পুরোনো ও ফিটনেসবিহীন বাসের কালো ধোঁয়ায় শ্বাসরুদ্ধ নগরজীবন। অভিযান হচ্ছে, দূষণ কমছে না। রাজধানীর রাজপথে এখন শুধু যানজট নয়, ছড়িয়ে পড়ছে বিষ। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত হাজার হাজার পথচারী ও যাত্রীকে বাধ্য হয়েই বিষাক্ত বাতাসে শ্বাস নিতে হচ্ছে। চোখ জ্বালা, কাশি ও শ্বাসকষ্ট যেন নগরজীবনের নিত্যসঙ্গী। আইন আছে, অভিযান আছে, জরিমানাও আছে, কিন্তু সড়কে কালো ধোঁয়ার দাপট কমছে না। ফলে প্রশ্ন উঠছে-অভিযান যদি দূষণ বন্ধ করতে না পারে, তবে এ অভিযান কাদের জন্য? গবেষণায় ঢাকার বায়ুদূষণের অন্যতম উৎস হিসেবে পুরোনো ও ঠিকমতো রক্ষণাবেক্ষণ না করা যানবাহনের নির্গমনকে চিহ্নিত করা হয়েছে। শুধু শুষ্ক মৌসুম নয়, বর্ষাকালেও ঢাকার বায়ুমান নিয়ে উদ্বেগ কাটেনি। জুলাইয়ের শেষ দিকে ঢাকা বিশ্বের দূষিত শহরগুলোর তালিকায় পঞ্চম অবস্থানে ছিল। ওই সময় এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (AQI) ছিল ১১৪, যা সংবেদনশীল জনগোষ্ঠীর জন্য অস্বাস্থ্যকর।
অভিযান চলছে, কালো ধোঁয়া থামছে না : পরিবেশ অধিদপ্তর, বিআরটিএ ও পুলিশের যৌথ অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত জুলাইয়ে রাজধানীতে অভিযান চালিয়ে ৯১৫টি মামলা করা হয়েছে।
তবে প্রশ্ন উঠছে-জরিমানা করার পর একই গাড়ি যদি আবার রাস্তায় ফিরে আসে, তাহলে এ অভিযান কতটা কার্যকর? গত জুনে বিআরটিএ জানিয়েছে, ফিটনেস অনুপযোগী, ঝুঁকিপূর্ণ, ক্ষতিগ্রস্ত ও পরিবেশ দূষণকারী মোটরযান সড়কে চলতে পারবে না। এর পরও রাজধানীর সড়কে কালো ধোঁয়া ছড়ানো বাসের উপস্থিতি আইন প্রয়োগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। জুলাইয়ে প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, ঢাকার ৪১৮টি বাস রুটের মধ্যে সচল রয়েছে মাত্র ৯৮টি। একই সঙ্গে ফিটনেসবিহীন ১ হাজারের বেশি বাস অপসারণের সিদ্ধান্তের কথাও জানানো হয়েছে। এতে স্পষ্ট, সমস্যা শুধু কয়েকটি দূষণকারী বাসের নয়; রাজধানীর গণপরিবহনব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সংকটও এর সঙ্গে জড়িত।
স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবদুস সালামের মতে পুরোনো ও ত্রুটিপূর্ণ ইঞ্জিনের যানবাহন রাজধানীর বায়ুদূষণের বড় উৎস। পুরোনো যানবাহন ধাপে ধাপে সরিয়ে দেওয়া, নির্গমন নিয়ন্ত্রণ কঠোর করা এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন।
পরিবেশ ও বায়ুদূষণ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদারের মতে শুধু মৌসুমি অভিযান দিয়ে ঢাকার বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। ফিটনেসবিহীন যানবাহন নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি নির্মাণস্থলের ধুলা কমানো ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞদের মতে যানবাহনের ধোঁয়া থেকে নির্গত সূক্ষ্ম কণা ফুসফুসের গভীরে প্রবেশ করতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি বায়ুদূষণের সঙ্গে শ্বাসতন্ত্র, হৃদ্রোগসহ নান্ন গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্পর্ক রয়েছে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন পথচারী ও দীর্ঘ সময় সড়কে দায়িত্ব পালনকারী ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরাও।
স্ক্র্যাপিং ছাড়া স্থায়ী সমাধান কঠিন : বিশেষজ্ঞদের মতে শুধু জরিমানা বা মোবাইল কোর্ট দিয়ে এ সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে না। অর্থনৈতিক ও কারিগরি দিক থেকে চলাচলের অনুপযোগী যানবাহনকে স্থায়ীভাবে স্ক্র্যাপিংয়ের আওতায় আনতে হবে। ফিটনেসবিহীন ও অতিরিক্ত দূষণকারী যানবাহনের তালিকা প্রকাশ করে ধাপে ধাপে সড়ক থেকে প্রত্যাহার, বাধ্যতামূলক নির্গমন পরীক্ষা, বিআরটিএ ও ট্রাফিক পুলিশের সমন্বিত নজরদারি এবং নিয়মিত তথ্য প্রকাশই হতে পারে কার্যকর সমাধানের পথ।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের যুগ্ম-কমিশনার (ট্রাফিক-উত্তর) আ স ম শামসুর রহমান ভূঁঞা বলেন, ‘পরিবেশ দূষণ রোধ ও সড়কে চলাচলকারী যানবাহন থেকে অতিরিক্ত কালো ধোঁয়া নির্গমন বন্ধে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। এ ছাড়া শব্দদূষণ রোধে যানবাহনে লাগানো অবৈধ হাইড্রোলিক হর্ন জব্দ করার পাশাপাশি নীরব এলাকায় হর্ন বাজালে জরিমানা করা হচ্ছে।’





