প্রেম, প্রতিশ্রুতি ও স্মৃতির এক অনন্ত গজল মুঘল সংস্কৃতির কবি মোমিন খাঁ মোমিন থেকে বেগম আখতার, গুলাম আলী খান, প্রতিভা সিং বাঘেল—দুই শতাব্দী পেরিয়ে এক অমর প্রেমের ইতিহাস হয়ে বয়ে চলেছে। উর্দু গজলের ইতিহাসে অনবদ্য এই গজলে এমন কিছু শের আছে, যেগুলো কেবল কবিতা নয়—একটি সভ্যতার আবেগ, একটি সংস্কৃতির দীর্ঘশ্বাস আর মানবাত্মার হাহাকার ও আত্মজিজ্ঞাসার দর্পণ। সেই বিরল পঙ্ক্তিগুলোর অন্যতম—
“ওহ্ যা হাম মে তুম মে কারার থা, তুমহেঁ ইয়াদ হো কি না ইয়াদ হো;
ওহি ইয়ানি ওয়াদা-এ-নিবাহ কা, তুমহেঁ ইয়াদ হো কি না ইয়াদ হো।”
বাংলা ভাবানুবাদ—
“তোমার আর আমার মধ্যে যে নীরব অঙ্গীকার ছিল—আজও কি তোমার মনে আছে, নাকি নেই?
সেই যে একসঙ্গে জীবনভর পথচলার প্রতিশ্রুতি ছিল—তুমি কি তা এখনো স্মরণ কর, নাকি বিস্মৃত হয়েছ?”
এই একটি শেরেই উর্দু গজলের সবচেয়ে গভীর তিনটি অনুভূতি মিলিত হয়েছে—প্রেম, স্মৃতি এবং হারিয়ে যাওয়া প্রতিশ্রুতির বেদনা, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী গজলটিকে অমর করে রেখেছে নানা শিল্পীর কণ্ঠে আর প্রজন্মের পর প্রজন্মের শ্রোতাদের কাছে।
Woh Jo Hum Mein Tum Mein — Begum Akhtar Ghazal | Pratibha Singh Baghel Live | Bazm e Khas
মোমিন খাঁ মোমিন: দিল্লির শেষ রোমান্টিক কবিদের একজন
উর্দু গজলের ইতিহাসে মীর তাকী মীর, মির্জা গালিব ও আল্লামা ইকবালের নাম যেমন সর্বজনবিদিত, তেমনি প্রেমের সূক্ষ্ম অনুভূতির এক অনন্য শিল্পী হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন মোমিন খাঁ মোমিন (১৮০০–১৮৫২)। তাঁর পূর্ণ নাম মুহাম্মদ মোমিন খাঁ। তিনি জন্মগ্রহণ করেন দিল্লিতে, এমন এক সঙ্কুল পরিস্থিতিতে যখন মুঘল সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক শক্তি দ্রুত ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছিল, কিন্তু দিল্লি তখনও উত্তর ভারতের জ্ঞান, সংস্কৃতি, সাহিত্য ও সঙ্গীতচর্চার প্রাণকেন্দ্র। সম্রাট আকবর শাহ দ্বিতীয় এবং পরবর্তীকালে বাহাদুর শাহ জাফরের দরবারকে ঘিরে যে সাহিত্যিক নবজাগরণ গড়ে উঠেছিল, মোমিন ছিলেন সেই স্বর্ণযুগের অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র। তাঁর সমসাময়িক ছিলেন মির্জা গালিব, শেখ ইব্রাহিম জওক, মোমিনের বন্ধু ও প্রতিদ্বন্দ্বী দাগ দেহলভীর পূর্বসূরিরা এবং স্বয়ং কবি-সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর। উর্দু সাহিত্যের ইতিহাসে এই যুগকে প্রায়ই “দিল্লি স্কুল অব গজল”-এর শেষ স্বর্ণযুগ হিসেবে বর্ণনা করা হয়, যাদও সেটা ছিল রাজনৈতিক পতন ও অবক্ষয়ের কালপর্ব।
