রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে আরও জবাবদিহিমূলক, নিরপেক্ষ ও সংস্কারমুখী কাঠামোয় গড়ে তুলতে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে ধারাবাহিক পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, প্রশাসনিক সংস্কার, শুদ্ধি কার্যক্রম এবং অতীতে বিতর্কিত ভূমিকার অভিযোগ থাকা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার মাধ্যমে একটি কার্যকর ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারী ৩২ জন সাবেক জেলা প্রশাসক (বর্তমানে যুগ্ম সচিব) এবং বিভিন্ন পর্যায়ের মোট ৮০ জন জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তাকে সরকারি চাকরি আইন অনুযায়ী বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। এসব পদক্ষেপকে চলমান সংস্কার কর্মসূচির অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এদিকে, সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের ঘটনাকেও রাজনৈতিক অঙ্গনে রাষ্ট্রীয় কাঠামো পুনর্বিন্যাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। একইসঙ্গে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে কর্মরত কর্মকর্তাদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ অব্যাহত রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এর আগে সংসদে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আবদুল বারী জানিয়েছিলেন, অতীতের আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রশাসনে রাজনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন—এমন অভিযোগ থাকা কর্মকর্তাদের ভূমিকা তদন্ত করছে বিভিন্ন সংস্থা। তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।
তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান সম্প্রতি বলেন, ২০১৮ সালের নির্বাচনের সময় দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাদের অবসরে পাঠানোর বিষয়ে সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো নির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করেনি। সরকারি চাকরির বিধান অনুযায়ী জনস্বার্থে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে তিনি মন্তব্য করেন, ২০১৮ সালের নির্বাচন নিয়ে পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারী জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তাদের ভূমিকা পর্যায়ক্রমে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। সেই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে একাধিক কর্মকর্তা বাধ্যতামূলক অবসরে গেছেন।
প্রশাসনের পাশাপাশি পুলিশ বাহিনীতেও বড় ধরনের পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। গত কয়েক মাসে বিভিন্ন ধাপে ডিআইজি, অতিরিক্ত ডিআইজি ও পুলিশ সুপার পদমর্যাদার মোট ৮০ জন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে জনস্বার্থে অবসরে পাঠানো হয়েছে। সরকারের দাবি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও পেশাদার, নিরপেক্ষ ও জনগণমুখী করতেই এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এদিকে, পুরোনো আলোচিত কয়েকটি মামলার তদন্তেও অগ্রগতি হয়েছে। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যা মামলায় দীর্ঘদিন পলাতক এক সাবেক সেনা কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর গুমের ঘটনাসহ কয়েকটি মামলার তদন্তেও নতুন তথ্য সামনে এসেছে এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত কার্যক্রম চলছে।
সরকার-সংশ্লিষ্টদের মতে, রাষ্ট্র সংস্কার কেবল প্রশাসনিক রদবদলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং একটি জবাবদিহিমূলক, দক্ষ ও উন্নয়নমুখী রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলাই বর্তমান উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। প্রশাসনে শুদ্ধি অভিযান, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার লক্ষ্যে এই কার্যক্রম ধারাবাহিকভাবে চলবে বলে সংশ্লিষ্ট মহল জানিয়েছে।





