‘বেদের মেয়ে জোছনা’র সেই কালজয়ী রাজকুমার, যিনি একসময় বাংলা চলচ্চিত্রের রুপালী পর্দায় কোটি মানুষের হৃদয় জয় করেছিলেন, তার জীবন হুট করেই এক নির্মম সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বদলে গিয়েছিল। বাংলা চলচ্চিত্রের রুপালী পর্দার আলো-ঝলমলে জগত ছেড়ে একসময় এক নির্মম সত্যের মুখোমুখি হয়েছিলেন ইলিয়াস কাঞ্চন।
মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রিয় স্ত্রীকে হারানোর পর নিজের গভীর শোককে তিনি পরিণত করেছিলেন শক্তিতে, তিনি আর শুধু চিত্রনায়ক থাকেননি; হয়ে উঠেছিলেন রাজপথের এক নিঃসঙ্গ, অবিনাশী যোদ্ধা। নিজের ব্যক্তিগত আরাম-আয়েশ আর আলো ঝলমলে জীবন পেছনে ফেলে তিনি রাজপথে নেমেছিলেন এক অদম্য লড়াইয়ে। গত তিন দশক ধরে নিজের ব্যক্তিগত দুঃখকে শক্তিতে রূপান্তর করে তিনি চিৎকার করে বলে গেছেন ‘নিরাপদ সড়ক চাই’। দেশের মানুষের জীবন বাঁচাতে, অন্যের বুক খালি হওয়া বন্ধ করতে তিনি অকাতরে ধুলোবালি মেখে লড়েছেন দিনের পর দিন।
কিন্তু সময়ের নিয়ম বড় নির্মম, নিয়তির খেলা আরও বেশি নিষ্ঠুর। রাজপথের সেই তেজোদীপ্ত সিংহহৃদয় মানুষটি আজ ব্রেন টিউমারের মতো মরণব্যাধির কাছে পরাজিত হয়ে নিভৃতে লড়ছেন জীবনের সবচেয়ে কঠিন যুদ্ধ। মস্তিস্কের এই মরণব্যাধি আজ তার স্মৃতির পাতাগুলো একে একে মুছে দিচ্ছে; তিনি আর আগের মতো কাউকে চিনতে পারছেন না, চারপাশের চেনা মানুষের কথা কিংবা তাদের চোখের ভাষা বোঝার ক্ষমতাটুকুও ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলছেন। যে মানুষটির একটি ডাকে হাজারো মানুষ রাজপথে নেমে আসত, আজ তিনি নিজের চেনা পৃথিবীটাকেই আর চিনতে পারছেন না।
দীর্ঘ চিকিৎসা শেষে কিছুটা সামলে উঠে প্রিয় জন্মভূমির টানে সম্প্রতি গত ৩ আগস্ট তিনি দেশে ফিরে এসেছিলেন। কিন্তু শারীরিক জটিলতা ও চিকিৎসার পরবর্তী ধাপের জন্য আজ (১২ আগস্ট ২০২৬) তাকে আবারও ভারাক্রান্ত মনে পাড়ি জমাতে হচ্ছে লন্ডনের উদ্দেশ্যে। হয়তো এটাই জীবনের সবচেয়ে নীরব বিদায়। যে মানুষটি আর কাউকে চিনতে পারছেন না, যে মানুষটির গলা ছেড়ে রাজপথে নামার আর শক্তিটুকু নেই। তাঁর অনুপস্থিতিতে তাঁর অনুপ্রেরণার অঙ্কেই হয়তো রাস্তায় নামবেন, নিরাপদ সড়কের দাবীতে অটল থাকবেন।
লন্ডনের ধূসর আকাশে ঢাকা পড়ার সময় বিমান থেকে তার নিষ্পাপ, অপলক চোখ দুটো হয়তো শেষবারের মতো খুঁজে ফিরছিল বাংলাদেশের সেই পরিচিত পথগুলোকে। অসুস্থতা আর স্মৃতিভ্রংশ তাকে চেনা জগত থেকে দূরে সরিয়ে নিলেও, রাজপথের এই নিঃসঙ্গ যোদ্ধার অবচেতন মনে আজও যেন প্রতিধ্বনিত হয় একসময়ের সেই প্রিয় রাজকুমারের আকুল কণ্ঠস্বর—‘আমার দেশের সড়কগুলো যেন আর কারো বুক খালি না করে, প্রতিটি যাত্রা যেন হয় নিরাপদ।’