মোমিন ছিলেন বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী। তিনি কেবল একজন কবি নন। তিনি ছিলেন একজন হাকিম (ইউনানি চিকিৎসক), জ্যোতির্বিদ, গণিত ও জ্যোতিষবিদ্যায় পারদর্শী পণ্ডিত, দাবা খেলোয়াড় এবং সঙ্গীতরসিক। তাঁর পরিবার ছিল চিকিৎসাশাস্ত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত। ফলে ছোটবেলা থেকেই তিনি আরবি, ফারসি, দর্শন, চিকিৎসাবিজ্ঞান, গণিত এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানের শিক্ষা লাভ করেন। কিন্তু তাঁর প্রকৃত পরিচয় গড়ে ওঠে কবিতায়। তিনি এমন এক যুগ-সন্ধিক্ষণে লিখছিলেন, যখন দিল্লির আকাশে একদিকে রাজনৈতিক পতনের অন্ধকার, অন্যদিকে সাহিত্যিক সৃজনশীলতার দীপ্তি পাশাপাশি বিদ্যমান ছিল। ইতিহাসের এই দ্বৈত বাস্তবতা তাঁর কবিতায় এক ধরনের নীরব বিষণ্নতা এনে দিয়েছে।
মোমিনের কবিতার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো আবেগের সংযম। তিনি কখনো উচ্চকণ্ঠ নন। তাঁর কবিতায় প্রেমিক আর্তনাদ করে না, বরং নীরবে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তিনি প্রেমকে নাটকীয় সংঘর্ষে নয়, হৃদয়ের নিঃশব্দ কম্পনে প্রকাশ করেন। উর্দু সমালোচকেরা এই বৈশিষ্ট্যকে বলেন “নাজুক ইহসাস” (Nazuk Ehsas)—অর্থাৎ অনুভূতির সূক্ষ্মতা বা কোমল আবেগের শিল্প। তাঁর গজলে প্রেমের ভাষা কখনো কৃত্রিম নয়। বরং ফিসফিসে, সংযত এবং গভীর। যেন দুটি হৃদয়ের মধ্যকার এমন এক সংলাপ, যা অন্য কেউ শুনতে পায় না।
এই কারণেই তাঁর বিখ্যাত শের—“ওহ্ যা হাম মে তুম মে কারার থা, তুমহেঁ ইয়াদ হো কি না ইয়াদ হো/ওহি ইয়ানি ওয়াদা-এ-নিবাহ কা, তুমহেঁ ইয়াদ হো কি না ইয়াদ হো” কাল-কালান্তর পেরিয়ে জনপ্রিয়তায় স্নাত হয়ে উর্দু সাহিত্যে প্রেমের সর্বশ্রেষ্ঠ পঙ্ক্তিগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। গজলে কোনো অভিযোগ নেই, নেই কোনো অভিমানও। আছে শুধু স্মৃতির দরজায় নীরব কড়া নাড়া। কবি যেন প্রিয়জনকে নয়, মহাকালকেই প্রশ্ন করছেন—”সেই নীরব অঙ্গীকারের কথা কি আজও তোমার মনে আছে?” এই সংযত বেদনাই মোমিনকে তাঁর সমসাময়িকদের থেকে পৃথক ও বিশিষ্ট করেছে।
মোমিনের কাব্যভাষা গালিবের মতো দার্শনিক নয়, আবার মীরের মতো অস্তিত্ববাদী বিষণ্নতায়ও নিমজ্জিত নয়। গালিব যেখানে প্রেমকে বুদ্ধিবৃত্তিক ও অধিবিদ্যাগত প্রশ্নে উন্নীত করেন, মোমিন সেখানে প্রেমকে মানুষের অন্তর্জগতের নীরব অনুভূতি হিসেবে দেখেন। তাঁর কবিতায় অলংকার আছে। কিন্তু অলংকারের প্রদর্শন নেই। দর্শন আছে, কিন্তু তা কখনো অনুভূতির ওপর আধিপত্য বিস্তার করে না। এই সংযমই তাঁকে উর্দু গজলের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রোমান্টিক কবিতে পরিণত করেছে।
