রোমাঞ্চে ভরা চার গোলের ম্যাচ, শেষ হাসি জাপানের

ডালাস স্টেডিয়ামে নেদারল্যান্ডস ও জাপানের ম্যাচটি ছিল বিশ্বকাপের এবারের আসরের সবচেয়ে উপভোগ্য লড়াইগুলোর একটি। ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে দুই দলের অবস্থানের পার্থক্য বিশাল-নেদারল্যান্ডস পঞ্চম, জাপান ১৮তম। কিন্তু মাঠের ফুটবল যে কাগজের হিসাব মেনে চলে না, সেটাই আরও একবার প্রমাণ করল এশিয়ার প্রতিনিধিরা। দুইবার পিছিয়ে পড়েও শেষ পর্যন্ত ২-২ গোলের ড্র আদায় করে নেয় জাপান, আর তাতে ডাচদের নিশ্চিত জয় হাতছাড়া হয় ম্যাচের শেষ মুহূর্তে।

আজ ম্যাচের প্রথমার্ধে দুই দলই সতর্ক ফুটবল খেলেছে। মাঝমাঠে লড়াই ছিল তীব্র, তবে আক্রমণে ধার কম থাকায় গোলশূন্যভাবেই বিরতিতে যায় ম্যাচ। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধ শুরু হওয়ার পর বদলে যায় দৃশ্যপট। ম্যাচে আসে গতি, আক্রমণে বাড়ে তীক্ষ্ণতা, আর দর্শকরা উপভোগ করেন চার গোলের এক অসাধারণ লড়াই।

৫১ মিনিটে নেদারল্যান্ডসকে এগিয়ে দেন অধিনায়ক ভার্জিল ফন ডাইক। ডান দিক থেকে রায়ান গ্রাভেনবার্চের নিখুঁত ক্রস থেকে হেডে বল জালে পাঠান তিনি। বড় কোনো আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে ডাচ অধিনায়কের এটি ছিল প্রথম গোল। গোলটি যেন লিভারপুলের দুই সতীর্থের বোঝাপড়ারই প্রতিফলন।

তবে জাপান খুব দ্রুতই ম্যাচে ফিরে আসে। মাত্র ছয় মিনিট পর বাঁ প্রান্ত দিয়ে এগিয়ে এসে কেইতো নাকামুরা জোরালো শট নেন। ডাচ ডিফেন্ডারের পায়ে সামান্য দিক বদলে বল জালে জড়িয়ে গেলে সমতায় ফেরে ‘সামুরাই ব্লু’রা। গোলটি শুধু স্কোরলাইন বদলায়নি, ম্যাচের গতি ও আত্মবিশ্বাসও ফিরিয়ে দেয় জাপানের খেলোয়াড়দের মধ্যে।

সমতা ফিরলেও নেদারল্যান্ডস আবারও এগিয়ে যায় ৬৪ মিনিটে। এবারও গোল তৈরির কারিগর গ্রাভেনবার্চ। তাঁর পাস থেকে ক্রিসেনসিও সামারভিল বাঁ দিক থেকে চমৎকার শটে বল জালে পাঠান। জাপানের গোলরক্ষক জিওন সুজুকি ম্যাচজুড়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সেভ করলেও এই শট ঠেকানোর সুযোগ পাননি।

২-১ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ার পর অনেক দলই রক্ষণাত্মক হয়ে যেতে পারত। কিন্তু জাপান বরং আক্রমণের গতি আরও বাড়ায়। একের পর এক আক্রমণে ডাচ রক্ষণকে ব্যতিব্যস্ত করে তোলে তারা। ফিনিশিংয়ের ঘাটতিতে কাঙ্ক্ষিত গোল আসছিল না, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের অধ্যবসায়ের পুরস্কার মেলে ৮৮ মিনিটে। কর্নার থেকে আসা বলে বদলি ফরোয়ার্ড কোকি ওগাওয়া প্রথম হেড করেন। বলটি এরপর দাইচি কামাদার মাথা ছুঁয়ে জালে প্রবেশ করলে উল্লাসে ফেটে পড়ে জাপানি সমর্থকেরা। স্কোরবোর্ডে গোলদাতা হিসেবে নাম ওঠে কামাদার, তবে আক্রমণটির মূল ভিত্তি গড়ে দিয়েছিলেন ওগাওয়া।

শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে ড্রয়ের আনন্দে মেতে ওঠে প্রায় ৭০ হাজার দর্শকের স্টেডিয়ামের একাংশ। কারণ এই ড্র শুধুমাত্র একটি পয়েন্ট অর্জনের গল্প নয়; এটি জাপানের অদম্য মানসিকতারও প্রতিচ্ছবি। কাতার বিশ্বকাপে জার্মানি ও স্পেনের বিপক্ষেও পিছিয়ে পড়ে ম্যাচ জিতেছিল তারা। এবারও একই দৃঢ়তা দেখিয়ে শক্তিশালী নেদারল্যান্ডসকে জয়বঞ্চিত করল।

অন্যদিকে নেদারল্যান্ডসের জন্য ফলটি কিছুটা হতাশার হলেও তাদের একটি উল্লেখযোগ্য রেকর্ড অক্ষুণ্ন রয়েছে। বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে টানা ১৭ ম্যাচ অপরাজিত থাকার কীর্তি ধরে রেখেছে রোনাল্ড কোমানের দল। তবে দুইবার এগিয়ে থেকেও জয় নিশ্চিত করতে না পারা ডাচদের জন্য সতর্কবার্তাও হয়ে থাকবে।

বিশ্বকাপের শুরুতেই এশিয়ার দলগুলোর পারফরম্যান্স বিশেষভাবে নজর কাড়ছে। দক্ষিণ কোরিয়া ও অস্ট্রেলিয়া নিজেদের প্রথম ম্যাচে জয় পেয়েছে। কাতার ও জাপান দু’দলই পিছিয়ে পড়েও ড্র আদায় করেছে। ফলে আবারও প্রমাণিত হচ্ছে, বিশ্ব ফুটবলে এশিয়ান দলগুলো আর কেবল অংশগ্রহণকারী নয়; তারা এখন প্রতিপক্ষের জন্য সত্যিকারের চ্যালেঞ্জ!

ডালাসের এই নাটকীয় ম্যাচ তাই শুধু একটি ড্রয়ের গল্প নয়। এটি সাহস, প্রত্যাবর্তন আর শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়ে যাওয়ার এক অনুপ্রেরণামূলক ফুটবল কাহিনি, যেখানে জাপান দেখিয়ে দিয়েছে-তাদের কখনোই হিসাবের বাইরে রাখা যায় না!