখানে প্রস্তুতির ঘাটতি বলতে রক্ত সংগ্রহের সরঞ্জাম বা ব্যবস্থাপনার অভাব বোঝাচ্ছি না। আমাদের অনেক স্বেচ্ছায় রক্তদাতা আছেন, যাঁরা প্রয়োজন হলে রক্ত দেওয়ার জন্য অপেক্ষা করেন। আবার অনেকে দীর্ঘদিন রক্ত দেওয়া হয়নি ভেবে নিজ উদ্যোগেই রক্ত দেন। স্বাভাবিক সময়ে এই দুই ধরনের রক্তদাতার অংশগ্রহণে একটা ভারসাম্য থাকে। কিন্তু হঠাৎ চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় সেই ভারসাম্য বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।’ তিনি আরও বলেন, এ সময়ে রক্তদাতারাও ডেঙ্গু, ইনফ্লুয়েঞ্জাসহ বিভিন্ন জ্বরে আক্রান্ত হচ্ছেন। ফলে নিয়মিত রক্তদাতাদের একটি অংশ সাময়িকভাবে রক্ত দিতে পারছেন না। এই পরিস্থিতি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শুধু জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজলে চলবে না। সারা বছর পরিকল্পিতভাবে স্বেচ্ছায় রক্তদানের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে। ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর কাকরাইল এলাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি ১২ বছরের তৃণা আফরোজ। তারা বাবা শাহীন আফরোজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিয়ে জানান, তৃণার প্লাটিলেট প্রয়োজন। শাহীনের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, মেয়ের প্লাটিলেট কমে যাওয়ায় যেকোনো সময় প্রয়োজন হতে পারে বলে জানান চিকিৎসকরা। পরিচিতদের মধ্যে রক্তের ব্যবস্থা না হওয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খুঁজি। কিন্তু সেখানেও সাড়া না পাওয়ায় দুটি ব্লাড ব্যাংক ঘুড়ে প্লাটিলেটের ব্যবস্থা হয়।
ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের জন্য রক্ত ও রক্তের বিভিন্ন উপাদানের চাহিদা বেড়েছে জানিয়েছে ঢাকা কোয়ান্টাম স্বেচ্ছা রক্তদান কার্যক্রম। এই প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ আগস্ট থেকে ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গু রোগীদের জন্য মোট ৩ হাজার ২০১ ব্যাগ রক্ত ও রক্তের বিভিন্ন উপাদান সরবরাহ করা হয়েছে। আগস্টে যেখানে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য ৭৪১ ইউনিট রক্ত ও রক্তের উপাদান সরবরাহ করা হয়েছিল, সেখানে সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৪৪২ ইউনিটে। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে সরবরাহ বেড়েছে প্রায় ৯৫ শতাংশ। অক্টোবরের প্রথম ১৯ দিনেই ডেঙ্গু রোগীদের জন্য ১ হাজার ১৮ ইউনিট রক্ত ও রক্তের বিভিন্ন উপাদান সরবরাহ করা হয়েছে। অসম্পূর্ণ মাসের এই হিসাবও ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসায় রক্তের চাহিদার চাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
কোয়ান্টাম স্বেচ্ছায় রক্তদাতা কার্যক্রমের অর্গানাইজার শামীমা নাজনীন বলেন, ‘আগস্ট-অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত বৃদ্ধি পাওয়ায় রক্তের চাহিদা বেড়ে যায়। বিভিন্ন রোগীর চাহিদা বিভিন্ন রকম থাকে। অনেক রোগীর শুধু প্লাটিলেট বা অন্য কোনো উপাদান প্রয়োজন হয়। কারও আবার সম্পূর্ণ রক্তের প্রয়োজন হয়। তবে আমাদের স্বেচ্ছায় রক্তদাতাদের অনেকে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন, অনেকে ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্ত হওয়ায় রক্ত দিতে পারছেন না। ফলে রক্ত সংগ্রহে ঘাটতি দেখা দিচ্ছে।’