মোমিনের সাহিত্যিক মর্যাদা সম্পর্কে একটি বহুল আলোচিত ঘটনা উর্দু সাহিত্যে কিংবদন্তির মর্যাদা পেয়েছে। প্রচলিত আছে যে, মির্জা গালিব একবার মোমিনের এই বিখ্যাত শের শুনে বলেছিলেন—”আমার সমগ্র দিওয়ান যদি এই একটি শেরের বিনিময়ে দিতে হয়, তবুও আমি রাজি।” যদিও এই উক্তির ঐতিহাসিক সত্যতা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে, তবুও এটি নিঃসন্দেহে প্রমাণ করে যে সমসাময়িক সাহিত্যিক সমাজে মোমিনের কাব্যপ্রতিভা কতটা সমাদৃত ছিল।
মোমিনের ব্যক্তিজীবনও ছিল কিছুটা রহস্যময়। তিনি আজীবন দিল্লির সাংস্কৃতিক পরিবেশের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিলেন। ১৮৫২ সালে এক দুর্ঘটনায়—নিজ বাড়ির ছাদ বা বারান্দার একটি অংশ ভেঙে পড়লে—তিনি গুরুতর আহত হন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর মাত্র পাঁচ বছর পর ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহে দিল্লির যে সাংস্কৃতিক জগৎ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়, মোমিন যেন সেই তাণ্ডব ও বর্বরতা দেখার আগেই সেই হারিয়ে যাওয়া সভ্যতার শেষ রোমান্টিক কণ্ঠস্বর হয়ে বিপন্ন ইতিহাসের পটভূমি থেকে বিদায় নেন।
সাহিত্যসমালোচকদের মতে, যদি মীর তাকী মীর প্রেমের বেদনার কবি হন, মির্জা গালিব প্রেমের দর্শনের কবি হন, তবে মোমিন খাঁ মোমিন প্রেমের স্মৃতি ও নীরব প্রতিশ্রুতির কবি। তাঁর গজলে প্রেম কখনো অধিকার দাবি করে না। বরং স্মৃতির ভেতর বেঁচে থাকে। তাই তাঁর কবিতা পড়লে মনে হয়, তিনি উচ্চস্বরে কিছু বলছেন না—তিনি কেবল মানুষের হৃদয়ের সেই নীরব কক্ষটির দরজায় আলতো করে কড়া নাড়ছেন, যেখানে ভালোবাসা, বিচ্ছেদ, প্রতিশ্রুতি এবং স্মৃতি যুগের পর যুগ ধরে নিঃশব্দে বাস করে। এই কারণেই দুই শতাব্দী পরেও মোমিন খাঁ মোমিনের গজল নতুন প্রজন্মের কাছে সমানভাবে প্রাসঙ্গিক, হৃদয়স্পর্শী এবং চিরসবুজ।
“কারার” গভীর নন্দনতত্ত্বে এক নীরব প্রতিশ্রুতি
উর্দু গজলের ইতিহাসে এমন কিছু শব্দ রয়েছে, যেগুলোকে কেবল অভিধান দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। তাদের অর্থ গড়ে উঠেছে শতাব্দীর সাহিত্যিক ব্যবহার, সুফি দর্শন, প্রেমের সংস্কৃতি, নন্দনতাত্ত্বিক আবহ এবং মানুষের অন্তর্জাগতিক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। ‘কারার’ (قرار) তেমনই একটি শব্দ। মোমিন খাঁ মোমিন তাঁর বিখ্যাত গজলের প্রথম পঙ্ক্তিতেই এই শব্দটি ব্যবহার করেছেন—“ওহ্ যা হাম মে তুম মে কারার থা ।“ এই একটি শব্দই গোটা গজলের আবেগ, দর্শন ও নন্দনতত্ত্বের কেন্দ্রবিন্দু।
