বিশ্বকাপে টিকেট প্রতারণা, ভয়াবহ ক্ষতিতে ফুটবল ফ্যানরা

চলমান ফুটবল বিশ্বকাপের টিকেট কিনে শেষ মুহূর্তে তা বাতিল হওয়ায় স্টেডিয়ামের বাইরে দাঁড়িয়েই স্বপ্নভঙ্গ হচ্ছে হাজার হাজার ফুটবলপ্রেমীর। সেকেন্ডারি মার্কেটপ্লেস বা টিকেট পুনর্বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানগুলোর চরম অব্যবস্থাপনার কারণে কোটি টাকা খরচ করে বিভিন্ন দেশ থেকে আসা সমর্থকেরা খেলা না দেখেই ফিরে যাচ্ছেন। বিশেষ করে ‘স্টাবহাব’ নামের জনপ্রিয় টিকেট বিক্রয়কারী ওয়েবসাইটের বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে ক্ষোভের আগুন জ্বলছে। ভুক্তভোগী দর্শকেরা একে টিকেট ইতিহাসের অন্যতম বড় বিপর্যয় বলে আখ্যা দিয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর ১৬টি শহরে বসেছে এবারের বিশ্বকাপের আসর। আর একে কেন্দ্র করেই শুরু হয়েছে টিকেট নিয়ে চরম নৈরাজ্য। ডালাসের বাসিন্দা সের্হিও এনরিকে আলভারাদো মোনতালভো তার বাবাকে নিয়ে লিওনেল মেসির খেলা দেখানোর জন্য স্টাবহাব থেকে ১৭০০ ডলারে আর্জেন্টিনার ম্যাচের টিকেট কিনেছিলেন। মেক্সিকো থেকে বাবা-মাকে উড়িয়ে আনা, হোটেল ও যাতায়াত বাবদ তার খরচ হয়েছিল প্রায় ৬০০০ ডলার। কিন্তু ভ্রমণের ঠিক আগের দিন স্টাবহাব তাকে জানায় যে বিক্রেতা টিকেট সরবরাহ করতে পারছে না। টিকেটের চড়া দামের অজুহাতে তারা কোনো বিকল্প টিকেটও দিতে রাজি হয়নি। ম্যাচের দিন স্টেডিয়ামের বাইরে দাঁড়িয়ে ফোনে অনবরত যোগাযোগ করেও শেষ রক্ষা হয়নি মোনতালভোর। একই রকম নির্মম অভিজ্ঞতার শিকার হয়েছেন বোস্টনের ইবেন পিংরে। তার স্ত্রী ২৮০০ ডলার দিয়ে স্কটল্যান্ড বনাম হাইতি ম্যাচের টিকেট কিনেছিলেন ১১ বছরের ছেলেকে চমকে দেওয়ার জন্য। কিন্তু ম্যাচের দিন সেই টিকেট স্রেফ গায়েব হয়ে যায়, যার ফলে স্টেডিয়ামের বাইরে কান্নায় ভেঙে পড়ে শিশুটি।

খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এই সংকটের মূল কারণ হলো ‘স্পেকুলেটিভ টিকেটিং’ বা ফাটকা কারবার। অনেক অসাধু বিক্রেতা নিজের কাছে টিকেট না থাকা সত্ত্বেও টিকেট বিক্রির বিজ্ঞাপন দেয়। পরে যখন টিকেটের দাম আকাশচুম্বী হয়ে যায়, তখন তারা সাধারণ ক্রেতাদের টিকেট না দিয়ে বেশি লাভের আশায় অন্য কোথাও তা চড়া দামে বিক্রি করে দেয়। এর ফলে সাধারণ ক্রেতারা টিকেটের মূল টাকা ফেরত পেলেও বিমান ভাড়া বা হোটেলের পেছনে নষ্ট হওয়া মোটা অঙ্কের টাকা আর ফিরে পান না।

এই চরম জালিয়াতির বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে জুলি রিকার মোগাল এবং রুবেন রেনতেরিয়া নামের দুই ফুটবল অনুরাগী স্টাবহাবের বিরুদ্ধে একটি যৌথ দেওয়ানি মামলা দায়ের করেছেন। আদালতে জমা দেওয়া নথিতে তারা অভিযোগ করেছেন যে, টিকেট দেওয়ার নাম করে হাজার হাজার দর্শকের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়ে শেষ মুহূর্তে প্রতারণা করা হয়েছে। স্টাবহাবের এই কর্মকাণ্ডকে গ্রাহক সুরক্ষার ইতিহাসে ‘নতুন এক চরম বিপর্যয়’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে মামলায়।

পরিস্থিতি বেগতিক দেখে এখন শুরু হয়েছে দায় চাপানোর খেলা। ফিফা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, বিশ্বকাপের একমাত্র বৈধ টিকেট তাদের অফিশিয়াল অ্যাপ বা ওয়েবসাইটেই পাওয়া যায় এবং তৃতীয় কোনো পক্ষের কাছ থেকে কেনা টিকেটের দায় তারা নেবে না। অন্যদিকে স্টাবহাব দাবি করেছে, ফিফার নতুন টিকেট ট্রান্সফার অ্যাপটিতে কারিগরি ত্রুটির কারণেই এই সমস্যা তৈরি হয়েছে। তবে টিকেট বাজারের বিশেষজ্ঞরা স্টাবহাবের এই অজুহাত পুরোপুরি নাকচ করে দিয়েছেন। টিকেট টক নেটওয়ার্কের সহ-প্রতিষ্ঠাতা স্কট ফ্রিডম্যান জানিয়েছেন, তিনি ইতিমধ্যে এই টুর্নামেন্টকে কেন্দ্র করে ৬০০-র বেশি লিখিত অভিযোগ সংগ্রহ করেছেন এবং এর জন্য সম্পূর্ণভাবে স্টাবহাবের নীতিহীন ব্যবসাকেই দায়ী করেছেন।

আইনজীবীরা বলছেন, স্টাবহাবের জটিল রিফান্ড বা ক্ষতিপূরণ নীতি সাধারণ মানুষকে ক্লান্ত ও নিরুৎসাহিত করার জন্য তৈরি, যাতে মানুষ একপর্যায়ে টাকা দাবি করা ছেড়ে দেয়। স্টাবহাবের পক্ষ থেকে তাদের ‘ফ্যানপ্রটেক্ট গ্যারান্টি’র কথা বলা হলেও হাজার হাজার ডলারের অ-ফেরতযোগ্য ভ্রমণ খরচ হারিয়ে নিঃস্ব হওয়া ফুটবল ভক্তদের ক্ষোভ কোনোভাবেই কমছে না।