সতের দিনে গ্যাসের উৎপাদন কমেছে ৩.৩০ কোটি ঘনফুট

দেশীয় গ্যাস ফিল্ডের উৎপাদন ধস কোনভাবেই ঠেকানো যাচ্ছে না। অগ্নিকাণ্ডে একটি এফএসআরইউ বন্ধ হয়ে পর থেকে ১৭ দিনের ব্যবধানে দেশীয় উৎপাদন কমেছে ৩ কোটি ৩০ লাখ ঘনফুট।

পেট্রোবাংলার উৎপাদন বিবরণী অনুযায়ী, ২১ জুলাই দেশীয় ফিল্ডগুলো থেকে গ্যাস উৎপাদন হয়েছিল ১৬৫৬ মিলিয়ন ঘনফুট, ৭ আগস্ট ১৬২৩ মিলিয়নে নেমে এসেছে। প্রতিদিনেই কমছে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন, অন্যদিকে বাড়ছে চাহিদা। বাড়ন্ত চাহিদা সামাল দিতে গিয়ে কয়েক বছর ধরেই হিমশিম খাচ্ছে পেট্রোবাংলা। এক সময়ে দেশীয় গ্যাস ফিল্ডগুলো থেকে দৈনিক ২৮০০ মিলিয়নের মতো গ্যাস উৎপাদিত হলেও এখন ১৬২৩ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে এসেছে। মজুদ কমে যাওয়ায় প্রতিনিয়ত কমে আসছে উৎপাদন।

বেশি উদ্বেগের বিষয় বড় গ্যাসক্ষেত্র বিবিয়ানার উৎপাদন কমে যাওয়া। ফিল্ডটি থেকে এখনও সাড়ে ৪৫ শতাংশের মতো গ্যাস যোগান আসছে। আর কনডেনসেট পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ৬৮ শতাংশ। এক সময়ে ১৩৫০ মিলিয়নের মতো উৎপাদন দিতো, ৭ আগস্ট ৭৪৩ মিলিয়নে নেমে গেছে। মজুদ কমে আসায় দ্রুতই কমে যাচ্ছে উৎপাদন। শঙ্কার হচ্ছে যে কোন সময়ে বড় ধরণের ধসের শঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

২০২৪ সালের ১ জুলাইয়ের রিপোর্ট অনুযায়ী ফিল্ডটি থেকে প্রায় ৬ টিসিএফ (ট্রিলিয়ন ঘনফুট)গ্যাস উত্তোলন করা হয়েছে। তখন অবশিষ্ট মজুদ উল্লেখ করা হয় ১.৬৬ টিসিএফ। এরপর আরও ২ বছর ২ মাস অতিবাহিত হয়েছে।

দেশীয় উৎস থেকে পাওয়া গ্যাসের ঘনমিটার প্রতি গড় মূল্য ৬.০৭ টাকা, আর ৩০ শতাংশ আমদানির পর দাঁড়াচ্ছে ৩১.৬৫ টাকা থেকে ৪৫.৭৯ টাকা। ৩০ শতাংশ আমদানি করতে গিয়েই দাম সামাল দেওয়া কঠিন হচ্ছে, অদূর ভবিষ্যতে ৭০ শতাংশ আমদানির প্রাক্কলনে কি দাঁড়াবে সহজেই অনুমেয়। তারপরও বিগত সরকারগুলো আমদানির দিকেই ঝুঁকেছে। যে কারণে আজকের মহাসংকট।

দেশীয় উৎপাদন কমে যাওয়ায় যখন অনুসন্ধান কার‌্যক্রম জোরদার করা জরুরি ছিল। তখন আমদানি পথে পা বাড়ায় বিগত সরকার। ২০১৮ সালে এলএনজি আমদানি শুরু করে, এ জন্য দু’টি এফএসআরইউ স্থাপন করা হয়। যার মাধ্যমে সর্বোচ্চ ১১’শ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব, যা অনেক শর্তসাপেক্ষ।

প্রাথমিক জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) সাবেক সদস্য মকবুল ই-এলাহী চৌধুরী বলেছেন, এফএসআরইউ কোন স্থায়ী সমাধান হতে পারে না। এটার ভয়াবহ ঝূঁকি রয়েছে, মেশিনারিজ জিনিস যে কোন সময় বিগড়ে যেতে পারে, এর আগেও একবার এফএসআরইউ বিভ্রাট হয়েছে। আবার বছরে কমপক্ষে ২ বার সাগর উত্তাল হয়ে পড়ে তখন সরবরাহ বন্ধ রাখতে হয়। আবার দেখেন ইরান সংকটে আমাদের কি ঝামেলায় পড়লাম।

তিনি বলেন, একমাত্র সমাধান হলো নিজস্ব উৎসের গ্যাস নিশ্চিত করা। যৌথ উদ্যোগ এবং আইওসির মাধ্যমে বাংলাদেশের স্থল ও সমুদ্রসীমা থেকে তেল, গ্যাস ও কয়লা অনুসন্ধান ও উত্তোলন করা। অনুসন্ধান ও উত্তোলনের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে হবে। ‘জাতীয় জ্বালানি নীতি,বাংলাদেশ-১৯৯৬’-এ ঘোষিত নীতি অনুযায়ী বাংলাদেশের পশ্চিমাঞ্চল, ‘অ্যাবনরমাল প্রেশার জোন’ এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় গ্যাস ক্রয়ের ক্ষেত্রে উচ্চমূল্য ঘোষণা করা উচিৎ।

তিনি বলেন, পিএসসিতে (উৎপাদন ও বন্টন চুক্তি) স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকা দরকার আইওসি সংক্রান্ত ফাইলগুলোর নিষ্পত্তি ৩ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে। এছাড়া ড্রিলিং বা খনন কাজের জন্য প্রয়োজনীয় অস্থায়ী জমির বরাদ্দ প্রক্রিয়া তিন মাসের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে। প্রকল্প গ্রহণের দীর্ঘসুত্রতা দূর করতে হবে।

যখন দ্রুততার সঙ্গে অনুসন্ধান ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করার কথা বলছে বিশেষজ্ঞরা। তখন একটি ডিপিপি চুড়ান্ত করতেই এক যুগের মতো সময় রেকর্ড করা হয়েছে। ২০১২ সালে সুনেত্র-১ খননের পর গ্যাস পাওয়া গেলো না, সেখানে রিগ থাকা অবস্থায় থ্রিডি করা হয়। এরপর থ্রিডির তথ্য যাচাই শেষে ২০১৫ সালের দিকে সুনেত্র -২ (অনুসন্ধান) কূপ খননের সিদ্ধান্ত হয়। সেই কূপের ডিপিপি অনুমোদন হয়েছে গত মাসে।

যখন শিল্পমালিকরা চাতক পাখির মতো চেয়ে রয়েছে গ্যাসের জন্য। তখন খুববেশি সুসংবাদ দিতে পারছেন না কেউই। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী অনুমোদিত গ্রাহকের গ্যাসের চাহিদা রয়েছে ৫৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট। প্রকৃত চাহিদা বিবেচনা করা হয় ৪০০০ মিলিয়নের মতো, সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে মাত্র ২৭০০ মিলিয়নের মতো। কখনও সার কারখানা বন্ধ, কখনও বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ, কখনও আবার সিএনজি ফিলিং স্টেশন বন্ধ রাখা হচ্ছে। ঘাটতি সামাল দিতে নতুন সংযোগ পুরোপুরি বন্ধ, ইতোমধ্যে অনুমোদিন সংযোগেও কমিশনিং (চালু) করাও বন্ধ। এতে করে থমকে রয়েছে শিল্পায়ন।

এক তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির ৩৭৯টি শিল্পের বিপরীতে প্রতিশ্রুত লোডের পরিমাণ রয়েছে ৩৮০ মিলিয়ন ঘনফুট। যারা কোটি কোটি টাকা জামানত দিয়ে সংযোগের জন্য ঘুরছেন। পেট্রোবাংলা তথ্য অনুযায়ী ৬ গ্যাস বিতরণ কোম্পানির কাছে ১ হাজার ৮০০টির বেশি আবেদন ঝুলে রয়েছে। এরমধ্যে প্রায় ৫৫০টি প্রতিষ্ঠান সব প্রক্রিয়া শেষ করে সংযোগের (প্রতিশ্রুত সংযোগ) অপেক্ষায় রয়েছে।

উদ্যোক্তারা দাবি করেছেন, কারখানা তৈরি করার পর জুতার তলা ক্ষয় করে গ্যাস সংযোগের অনুমোদন পেয়েছে। এরপর কোটি কোটি টাকা নিরাপত্তা জামানত দিয়েছি, তারপরও গ্যাস সংযোগ মিলছে না।আমাদের জামানতের টাকায় গ্যাস কোম্পানি মুনাফা করছে, আর আমরা বিনিয়োগকারীরা খেলাপী হয়ে পড়ছি।

একদিকে যখন দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে চাইলেও সহসা আমদানি বাড়ানোর সুযোগ নেই। আমদানি বাড়াতে হলে নতুন এলএনজি টার্মিনাল ও পাইপলাইন স্থাপন করতে হবে, যা খুবই সময় সাপেক্ষ। যে কারনে আসছে ২০২৭ ও ২০২৮ সালে গ্যাস সংকট আরও প্রকট হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

সবকিছু বিবেচনায় খুব কম বিকল্পই রয়েছে জ্বালানি বিভাগের হাতে। এদিক থেকে আকর্ষণীয় বিবেচনা করা হচ্ছে ছাতক গ্যাস ফিল্ডকে। ছাতকে পাইপলাইন বিদ্যমান, দ্রুত সময়ের মধ্যে লাইনে সরবরাহ দেওয়া সম্ভব, যা আর কোন ফিল্ডে সম্ভব নয়। তার চেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে নিশ্চিত মজুদের বিষয়টি। সেই ডিপিপি নিয়ে বসে রয়েছে পেট্রোবাংলা। এ রকম অনেক ঢিলেমির মাশুল দিতে হচ্ছে, তবুও কোন গরজ দেখা যাচ্ছে না পেট্রোবাংলা।

সুনামির মতো ধেয়ে আসা গ্যাস সংকট ঠেকাতে রাত-দিন কাজ করার কথা পেট্রোবাংলার। সেই প্রতিষ্ঠান কাণ্ডারির অভাবে রুটিন ওয়ার্ক চলছে প্রায় ৩ মাস ধরে।

চেয়ারম্যানের পদ শূন্য অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন মো. আব্দুল মান্নান। তিনি অতিরিক্ত সচিবের দায়িত্বের পাশাপাশি পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। একজন পূর্ণাঙ্গ চেয়ারম্যান সকাল থেকে রাত ৯ টা পর্যন্ত কাজ করে কুলিয়ে উঠতে পারেন না, সেখানে খন্ডকালীনভাবে কতটা কাজ করা সম্ভব সহজেই অনুমেয়। তিনি মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সেখানেও তার দায়িত্ব খুবই গুরুত্বপূর্ণ, ওই পদের জন্য বিভিন্ন বৈঠকে ছুটতে হচ্ছে পেট্রোবাংলা ফেলে।