রাত তখন গভীর। হাসপাতালের করিডোরে নীরবতা ভেঙে হঠাৎ ভেসে আসে নবজাতকের কান্না। এক পাশে ক্লান্ত কিন্তু স্বস্তির হাসিতে ভেঙে পড়েন এক মা, আর অন্য পাশে নার্সের কোলে নতুন জীবনের প্রথম আলোর দেখা। এই দৃশ্যই এখন নিয়মিত হয়ে উঠেছে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে- যেখানে স্বাভাবিক প্রসবই হয়ে উঠেছে এক নীরব বিপ্লব।
দেশজুড়ে যখন প্রসূতি সেবায় সিজারিয়ান প্রসবের প্রবণতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, তখন ফটিকছড়ির এই সরকারি হাসপাতালটি নরমাল ডেলিভারিকে কেন্দ্র করে গড়ে তুলেছে এক ভিন্ন বাস্তবতা। এখানে অপ্রয়োজনীয় সিজার এড়িয়ে স্বাভাবিক প্রসবকে উৎসাহিত করা হচ্ছে নিয়মিত চর্চার অংশ হিসেবে।
সম্প্রতি মাত্র ২৪ ঘণ্টায় এই হাসপাতালে স্বাভাবিক প্রসবের মাধ্যমে জন্ম নিয়েছে ১৭টি শিশু। এর মধ্যে ১২টি শিশুর জন্ম হয়েছে রাতের শিফটে। সবশেষ গত ২৪ ঘন্টায় আরও ১০ শিশু স্বাভাবিক প্রসবের মাধ্যমে জন্ম নিয়েছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত পাঁচ মাসে নরমাল ডেলিভারির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪৮৯-এ। শুধু চলতি মাসের প্রথম ১৩ দিনেই শতাধিক স্বাভাবিক প্রসব সম্পন্ন হয়েছে।
ফটিকছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রসূতি ওয়ার্ড এখন আর শুধু চিকিৎসার জায়গা নয়, অনেক মায়ের কাছে এটি এখন নিরাপদ আশ্রয়ের নাম।
দাঁতমারা ইউনিয়ন থেকে আসা কাউছার আলম সেই অভিজ্ঞতার কথাই শোনালেন। তাঁর ভাষায়, ভেবেছিলাম সিজার লাগবে, অনেক টাকা খরচ হবে। কিন্তু ডাক্তার-নার্সরা যেভাবে পাশে ছিলেন, তাতে কোনো অপারেশন ছাড়াই আমার মেয়ের জন্ম হয়েছে। কোনো খরচও হয়নি।
একই রকম অভিজ্ঞতা আরেক প্রসূতি মায়ের। তিনি বলেন, শুরুতে খুব ভয় ছিল, কিন্তু নার্সরা যেভাবে সাহস দিয়েছেন, তাতে স্বাভাবিকভাবে সন্তান জন্ম দিতে পেরেছি।
এই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন মাঠপর্যায়ের নার্স ও মিডওয়াইফরা। নার্সিং সুপারভাইজার কৃষ্ণা প্রভাত দেবী জানান, প্রসবপূর্ব সময় থেকেই মায়েদের মানসিক প্রস্তুতিকে এখানে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, আমরা শুধু প্রসব করাই না, মায়েদের ভয় দূর করার কাজ করি। অনেক ক্ষেত্রেই ভয় থেকেই সিজারের প্রবণতা তৈরি হয়।
হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আএমও) ডা. কামরুল ইসলাম বার্তা২৪.কমকে বলেন, আমাদের লক্ষ্য অপ্রয়োজনীয় সিজার কমিয়ে নিরাপদ নরমাল ডেলিভারি নিশ্চিত করা। ২৪ ঘণ্টা একটি দক্ষ টিম এই সেবায় নিয়োজিত রয়েছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে বেসরকারি পর্যায়ে সিজারিয়ান প্রসবের হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ফটিকছড়ির এই মডেল দেখাচ্ছে- সঠিক ব্যবস্থাপনা থাকলে সরকারি হাসপাতালেই নিরাপদ ও মানবিক প্রসূতি সেবা সম্ভব।
হাসপাতাল সূত্র বলছে, মাতৃমৃত্যু কমানো এবং নিরাপদ প্রসব নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ধারাবাহিক সাফল্যের জন্য প্রতিষ্ঠানটি একাধিকবার জেলা ও জাতীয় পর্যায়ে স্বীকৃতি পেয়েছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তৌহিদুল আলম বলেন, আমরা চাই প্রসবকে একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে। গর্ভকালীন সময় থেকেই মায়েদের প্রস্তুত করা হয়, যাতে তারা ভয়মুক্ত থাকেন।
তিনি আরও বলেন, সিজার প্রয়োজন হলে অবশ্যই করা হয়, তবে অপ্রয়োজনীয় সিজার নিরুৎসাহিত করাই আমাদের মূল লক্ষ্য।
তিনি জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আরও ১০ জন মায়ের নিরাপদ প্রসব সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।