আরবি মূলধাতু ‘ক্ব-র-র’ (Q-R-R) থেকে উদ্ভূত ‘কারার’-এর আক্ষরিক অর্থ হলো—স্থিরতা, প্রশান্তি, স্থায়িত্ব, আশ্রয় বা হৃদয়ের শান্তি। কুরআনেও এই ধাতুর বিভিন্ন রূপ ব্যবহৃত হয়েছে, যেখানে এর অর্থ দাঁড়ায় এমন এক স্থির অবস্থান, যেখানে অস্থিরতা থেমে যায় এবং হৃদয় আশ্রয় খুঁজে পায়। শব্দটির ঐতিহ্য ধারণ করে উর্দু গজলে ‘কারার’ শব্দটি আরও গভীর, আরও মানবিক এবং আরও নান্দনিক অর্থ বহন করেছে। এখানে ‘কারার’ কোনো লিখিত চুক্তি (Contract) নয়, কোনো আইনি অঙ্গীকার (Agreement) নয়, বরং দুই হৃদয়ের মধ্যে জন্ম নেওয়া এমন এক নীরব বিশ্বাস, যা উচ্চারণেরও প্রয়োজন হয় না।
প্রেমের সূচনালগ্নে এমন অনেক অনুভূতি জন্ম নেয়, যেগুলো ভাষার আগেই প্রতিষ্ঠিত হয়। দুটি মানুষ একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকে, একে অপরের নীরবতা বোঝে, ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয় না। তবু তাদের মধ্যে একটি অদৃশ্য আস্থা তৈরি হয়। উর্দু গজলের ভাষায় সেই অনুচ্চারিত সম্পর্কই কারার। এটি এমন এক প্রতিশ্রুতি, যা কলমে লেখা হয় না, সাক্ষীর সামনে উচ্চারিত হয় না, কিন্তু হৃদয়ের গভীরে অমোচনীয় হয়ে থাকে।
এই কারণেই মোমিন বলেন না—“ওহ্ যা হাম মে তুম মে আহদ (অঙ্গীকার) ছিল” বা “মুয়াহিদা (চুক্তি) ছিল।” তিনি বলেন—“কারার”। কারণ ‘আহদ’ বা ‘ওয়াদা’ কেবল প্রতিশ্রুতির কথা বলে। কিন্তু ‘কারার’ প্রতিশ্রুতির সঙ্গে মানসিক প্রশান্তি, পারস্পরিক নির্ভরতা এবং আত্মিক সংযোগের অনুভূতিকেও ধারণ করে। সাহিত্যতত্ত্বের ভাষায় এটি একটি অনুভূতিগত সংকেত (affective signifier)—যে শব্দের অর্থ কেবল অভিধানে নয়, পাঠকের আবেগে সম্পূর্ণ হয়।
উর্দু গজলের নন্দনতত্ত্বে প্রেম কখনোই কেবল দুটি মানুষের পারস্পরিক আকর্ষণ নয়। এটি এক ধরনের রূহানি বা আত্মিক অভিজ্ঞতা। তাই ‘কারার’ শব্দের ভেতরে একই সঙ্গে আছে প্রেমিক-প্রেমিকার সম্পর্ক, বন্ধু ও বন্ধুর বিশ্বাস, এমনকি সুফি ব্যাখ্যায় স্রষ্টা ও বান্দার চিরন্তন অঙ্গীকারও। সুফি কবিরা মনে করেন, মানুষের আত্মা যখন সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে প্রাক্-অনন্তের অঙ্গীকার করেছিল—সেই স্মৃতির প্রতিধ্বনিও ‘কারার’ শব্দে অনুরণিত হয়। ফলে এই শব্দের মধ্যে ইহজাগতিক প্রেম এবং আধ্যাত্মিক প্রেম একই সঙ্গে সহাবস্থান করে।
নন্দনতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে ‘কারার’ একটি অপূর্ণতার প্রতীক। কারণ গজলে ‘কারার’ উচ্চারিত হয় সাধারণত তখনই, যখন সেই শান্তি ভেঙে গেছে। প্রেমের সময় মানুষ ‘কারার’ অনুভব করে। বিচ্ছেদের পর মানুষ ‘কারার’-এর স্মৃতি অনুভব করে। মোমিনের গজলেও তাই বর্তমানের কোনো সম্পর্কের কথা নেই; আছে হারিয়ে যাওয়া সেই নীরব আশ্রয়ের স্মরণ। তিনি প্রশ্ন করেন—“তোমার কি মনে আছে?” অর্থাৎ, কারার এখানে বর্তমান বাস্তবতা নয়, স্মৃতির ভেতরে রক্ষিত এক হারিয়ে যাওয়া স্বর্গ।
