কান্জির হাড়ীর নীরব ঢিবিতে মিলছে প্রাচীন সভ্যতার পদচিহ্ন

দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলার ৮ নম্বর মাহমুদপুর ইউনিয়নের চকজুনিদ এলাকায় অবস্থিত ঐতিহাসিক কান্জির হাড়ী প্রত্নস্থলে চলমান খননকাজে মিলছে প্রাচীন সভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ পদচিহ্ন। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এ খনন কার্যক্রমে প্রাচীন স্থাপত্য কাঠামো, দেয়াল ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন আলামত উদ্ধার হওয়ায় এলাকাজুড়ে ব্যাপক আগ্রহের সৃষ্টি হয়েছে।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, খননে পাওয়া স্থাপত্যের ধরন, ইটের আকার-আকৃতি এবং অন্যান্য প্রত্নবস্তুর বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে ধারণা করা হচ্ছে, এটি কোনো সাধারণ আবাসিক স্থাপনা নয়; বরং ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। প্রাথমিকভাবে এটি প্রাচীন কোনো বৌদ্ধ বিহারের ধ্বংসাবশেষ হতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকরা।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক গোলাম ফেরদৌস বলেন, “স্থাপত্য কাঠামোর ধরন এবং খননে পাওয়া বিভিন্ন আলামত বিশ্লেষণ করে আমরা ধারণা করছি, এটি কোনো প্রাচীন বৌদ্ধ বিহারের ধ্বংসাবশেষ হতে পারে। পরবর্তী সময়ে এই স্থাপনাকে পুনর্ব্যবহার করে সেখানে হিন্দু যুগের কোনো ধর্মীয় স্থাপনা বা মন্দির নির্মাণ করা হয়েছিল বলেও ধারণা করা হচ্ছে।”

তিনি আরও জানান, এখন পর্যন্ত কোনো স্তূপ বা সরাসরি বৌদ্ধ ধর্মীয় নিদর্শন পাওয়া যায়নি। ফলে এটিকে নিশ্চিতভাবে বৌদ্ধ বিহার বলা যাচ্ছে না। তবে স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য ও অন্যান্য আলামত এ ধারণাকে আরও জোরালো করছে।

গোলাম ফেরদৌস বলেন, বরেন্দ্র অঞ্চলের পাহাড়পুর, সীতাকোট বিহার ও অরুণধাপসহ বিভিন্ন প্রত্নস্থানের সঙ্গে কান্জির হাড়ীর স্থাপত্যগত মিল লক্ষ্য করা গেছে। ইতিহাস থেকে জানা যায়, এ অঞ্চলে ছোট ছোট বৌদ্ধ বিহারের অস্তিত্ব ছিল। কান্জির হাড়ীও তেমন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নস্থল হতে পারে।

প্রত্নতত্ত্ববিদদের ধারণা, দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত থাকার ফলে স্থাপনাটির দেয়ালে ঢেবে যাওয়া ও তরঙ্গাকৃতির ধ্বংসচিহ্ন তৈরি হয়েছে। ১৭২৭ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের কারণে স্থাপনাটি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে থাকতে পারে বলেও প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।

এদিকে খননকাজকে ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ ও কৌতূহল দেখা দিয়েছে। মোগরপাড়া গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল কাদের বলেন, “ছোটবেলা থেকে কান্জির হাড়ী নিয়ে নানা গল্প শুনে আসছি। এখানে রাজবাড়ি কিংবা গুপ্তধন থাকার কথা অনেকে বলতেন। এখন খননকাজের মাধ্যমে প্রকৃত ইতিহাস বেরিয়ে আসবে বলে আমরা আশাবাদী।”

৮ নম্বর মাহমুদপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাছান মো. ছালাহ উদ্দিন মাছুম বলেন, “কান্জির হাড়ী আমাদের এলাকার ঐতিহ্যের অংশ। এটি সংরক্ষণ করে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হলে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং নতুন প্রজন্ম নিজেদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জানার সুযোগ পাবে।”

তবে কান্জির হাড়ীকে ঘিরে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত নানা কিংবদন্তি ও লোককথার পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাদের মতে, বৈজ্ঞানিক খননের মাধ্যমে এ অঞ্চলের প্রকৃত ইতিহাস পুনর্গঠনের কাজ চলছে। বাকি ঢিবিগুলোতেও খনন পরিচালনা করা গেলে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।