কেন রাজনৈতিক আদর্শে বিশ্বাসী রাষ্ট্রপতি দরকার?

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের মতোই ২০০১ সালের অক্টোবরের নির্বাচনে বিএনপি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল। বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট ওই নির্বাচনে ভূমিধস বিজয় অর্জন করে। সরকার গঠনের পর বিএনপি রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত করে দলের প্রতিষ্ঠাকালীন মহাসচিব অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে। কিন্তু বেশ কিছু বিষয়ে অধ্যাপক চৌধুরীর আচরণ পছন্দ হয়নি বিএনপি নেতৃবৃন্দের। বিএনপি রাষ্ট্রপতির বিষয়ে নেতিবাচক সিদ্ধান্ত নেয়ার আগেই পদত্যাগ করেন অধ্যাপক চৌধুরী। নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আগে তৎকালীন স্পিকার ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।

অনেকেই মনে করেছিলেন, জমির উদ্দিন সরকারই হয়তো পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হবেন। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিএনপি পছন্দ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদকে। বিএনপি একজন নিরপেক্ষ এবং সুশীল প্রতিনিধিকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত করেছিল এই বিবেচনা থেকে যে, রাষ্ট্রপতি সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে থাকবেন। ইয়াজউদ্দিন বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক শিক্ষক রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত থাকলেও তিনি সরাসরি বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন না। শিক্ষক রাজনীতিতেও সাদা দলের প্রধান নেতা ছিলেন না তিনি। ইয়াজউদ্দিনকে রাষ্ট্রপতি করা হয়েছিল সম্ভবত, দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে একজন নির্দলীয় ব্যক্তিকে নির্বাচিত করার চিন্তা থেকেই। তাছাড়া দলীয় নেতা অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে তিক্ত অভিজ্ঞতার পর বিএনপি সরাসরি দলের সঙ্গে যুক্ত কাউকে রাষ্ট্রপতি করতে চায়নি। কিন্তু বিএনপিকে এই সিদ্ধান্তের চরম মূল্য দিতে হয়েছিল। যাদের অযোগ্যতা, ব্যর্থতা এবং ষড়যন্ত্রের কারণে ২০০৭ সালে এক-এগারোর অনির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এসেছিল তাদের অন‍্যতম ইয়াজউদ্দিন। চরম সংকটে তিনি সংবিধান ও গণতন্ত্র রক্ষায় তার উপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে সীমাহীন ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছিলেন। রাষ্ট্রপতি হিসেবে ইয়াজউদ্দিন নিজেকে অযোগ্য এবং মেরুদণ্ডহীন হিসেবে প্রমাণ করেন। ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে জায়গা পেয়েছে তার শাসনকাল।

২০০৬ সালে বিএনপি সরকারের মেয়াদের শেষ দিকে এসে আওয়ামী নানা ইস্যুতে আন্দোলন শুরু করে। স্বাভাবিক সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ী, পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান হবার কথা ছিল সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি কে এম হাসানের। কিন্তু আওয়ামী লীগ তার মনোনয়ন নিয়ে অযৌক্তিক আপত্তি তোলে। বিচারপতি কে. এম হাসানকে যেন তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান না করা হয় সেজন্য হরতাল, অবরোধ, জ্বালাও পোড়াও সহ বিভিন্ন সহিংস কর্মসূচি পালন করে দেশে চরম বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্য সৃষ্টি করে। এরকম একটি ভয়াবহ পরিস্থিতিতে বিচারপতি হাসান নিজেই এই দায়িত্ব গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান।

সাংবিধানিক বিধান অনুযায়ী, সব ধাপ অতিক্রম হবার পর রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিনকেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান হিসেবে ঘোষণা করা হয়। আওয়ামী লীগ সহ বিরোধীদলও এই সিদ্ধান্ত মেনে নেয়। বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ মনোনীত দশ উপদেষ্টা শপথ গ্রহণ করেন। ২০০৭ এর ২২ জানুয়ারি নির্বাচনের দিন ঘোষণা করা হয়। কিন্তু এসময় ইয়াজউদ্দিনের সীমাহীন অযোগ্যতা, ভুল ও দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণের কারণে দেশে আবারও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। সুশীল সমাজের একটি অংশ এবং কয়েকটি বিদেশি রাষ্ট্র বাংলাদেশে একটি দীর্ঘমেয়াদি অনির্বাচিত শাসন কায়েমের সুযোগ খুঁজছিল দীর্ঘদিন ধরেই। এজন্য তারা প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের বিভেদকে উসকে দিচ্ছিল পরিকল্পিত ভাবে। তাদের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সহজ হয়ে যায় ইয়াজউদ্দিনের মতো মেরুদণ্ডহীন রাষ্ট্রপতি কারণে। ২০০৭ সালে কৃত্রিমভাবে রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি করা হয়। এই সংকট সৃষ্টি সম্ভব হয়েছিল ইয়াজউদ্দিনের কারণে। আওয়ামী লীগ শেষ মুহূর্তে এসে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ায়। একই পথ অনুসরণ করে জাতীয় পার্টি। এই সুযোগ নেয় গণতন্ত্র বিনাশী ষড়যন্ত্রকারীরা।

তৎকালীন সেনাপ্রধান মঈন ইউ আহমেদের নেতৃত্বে একদল উচ্চাভিলাষী সেনা কর্মকর্তা বঙ্গভবনে গিয়ে অস্ত্রের মুখে ইয়াজউদ্দিনকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধানের পদ থেকে পদত্যাগে বাধ্য করেন। তাকে দিয়ে একটি ফরমায়েশি ভাষণ পাঠ করানো হয়। ইয়াজউদ্দিনের ঘাড়ে বন্দুক রেখেই এক এগারোর নীলনকশা বাস্তবায়ন করা হয়েছিল। সেদিন সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে থাকা একজন ব্যক্তির ভয় এবং কাপুরুষোচিত আচরণের কারণে বাংলাদেশের গণতন্ত্র বন্দী হয়।

এ প্রসঙ্গে আমাদের ফিরে যাওয়া দরকার ১৯৯৬ সালে। তখনও বঙ্গভবনে একই রকম পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল। তখন রাষ্ট্রপতি ছিলেন আবদ‍ুর রহমান বিশ্বাস। তিনি বিএনপির বড় নেতা ছিলেন না, কিন্তু দলের একজন আদর্শবান মাঠের নেতা থেকে নিজ যোগ্যতায় সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে আসীন হয়েছিলেন। ১৯৯৬ সালেও নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে এক জোট হয়ে আন্দোলন করে আওয়ামী লীগ ও জামায়াত। তারা সংসদ থেকে পদত্যাগ করে। কিন্তু গণতন্ত্র ও সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বেগম খালেদা জিয়া সব প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে ১৯৯৬ এর ১৫ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন করেন। নতুন সংসদ শুধুমাত্র তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংক্রান্ত সংবিধান সংশোধন করে। স্বল্পতম সময়ের মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন বেগম জিয়া। সাবেক প্রধান বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়। এই সময়ও নির্বাচন বানচাল এবং গণতন্ত্রকে বাধাগ্রস্ত করার ষড়যন্ত্র হয়েছিল।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান অনুযায়ী, সশস্ত্র বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ রাষ্ট্রপতির হাতে ন্যস্ত ছিল। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আব্দুর রহমান বিশ্বাস স্বীয় ক্ষমতা ও কর্তৃত্ববলে সেনাবাহিনীর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদে রদবদল করেন। এতে তীব্র আপত্তি জানান তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল নাসিম। তিনিও মঈন ইউ আহমেদের মতো অস্ত্র নিয়ে বঙ্গভবনে গিয়েছিলেন। সামরিক অভ্যুত্থান ঘটাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু রাজনৈতিক চেতনা ও দায়িত্ব পালনে অকুতোভয় থাকায় আবদুর রহমান বিশ্বাস নতজানু হননি। তিনি তার সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে সেনাপ্রধানকে অপসারণ করেন। রাষ্ট্রপতি আব্দুর রহমান বিশ্বাসের এই রাজনৈতিক দৃঢ়তা সেদিন একটি অনিবার্য সংঘাত ও সামরিক অভ্যুত্থানের শঙ্কা থেকে দেশকে রক্ষা করেছিল। জেনারেল মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমানকে সেনাপ্রধান করার পর রাষ্ট্রপতি কঠোরভাবে সেনা বিদ্রোহ দমন করেন। ঠিক সময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বলাবাহুল্য ওই নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হয়নি। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। কিন্তু আসল জয় হয় গণতন্ত্রের। একজন রাজনৈতিক চেতনার অধিকারী মানুষ গণতন্ত্র রক্ষায় সংকটে সাহসী হন। বন্দুকের নলের সামনে মাথানত করেন না।