এখানেই মোমিনের কাব্যশৈলীর অসাধারণত্ব। তিনি বিচ্ছেদের কথা বলেন না, অভিযোগও করেন না। তিনি কেবল সেই সময়টিকে স্মরণ করেন, যখন দুই হৃদয়ের মধ্যে কোনো ভাষাহীন শান্তি ছিল। সাহিত্যসমালোচকেরা বলেন, এটি “Poetics of Suggestion”—সরাসরি না বলে ইঙ্গিতের মাধ্যমে গভীর অনুভূতি প্রকাশের শিল্প। মোমিনের কবিতায় শব্দ যতটা বলে, নীরবতা তার চেয়েও বেশি বলে। এই নীরবতার কেন্দ্রবিন্দুই ‘কারার’।
উর্দু গজলের ক্লাসিক ঐতিহ্যে ‘কারার’-এর বিপরীত শব্দ হলো ‘বেকারারি’—অস্থিরতা, ব্যাকুলতা, অশান্তি। প্রেমের শুরুতে থাকে ‘কারার’; প্রেমের বিচ্ছেদে জন্ম নেয় ‘বেকারারি’। এই দুই বিপরীত অনুভূতির টানাপোড়েনই গজলের আবেগকে নির্মাণ করে। মোমিনের গজলে ‘কারার’ উচ্চারিত হওয়ার মুহূর্তেই পাঠক বুঝতে পারেন—এখন সেই কারার আর নেই। এখন আছে কেবল তার স্মৃতি। এই অনুপস্থিতির নন্দনতত্ত্বই গজলের সৌন্দর্য।
বাংলা সাহিত্যেও এর নিকটবর্তী ধারণা পাওয়া যায়। রবীন্দ্রনাথের “তুমি রবে নীরবে হৃদয়ে মম”-এর ‘নীরব থাকা’ কিংবা নজরুলের “ভুলিতে পারি না তোমারে”—এসব রচনায়ও আমরা এমন এক মানসিক বন্ধনের সন্ধান পাই, যা ভাষার চেয়ে অনুভূতিতে অধিকতর সত্য। তবে উর্দু গজলের ‘কারার’ আরও সূক্ষ্ম। এটি প্রেমের সামাজিক ঘোষণা নয়, বরং হৃদয়ের গভীরে উচ্চারিত এক নীরব প্রতিজ্ঞা।
এই কারণেই মোমিনের “ওহ্ যা হাম মে তুম মে কারার থা…” পঙ্ক্তিটি দুই শতাব্দী পরেও শ্রোতাকে স্পর্শ করে। কারণ প্রত্যেক মানুষের জীবনেই এমন কিছু সম্পর্ক থাকে, যেখানে কোনো লিখিত চুক্তি ছিল না, কোনো সাক্ষী ছিল না, কোনো আনুষ্ঠানিক অঙ্গীকারও ছিল না—তবু ছিল এক অব্যক্ত আস্থা, এক নিঃশব্দ আশ্রয়, এক অদৃশ্য বন্ধন। সেই হারিয়ে যাওয়া মানসিক প্রশান্তির নামই কারার। আর মোমিনের কাব্যপ্রতিভা এই যে, তিনি একটি মাত্র শব্দের মধ্যে প্রেম, বিশ্বাস, স্মৃতি, বেদনা এবং মানবিক সম্পর্কের সমগ্র নন্দনতত্ত্বকে ধারণ করতে সক্ষম হয়েছেন। তাই ‘কারার’ কেবল একটি শব্দ নয়; এটি উর্দু গজলের ভাষায় প্রেমের নীরব ব্যাকরণ।
“তোমার কি মনে আছে?”
গজলে উচ্চারিত “তুমহেঁ ইয়াদ হো কি না ইয়াদ হো” হলো স্মৃতির অলঙ্কার, নীরবতার ভাষা এবং উর্দু গজলের নন্দনতাত্ত্বিক বিশিষ্টতা। মোমিন খাঁ মোমিনের গজলের সবচেয়ে অসাধারণ শিল্পকৌশল কেবল এর শব্দচয়নে নয়, বরং এর পুনরাবৃত্তির নন্দনতত্ত্বে। প্রতিটি শেরের শেষে তিনি একই পঙ্ক্তি ফিরিয়ে আনেন—”তুমহেঁ ইয়াদ হো কি না ইয়াদ হো”/”তোমার কি মনে আছে, নাকি নেই?”
প্রথম দৃষ্টিতে এটি একটি সাধারণ প্রশ্ন মনে হতে পারে। কিন্তু সাহিত্যিক বিশ্লেষণে এটি মোটেও তথ্য জানার জন্য করা সরল প্রশ্ন নয়। এটি এমন একটি প্রশ্ন, যার উত্তর কবি নিজেই জানেন। অলঙ্কারশাস্ত্রের ভাষায় একে বলা হয় রেটোরিক্যাল প্রশ্ন (Rhetorical Question)—অর্থাৎ এমন প্রশ্ন, যার উদ্দেশ্য উত্তর পাওয়া নয়। বরং অনুভূতির গভীরতা প্রকাশ করা। মোমিন জানেন, প্রিয় মানুষটি হয়তো উত্তর দেবে না, কিংবা দিলেও তা আর অতীতকে ফিরিয়ে আনবে না। তাই প্রশ্নটি আসলে অন্যের উদ্দেশে নয়। এটি নিজের হৃদয়ের সঙ্গে, স্মৃতির সঙ্গে এবং সময়ের সঙ্গে এক অন্তহীন সংলাপ।
এই পুনরাবৃত্তিই গজলের ‘রদীফ‘ (Radif)। উর্দু গজলের নন্দনতত্ত্বে রদীফ কেবল ছন্দের অলংকার নয়, আবেগের কেন্দ্রবিন্দু। প্রতিটি শের ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতার কথা বলে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত এসে একই প্রশ্নে মিলিত হয়। যেন নদীর নানা শাখা এক সাগরে গিয়ে মেশে। মোমিনের গজলে সেই সাগর হলো—“তুমহেঁ ইয়াদ হো কি না ইয়াদ হো।” প্রতিটি শেরের শেষে এই পুনরাবৃত্তি পাঠককে আবার স্মৃতির ভেতরে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। ফলে পুরো গজলটি একটি বিচ্ছিন্ন কবিতা না থেকে একটি অবিচ্ছিন্ন মানসিক যাত্রায় পরিণত হয়।
সাহিত্যতত্ত্বে এই কৌশলকে বলা যায় স্মৃতির বৃত্তাকার নির্মাণ (Circular Structure of Memory)। মানুষের স্মৃতি কখনো সরলরেখায় চলে না। আমরা কোনো পুরোনো সম্পর্কের কথা ভাবতে গিয়ে বারবার একই প্রশ্নে ফিরে আসি—সে কি আমাকে মনে রেখেছে? সেই দিনগুলোর কথা কি তার মনে আছে? মোমিন মানুষের মনস্তত্ত্বের এই চিরন্তন প্রবণতাকেই কবিতার কাঠামোতে রূপ দিয়েছেন। তাই এই গজল পড়তে পড়তে মনে হয়, আমরা কবির কথা নয়, নিজের হৃদয়ের কথাই শুনছি।
এই প্রশ্নের ভেতরে কোনো তীব্র অভিযোগ নেই। কবি বলেননি—”তুমি কেন ভুলে গেলে?” কিংবা—”তুমি বিশ্বাসঘাতকতা করলে।” বরং তিনি অত্যন্ত বিনয়ী, প্রায় বিষণ্ন স্বরে বলেন—”তোমার কি মনে আছে?” এই বিনয়ই মোমিনের কাব্যিক মহিমা। তাঁর প্রেম অধিকার দাবি করে না; স্মৃতির দরজায় আলতো করে কড়া নাড়ে হৃদয়ের তন্ত্রীতে। এখানেই তাঁর কাব্যভাষা মীরের বেদনাবোধ এবং গালিবের দার্শনিক জটিলতা থেকে আলাদা হয়ে নিজস্ব এক সৌন্দর্য নির্মাণ করে।
