নেপালে ৩৯২ জনের মৃত্যু, নিখোঁজ দেড় সহস্রাধিক

নেপালে আকস্মিক হড়পা বান ও ভূমিধসে প্রলয়ংকরী ধ্বংসযজ্ঞের ঘটনা ঘটেছে। গত বুধবার স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে এ ধ্বংসযজ্ঞ শুরু হয়। রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে ৪৫ কিলোমিটার উত্তরে ল্যাংটাং লিরু পর্বত থেকে শুরু হয় হিমবাহ ধস নামা। গতকাল সন্ধ্যায় পাওয়া সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, এ ঘটনায় নিহতের সংখ্যা ৩৯২-এ পৌঁছেছে। নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা দেড় হাজারের বেশি। নিহত ও নিখোঁজদের মধ্যে অনেক বিদেশি রয়েছেন। সূত্র : রয়টার্স, কাঠমান্ডু পোস্ট, আলজাজিরা

প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, হিমালয় পর্বতমালায় ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে লন্ডভন্ড হয়ে গেছে নেপাল ও চীনের তিব্বত সীমান্তসংলগ্ন বিস্তীর্ণ অঞ্চল। বুধবার হিমালয়ের পার্বত্য নদী থেকে আসা হড়পা বান এবং কাদা ও পাথরে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে বহু গ্রাম ও পাহাড়ি নগরী। লাসা ও কাঠমান্ডুকে যুক্ত করা নেপাল-চীন সীমান্তের গুরুত্বপূর্ণ রসুয়াগধি ও জিরোং কাউন্টি এলাকায় এ বিপর্যয় ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, কাদা ও পাথরের বিশালাকার দেয়ালের মতো ঢল ধেয়ে এসে চোখের পলকে সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যায়। পাহাড়ের উঁচু স্থান থেকে নেমে আসা এই কাদা ও পানির প্রবল স্রোতে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে বাড়িঘর, পথঘাট, সেতু এবং কয়েকটি বিদ্যুৎ প্রকল্প। এক প্রতিবেদনে বলা হয়ে, চীন সীমান্তের কাছে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার একটি ভূকম্পনের সঙ্গে সঙ্গে ল্যাংটাং পর্বতের উত্তর পিঠে এক ভয়াবহ হিমবাহ ধস ঘটে। নেপালের অভ্যন্তরে অবস্থিত এই পর্বত থেকে ধসে পড়া বিশাল বর্জ্য ও পাথর বর্ষায় স্ফীত এবং নেপাল-চীন সীমান্ত নির্ধারণকারী লেন্দে খোলা নদীর গতিপথ সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে ফেলে। পরে সেখানে তৈরি হওয়া কৃত্রিম হ্রদটি ফেটে গেলে পলি, পাথর ও কাদার এক দানবীয় ঢল তিশূলী নদী দিয়ে নেপালের দিকে প্রবল বেগে ধাবিত হয়। প্লানেট ল্যাবসের স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত করেছেন, ধসের কারণেই এই বিপর্যয়। তবে ভূকম্পন ধস ঘটিয়েছে নাকি বিশালাকার ধসটিই ভূকম্পিক তরঙ্গ তৈরি করেছে- তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে পর্বতের বরফ এমনিতেই ভঙ্গুর ছিল এবং বর্ষার শেষভাগে পাহাড়ের ঢাল ভারী হয়ে পড়ায় ও পারমাফ্রস্ট সিক্ত থাকায় এই ধস চরম রূপ নেয়। লাশের মিছিল বাড়ছেই, নিখোঁজ দেড় সহস্রাধিক : তুষারধসের পর হঠাৎ সৃষ্টি হওয়া প্রায় ১০০ মিটার উঁচু পানির ঢেউয়ে ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে নেপাল। এতে গতকাল পর্যন্ত পাওয়া খবর অনুযায়ী, অন্তত ৩৬০ জন মানুষ নিহত এবং দেড় সহস্রাধিক নিখোঁজ রয়েছেন বলে নেপালের পুলিশ জানিয়েছে। নিখোঁজদের মধ্যে বিদেশি পর্যটক ও নিরাপত্তাকর্মীরাও রয়েছেন। নোয়াকোটের বিদুর পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের চেয়ারম্যান রবীন্দ্র নেপাল জানান, সোলে থেকে আক্কারে বাজার পর্যন্ত কয়েক শ বাড়ি বন্যায় নিশ্চিহ্ন হয়েছে। অনেকে নিরাপদে যেতে পারলেও বহু প্রবীণ ও শিশু এখনো নিখোঁজ। যোগাযোগব্যবস্থা পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় তিনিও পৌর ভবনে আটকা পড়েছেন।

স্থানীয় গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, পুলিশের মুখপাত্র আবি নারায়ণ কাফলে নিহতের সংখ্যা নিশ্চিত করে বলেছেন, এখন পর্যন্ত চিতাওয়ানে ১০৯টি মৃতদেহ, পূর্ব নাওয়ালপারাসিতে ৬২, দাধিংয়ে ২৭, গোর্খা থেকে ২০, রাসুয়া থেকে ১৭, পশ্চিম নাওয়ালপারাসিতে ১৫, নোয়াকোট থেকে ১২ এবং তানাতুন নামে একটি জায়গা থেকে ৯টি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

উদ্ধার তৎপরতা : উদ্ধার অভিযানে ৫ হাজারের বেশি নেপালি সেনা ও ৫ হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য অংশ নিয়েছেন। নেপাল সেনাবাহিনীর মুখপাত্র রাজা রাম বাসনেত জানিয়েছেন, গতকাল তারা ১২৫ জনকে উদ্ধার করেছেন। উদ্ধার হওয়াদের মধ্যে ২০ জন বিদেশি নাগরিক। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোতে আটকে পড়াদের জন্য হেলিকপ্টারে করে তাঁবু, খাবার ও অন্যান্য জরুরি ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। এসব সহায়তা দিয়েছে প্রতিবেশী ভারত। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এ ঘটনায় এ পর্যন্ত অন্তত ১৬৫ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, তবে নিহতের সংখ্যা আরও বহুগুণ বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছে পুলিশ।

এবার দুর্যোগের পর নেপালের জলবিদ্যা ও আবহাওয়া বিভাগ এবং চীনের আবহাওয়া প্রশাসনের কর্মকর্তারা বুধবার বিকালেই ভার্চুয়াল বৈঠক করেন। পরে চীন নেপালকে জানিয়েছে, সীমান্তের ওপারে নদীর পানির প্রবাহ বাড়তে শুরু করলে তারা দ্রুত নেপালকে তথ্য দেবে।

দুর্যোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন বিপর্যয় ঠেকাতে হিমালয়ের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বাস্তব সময়ের তথ্য সংগ্রহের জন্য সেন্সর, ক্যামেরা ও উন্নত পর্যবেক্ষণব্যবস্থা স্থাপন করতে হবে। তবে বিপদের উৎস যদি সীমান্তের ওপারে হয়, তাহলে শুধু নেপালের নিজস্ব সতর্কবার্তা ব্যবস্থা দিয়ে এ ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। তুষারধস বা অন্য কোনো বিপজ্জনক ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে সেই তথ্য দুই দেশের মধ্যে আদানপ্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে।