জরুরি অবস্থায় নিষিদ্ধ বিষয় বৈধ করে দেয়, এটি ইসলামী ফিকহের একটি সুপরিচিত আইনগত মূলনীতি। এর অর্থ হলো, এমন পরিস্থিতি, যেখানে মানুষের জীবন, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, ধর্ম, বুদ্ধি বা অপরিহার্য কোনো স্বার্থ মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হয়, সেই পরিস্থিতি নিষিদ্ধ বিষয় বৈধ করে দেয়। অর্থাৎ জরুরি প্রয়োজন দেখা দিলে, নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে নিষিদ্ধ কিছু বিষয় সাময়িকভাবে বৈধ হয়ে যেতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে যে কোনো অজুহাতে হারাম হালাল হয়ে যায়।
ইসলামী শরিয়তের এই নীতি পবিত্র কোরআনের একাধিক আয়াত দ্বারা প্রমাণিত। পবিত্র কোরআনে এসেছে, ‘তিনি (আল্লাহ) তোমাদের জন্য যা হারাম করেছেন তা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন, তবে যে বিষয়ে তোমরা নিরুপায় হয়ে পড়ো তা ব্যতিক্রম।’ (সুরা আল-আনআম, আয়াত : ১১৯)
অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘যে ব্যক্তি বাধ্য হয়, কিন্তু সীমালঙ্ঘনকারী বা অবাধ্য নয়, তার কোনো গুনাহ নেই।’ (সুরা আল-বাকারা, আয়াত : ১৭৩
এছাড়া একই অর্থে সুরা আল-মায়িদা (৫:৩), সুরা আল-আনআম (৬:১৪৫) এবং সুরা আন-নাহল (১৬:১১৫)-এও এ বিধান এসেছে।
তবে এই নীতির অর্থ সব ধরনের হারাম বৈধ হয়ে যায় এমন নয়। বরং এক্ষেত্রে দুটি শর্ত আছে : প্রকৃত জরুরি অবস্থা থাকতে হবে। হারাম কাজের ক্ষতি যেন জরুরি অবস্থার ক্ষতির চেয়ে বড় না হয়।
যদি হারাম কাজের ক্ষতি আরও ভয়াবহ হয়, তাহলে তা বৈধ হবে না। ফিকহে এ ধরনের সাময়িক অনুমতিকে রুখসাহ বা ছাড় বলা হয়।
রুখসাহ (ছাড়)-এর প্রকারভেদ
১. জরুরি অবস্থায় সাময়িকভাবে বৈধ হয়ে যায়
যেমন: অনাহারে মৃতু্যর আশঙ্কায় মৃত পশুর মাংস খাওয়া। প্রয়োজনমতো শূকরের মাংস খাওয়া। জীবন রক্ষার জন্য বাধ্য হয়ে নিষিদ্ধ খাদ্য গ্রহণ করা অথবা প্রাণনাশের ভয়ে জোরপূর্বক বাধ্য হওয়া।এক্ষেত্রে জীবন বাঁচানোর জন্য প্রয়োজনীয় পরিমাণ গ্রহণ করা বৈধ; কখনো কখনো তা করা ওয়াজিবও হয়ে যায়।
২. কাজটি মূলত হারামই থাকে, কিন্তু বাধ্য হয়ে করলে গুনাহ হয় না
যেমন: প্রাণনাশের হুমকিতে কুফরির কথা মুখে বলা, অথচ অন্তরে ঈমান অটুট থাকা। জোরপূর্বক অন্যের সম্পদের ক্ষতি করা। এক্ষেত্রে কাজটি মূলত হারামই থাকে; তবে বাধ্য হওয়ায় আল্লাহ ক্ষমা করেন। তবে অন্যের ক্ষতি করলে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
৩. এমন কিছু বিষয় আছে, যা কোনো অবস্থাতেই বৈধ নয়
যেমন: নিরপরাধ মুসলিমকে হত্যা করা। কারও অঙ্গ কেটে ফেলা। ব্যভিচার (জিনা) করা। পিতা-মাতাকে প্রহার করা। এসব কাজ গুরুতর হারাম। শুধু ‘আমি বাধ্য ছিলাম’ এ অজুহাতে এগুলো বৈধ হয়ে যায় না।
চিকিত্সার ক্ষেত্রে এই নীতির প্রয়োগ
কোনো বিশ্বস্ত মুসলিম চিকিত্সক যদি নিশ্চিতভাবে বলেন যে হারাম কোনো বস্তুই একমাত্র চিকিত্সা এবং এর বিকল্প নেই, তাহলে কিছু আলেম প্রয়োজনের সীমার মধ্যে তা গ্রহণের অনুমতি দিয়েছেন।
এখানে আরেকটি বিষয় স্মরণীয় ‘যা প্রয়োজনের কারণে বৈধ হয়, তা প্রয়োজনের পরিমাণেই সীমাবদ্ধ থাকবে।’
অর্থাত্ জরুরি অবস্থার কারণে যতটুকু অনুমতি দেওয়া হয়েছে, ততটুকুই করা যাবে। প্রয়োজন শেষ হলে সেই অনুমতিও শেষ হয়ে যাবে।
উদাহরণ : ১. অনাহারে মৃতু্যর আশঙ্কা : কেউ যদি অনাহারে মৃতু্যর মুখে পড়ে, তবে অন্যের খাদ্য থেকে জীবন বাঁচানোর জন্য যতটুকু দরকার, ততটুকু নিতে পারবে। পুরো সম্পদ দখল করতে পারবে না।
২. চিকিত্সক রোগীর সতর দেখবেন : চিকিত্সার প্রয়োজনে চিকিত্সক রোগীর শরীরের গোপন অংশ দেখতে পারবেন। কিন্তু যতটুকু চিকিত্সার জন্য দরকার, ততটুকুই।
৩. প্রতিবেশীর গোপনীয়তা : কোনো জানালা যদি প্রতিবেশীর ঘরের ভেতর দেখা যাওয়ার কারণ হয়, তবে পুরো জানালা বন্ধ করতেই হবে, এমন নয়। বরং এমন ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যাতে অন্যের গোপনীয়তা নষ্ট না হয়।
৪. ভাঙা হাড়ে ব্যান্ডেজ বা প্লাস্টার প্রয়োজন অনুযায়ী যতটুকু সুস্থ অংশ ঢাকতে হয়, ততটুকুই ঢাকতে হবে অতিরিক্ত নয়।
মূলকথা হলো, জরুরি অবস্থা নিষিদ্ধ বিষয় সাময়িকভাবে বৈধ করতে পারে; তবে তা কেবল প্রকৃত প্রয়োজনের সীমার মধ্যেই।





