নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ চেয়ে ইরানকে আঞ্চলিক পরাশক্তি হিসেবে পেল যুক্তরাষ্ট্র

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টরা যখন একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেন, যা ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত উসকানিবিহীন ও অবৈধ যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি নির্দেশ করে, তখন ততক্ষণে পশ্চিম এশিয়াজুড়ে একটি নতুন বাস্তবতা গড়ে উঠেছে।

এটি এমন এক বাস্তবতা, যা ঠেকাতে ও উল্টে দিতে ওয়াশিংটন কয়েক দশক ধরে চেষ্টা চালিয়েছে এবং যার পেছনে নিষেধাজ্ঞা, নাশকতা ও সরাসরি সামরিক অভিযানের মাধ্যমে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে।

ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে শুরু হওয়া পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের উদ্দেশ্য ছিল ইরানের মনোবল ভেঙে দেওয়া এবং তার প্রভাব ধ্বংস করা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এর ফল হয়েছে ঠিক উল্টো।

ইরান শুধু আগ্রাসনের মধ্যেও টিকে থাকেনি; বরং অঞ্চলটির রাজনৈতিক, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের নির্ধারক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকটি কোনো চাপের মুখে দেওয়া ছাড় ছিল না; বরং যুদ্ধক্ষেত্র এবং পরবর্তী আলোচনার টেবিলে ঘটে যাওয়া কৌশলগত পরিবর্তনের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি ছিল।

দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন কৌশলবিদরা এই ধারণা পোষণ করে এসেছেন যে, ইরানকে নিয়ন্ত্রণে রাখা, বিচ্ছিন্ন করা এবং শেষ পর্যন্ত অঞ্চলটির প্রান্তিক শক্তিতে পরিণত করা সম্ভব—এমন একটি অঞ্চলে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের আধিপত্য থাকবে। পারস্য উপসাগরজুড়ে বিস্তৃত সামরিক ঘাঁটির নেটওয়ার্ক, বাহরাইনে নৌ উপস্থিতি এবং কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে পরিচালিত বিমান শক্তি—সবই ছিল মার্কিন প্রভাব বজায় রাখা এবং ইরানকে নিয়ন্ত্রণে রাখার পরিকল্পনার অংশ।

যুদ্ধ সেই ধারণাকে সম্পূর্ণ ও স্থায়ীভাবে ভেঙে দিয়েছে। যখন ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রগুলো অত্যন্ত নিখুঁতভাবে মার্কিন ঘাঁটিতে আঘাত হানে, যখন ইরানি ড্রোনগুলো এমন সব স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করে যেগুলোকে দুর্ভেদ্য বলে মনে করা হতো, এবং যখন ইরানি বাহিনী ইচ্ছামতো পাল্টা জবাব দেওয়ার সক্ষমতা প্রদর্শন করে—তখন স্পষ্ট হয়ে যায় যে, এই অঞ্চলের কোনো নিরাপত্তা বা রাজনৈতিক সমীকরণই ইরানের ভূমিকা বিবেচনায় না নিয়ে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়।

যুদ্ধ আরও দেখিয়েছে যে, যেসব দেশ তাদের ভূখণ্ড ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহারের অনুমতি দেয়, তাদেরকে ইরানের পাল্টা আক্রমণ থেকে যুক্তরাষ্ট্র রক্ষা করতে পারে না।

বহু বছর ধরে যেসব আঞ্চলিক দেশ মার্কিন সামরিক স্থাপনা আশ্রয় দিয়েছে এবং ইরানের বিরুদ্ধে হামলার ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, তারা শেষ পর্যন্ত উপলব্ধি করেছে যে, মার্কিন বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তাদের সেই সিদ্ধান্তের পরিণতি থেকে রক্ষা করতে পারেনি।

বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে স্থাপিত রাডার ব্যবস্থা, প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যাটারি এবং বহুস্তরবিশিষ্ট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও ইরানের নিখুঁত হামলার সামনে কার্যকর প্রমাণিত হয়নি। বার্তাটি ছিল স্পষ্ট—অঞ্চলের নিরাপত্তা কোনো বিদেশি শক্তি নিশ্চিত করতে পারে না; এটি কেবল এই অঞ্চলের দেশগুলোর মাধ্যমেই সম্ভব।

এই উপলব্ধি অঞ্চলটির প্রতিটি রাষ্ট্রের কৌশলগত হিসাব-নিকাশকে মৌলিকভাবে বদলে দিয়েছে। পারস্য উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলো এবং অন্যান্য দেশ এখন এমন এক কৌশলগত বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে ওয়াশিংটনের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা আর আগের মতো নির্ভরযোগ্য বলে বিবেচিত হচ্ছে না। ইরানের সঙ্গে সমঝোতা এখন আর ঐচ্ছিক নয়; বরং অপরিহার্য—এমন উপলব্ধি তৈরি হয়েছে। ফলে এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ আর যুক্তরাষ্ট্রের পছন্দ-অপছন্দ দ্বারা নয়, বরং ইরানের বাস্তব অবস্থান ও প্রভাবের ভিত্তিতেই নির্ধারিত হবে।