নন্দনতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে এই প্রশ্নের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর অনির্ণেয়তা (Ambiguity)। “তোমার কি মনে আছে?”—এই প্রশ্নের উত্তর হতে পারে “হ্যাঁ”, হতে পারে “না”, আবার এমনও হতে পারে যে উত্তরদাতা নিজেও নিশ্চিত নন। এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই গজলের সৌন্দর্য। উর্দু গজল কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয় না। বরং অনুভূতির একটি উন্মুক্ত পরিসর তৈরি করে, যেখানে পাঠক নিজস্ব অভিজ্ঞতা দিয়ে অর্থ সম্পূর্ণ করেন। আধুনিক সাহিত্যতত্ত্বের ভাষায় এটিকে Reader-Response Aesthetics-এর এক চমৎকার উদাহরণ বলা যায়—কবিতার শেষ অর্থ পাঠকের হৃদয়েই নির্মিত হয়।
এই পুনরাবৃত্তি কালরেখার ধাবমানতার গতিময় দর্শনের সঙ্গেও যুক্ত। কারণ, অতীত কখনো ফিরে আসে না। ফিরে আসে কেবল তার স্মৃতি। তাই “তুমহেঁ ইয়াদ হো কি না ইয়াদ হো” প্রশ্নটি আসলে প্রিয় মানুষটিকে যতটা উদ্দেশ করে, তার চেয়েও বেশি উদ্দেশ করে ফেলে আসা স্মৃতিকে। স্মৃতির সেই প্রতিশ্রুতি ভুলে গেছে কিনা, প্রশ্নটি সেখানেই। জীবন কি সেই দিনগুলোর সাক্ষ্য এখনো বহন করে? এই অর্থে মোমিনের প্রশ্ন একটি অস্তিত্ববাদী প্রশ্নও বটে—মানুষ কি সত্যিই তার স্মৃতি, সত্তা ও ভালোবাসাকে ধরে রাখতে পারে, নাকি সবকিছুই স্মৃতির অস্পষ্ট কুয়াশায় হারিয়ে যায়?
সুফি নন্দনতত্ত্বে এই প্রশ্ন আরও গভীর অর্থ ধারণ করে। সেখানে “ইয়াদ” বা স্মরণ কেবল কোনো মানুষকে স্মরণ করা নয়। এটি যিকর (Dhikr)—স্রষ্টার স্মরণ, আত্মার আদি পরিচয়ের স্মরণ। সেই ব্যাখ্যায় “তুমহেঁ ইয়াদ হো কি না ইয়াদ হো” হয়ে ওঠে মানুষের আত্মার প্রতি এক আধ্যাত্মিক আহ্বান—তুমি কি এখনো সেই চিরন্তন অঙ্গীকারকে মনে রেখেছ, নাকি পৃথিবীর কোলাহলে তা ভুলে গেছ? ফলে একটি প্রেমের গজল একই সঙ্গে আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানের ভাষায়ও রূপান্তরিত হয়।
এই পঙ্ক্তির সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের একটি গভীর সাদৃশ্য লক্ষ করা যায়। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন—“মনে কি দ্বিধা রেখে গেলে চলে” কিংবা “তুমি রবে নীরবে হৃদয়ে মম।” এখানেও উত্তরহীন প্রশ্ন, নীরব স্মৃতি এবং অনুচ্চারিত সম্পর্কই মুখ্য। কিন্তু মোমিনের বিশেষত্ব হলো, তিনি প্রশ্নটিকে বারবার পুনরাবৃত্তি করে এমন এক ছন্দ তৈরি করেছেন, যা প্রতিবার শুনলে মনে হয়, কবি নতুন করে একই ক্ষত স্পর্শ করছেন। যেন প্রতিটি পুনরাবৃত্তি হৃদয়ের ওপর আরেকটি ঢেউ হয়ে আছড়ে পড়ে।
অতএব, “তুমহেঁ ইয়াদ হো কি না ইয়াদ হো” কেবল একটি পুনরাবৃত্ত বাক্য নয়; এটি উর্দু গজলের নন্দনতত্ত্বে স্মৃতির মন্ত্র, প্রেমের প্রতিধ্বনি এবং নীরবতার সঙ্গীত। এই একটি প্রশ্নের মধ্যেই মোমিন এমন এক আবেগের জগৎ নির্মাণ করেছেন, যেখানে উত্তর অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায়। কারণ প্রকৃত প্রেমে সবচেয়ে গভীর সংলাপ শব্দ দিয়ে নয়, নীরবতার মধ্য দিয়েই সম্পন্ন হয়। আর সেই নীরবতার ভাষাই—“তোমার কি মনে আছে?”





