একসময় বাংলাদেশের সবুজ বন-জঙ্গল, নদীঘেরা তৃণভূমি আর বিস্তীর্ণ জলাভূমিতে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াতো বিশালদেহী বন্য গণ্ডার। সিলেটের হাওড়াঞ্চল, বৃহত্তর ময়মনসিংহ, সুন্দরবন কিংবা পার্বত্য চট্টগ্রামের বনাঞ্চল ছিল এই প্রাণীদের নিরাপদ আবাসস্থল।
আইইউসিএন (IUCN)-এর লাল তালিকা অনুযায়ী, এ দেশে এক শিংওয়ালা ভারতীয় গণ্ডার, জাভান গণ্ডার এবং সুমাত্রান গণ্ডার— এই ৩ প্রজাতির গণ্ডারেরই অবাধ বিচরণ ছিল। কিন্তু আজ বাংলাদেশের কোনো বনেই আর একটিও বন্য গণ্ডার বেঁচে নেই।
১৯৩০ সালের পর এ দেশে গণ্ডার দেখার আর কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ মেলেনি। কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয় নয়, বরং মানুষের নির্বিচার শিকার আর তীব্র লোভের কারণে এ দেশের প্রাকৃতিক ইতিহাস থেকে চিরতরে হারিয়ে গেছে এই শান্ত প্রাণীটি। কিন্তু কীভাবে ঘটলো এই নির্মম বিলুপ্তি?
ঐতিহাসিক নথি বলছে, উনিশ শতকে ব্রিটিশ শাসনামলে ইউরোপীয় শিকারিদের কাছে বিনোদনের নামে ‘ট্রফি হান্টিং’ বা বীরত্ব জাহিরের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল এই গণ্ডার। শিং দিয়ে বিলাসবহুল পানপাত্র এবং চামড়া দিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রের ঢাল তৈরির তীব্র লোভে শুরু হয় নির্বিচার নিধনযজ্ঞ।
১৮৭৬ সালের ‘ওরিয়েন্টাল স্পোর্টিং ম্যাগাজিন’-এর একটি রোমহর্ষক রেকর্ড অনুযায়ী, তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার ডুয়ার্স অঞ্চলে এক ইউরোপীয় শিকারি স্রেফ এক দিনেই ৬টি গণ্ডারকে গুলি করে হত্যা করেন এবং ২৫টিরও বেশি গণ্ডারকে মারাত্মকভাবে আহত করেন।
অন্যদিকে ১৮২৮ সালে সুন্দরবনে প্রথম একটি জাভান গণ্ডারকে গুলি করে মারেন ফরাসি শিকারি এফ ভি ল্যামারেপিকুয়া। এরপর ১৮৯২ সালের পর সুন্দরবনে আর কখনোই গণ্ডার দেখা যায়নি। ব্রিটিশ অভিজাতদের খুশি করতে প্রতি বছর শত শত হাতি নিয়ে বনে গিয়ে গণ্ডার শিকারের রাজকীয় আয়োজন করা হতো।
বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দলিল হয়ে আছে ১৮৬৮ সালের একটি ঘটনা, যখন চট্টগ্রামের বন থেকে ‘বেগম’ নামের একটি স্ত্রী সুমাত্রান গণ্ডারকে জীবিত ধরে লন্ডনের চিড়িয়াখানায় পাঠানো হয়েছিল। ১৯০০ সালে সেখানে মারা যায় বেগম।
প্রাণিবিজ্ঞানীদের মতে, গণ্ডার হলো ‘ইকোসিস্টেম ইঞ্জিনিয়ার’। এরা ঘাস খেয়ে তৃণভূমির ভারসাম্য রাখে এবং বীজ ছড়িয়ে বন পুনর্জন্মে সাহায্য করে। প্রতিবেশী ভারত ও নেপালে কঠোর শিকারবিরোধী আইনি ব্যবস্থার কারণে আজ এক শিংওয়ালা গণ্ডারের সংখ্যা ৪ হাজার ছাড়িয়েছে।
অথচ আমাদের বনাঞ্চলে আজ গণ্ডার ফিরিয়ে আনার মতো ন্যূনতম আবাসস্থলটুকুও আর অবশিষ্ট নেই। গণ্ডারের এই বিলুপ্তি পুরো বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্যকে এক দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক ধাক্কা দিয়েছে।
গণ্ডার তো গেছে, তবে এ দেশে এখনও ধুঁকে ধুঁকে টিকে থাকা হাতি, চিতা কিংবা বনরুইদের বাঁচাতে আজই যদি কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়া হয়, তবে ওরাও একদিন ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে।