এই দুটি ঘটনা যদি বিএনপি চেয়ারম্যান এবং প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতি মনোনয়নে বিবেচনা করেন তাহলে তার জন্য সিদ্ধান্ত নেয়া সহজ হবে। আমরা জানি বিএনপির স্থায়ী কমিটি রাষ্ট্রপতি মনোনয়নের সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য দলীয় প্রধানের কাছে একক ক্ষমতা দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিশ্চয়ই অতীতের অভিজ্ঞতা মূল্যায়ন করে সিদ্ধান্ত নেবেন।

রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিএনপি কোন নামিদামি ব্যক্তিকে পছন্দ করতেই পারে, কিন্তু তাতে জনগণের কিংবা বিএনপির কী আদৌ লাভ হবে? অতীতে আমরা দেখেছি, এ ধরনের ব্যক্তিরা দেশের মানুষের স্বার্থের চেয়ে নিজের স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করেন। এই পদে গিয়ে নিজের ইমেজ বৃদ্ধি করেন। দেশের স্বার্থের চেয়ে নিজের স্বার্থই তার কাছে বড় হয়।

এবারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কয়েকটি কারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশে আবার নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ব্যবস্থা ফিরে এসেছে। সর্বোচ্চ আদালতের রায় অনুযায়ী, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হবে। একটি নির্বাচিত সরকার থেকে একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত জটিল এবং স্পর্শকাতর। এই সময়ে নানা ধরনের রাজনৈতিক টানাপড়েন এবং বিভক্তি মাথাচাড়া দেয়। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অনৈক্য ও সংঘাত সৃষ্টি হয়। ব্যক্তিত্ববান, দৃঢ়চিত্ত এবং রাজনৈতিক বিবেচনা বোধ সম্পন্ন একজন রাষ্ট্রপতি পদে থাকলে সহজেই সংকট উত্তরণ সম্ভব। সকল রাজনৈতিক দলের কাছে গ্রহণযোগ্য রাষ্ট্রপতির কাছে সকলপক্ষ তাদের অভিমত ব্যক্ত করতে পারে। আলাপ আলোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক সংকট সমাধানের পথ খুঁজে পাওয়া যায়। তাই এবার রাষ্ট্রপতির পদটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

অতীতে যারা রাষ্ট্র বা সরকারের নির্বাহী প্রধানের দায়িত্ব পালন করেছেন তাদের রাষ্ট্রপতির পদে নির্বাচিত করলে বিএনপি সামনে নতুন সংকটে পড়তে পারে। কারণ তিনি এরকম সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে আসীন হলে তার অসমাপ্ত কাজগুলো সম্পন্ন করতে চাইবেন, প্রশাসনে তার পছন্দের লোকদের পুনর্বাসন করতে চাইবেন। ফলে রাষ্ট্র পরিচালনায় দ্বৈত শাসন কায়েম হবার আশঙ্কা তৈরি হবে।

বিএনপি জনগণের রায় পেয়েছে ৩১ দফার ভিত্তিতে। দলীয় আদর্শ বিশ্বাসী নন এমন মানুষ রাষ্ট্রপতি হলে ৩১ দফার চেয়ে নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়নে মনোযোগী হবেন। ফলে অনিবার্যভাবেই সরকারের সাথে তার স্বার্থের সংঘাত হবে। এতে গণতন্ত্র বিপন্ন হতে পারে। গণতন্ত্র বিরোধী শক্তি এখনও সক্রিয়। আরও ৫০ বছর বিনাভোটে যারা ক্ষমতায় থাকতে চেয়েছিল, তাদের এজেন্ডা পরিত্যক্ত হয়নি এখনও। বাংলাদেশের গণতন্ত্র এখনও পুরোপুরি সংকটমুক্ত নয়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিএনপির একটি নিজস্ব রাজনৈতিক সংস্কৃতি আছে, আছে নিজেদের আদর্শ। একমাত্র এই আদর্শ ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি ধারণ করা একজন রাষ্ট্রপতি হলেই গণতন্ত্র সংহত হবে। দেশে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সরকার প্রতিষ্ঠা হবে। মনে রাখতে হবে, ক্ষমতালোভী মেধাবীর চেয়ে দেশপ্রেমিক রাজনীতিবিদ রাষ্ট্রের জন্য বেশি প্রয়োজন।