অর্থনীতির নতুন দুয়ার লালদিয়া টার্মিনাল

দেশের সামুদ্রিক বাণিজ্যে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলছে চট্টগ্রামের লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল। কর্ণফুলী নদীর তীরে ৪৯.১৫ একর জায়গায় নির্মিত হতে যাওয়া দেশের প্রথম গ্রিন ফিল্ড কনটেইনার টার্মিনালটির নির্মাণকাজ গতকাল রোববার আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে।

ডেনমার্কভিত্তিক আন্তর্জাতিক টার্মিনাল অপারেটর এপিএম টার্মিনালসের ৫৫০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগে নির্মিত এই টার্মিনাল চালু হলে চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা বছরে প্রায় আট লাখ টিইইউএস বাড়বে। নতুন টার্মিনালের নির্মাণকাজ শেষ হলে সাড়ে ১০ মিটার ড্রাফটের এবং ছয় হাজার টিইইউএস ধারণক্ষমতার বড় জাহাজ সেখানে ভিড়তে পারবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালকে শতভাগ আধুনিক ‘জিরো কার্বন ফুটপ্রিন্ট’ ও ডিকার্বনাইজড মডেল অনুযায়ী সাজানো হচ্ছে। এখানে টার্মিনালের পণ্য খালাস, ইয়ার্ড পরিবহন, ক্রেনসহ সব ইকুইপমেন্ট পরিচালিত হবে সম্পূর্ণ বিদ্যুত্শক্তিতে।

গতকাল সকাল ১১টায় পতেঙ্গার লালদিয়ার চরে টার্মিনালটির গ্রাউন্ড ব্রেকিং অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে নির্মাণকাজের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। উপস্থিত ছিলেন নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। অনুষ্ঠানে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী বলেন, ‘চট্টগ্রামবাসীর হৃদয় হলো বন্দর।

লালদিয়ার টার্মিনালটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। এটার সঙ্গে আরো কয়েকটি পোর্ট করতে যাচ্ছি। চট্টগ্রামে আরো কয়েকটি ইকোনমিক জোন হবে। চট্টগ্রামের মানুষের যে প্রত্যাশা, বাংলাদেশের মানুষের যে প্রত্যাশা—চট্টগ্রাম বাণিজ্যিক রাজধানী হবে। বাণিজ্যিক রাজধানী কেউ করে না, বাণিজ্যিক রাজধানী হয়।

এসব কাজের মাধ্যমে যখন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়বে, সেটিই হবে বাণিজ্যিক রাজধানী।’

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌ-পরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, ‘ডেনমার্কের যে কম্পানি লালদিয়ার টার্মিনালটি নির্মাণ ও পরিচালনা করতে যাচ্ছে, তা আন্তর্জাতিক ও দেশীয় শিপিং খাতে একটি ইতিবাচক বার্তা। যার সুফল জাতি হিসেবে আমরা পাব। কিভাবে আধুনিক টার্মিনাল হ্যান্ডলিং করতে হয়, তা আমরা জানতে পারব।’ তিনি আরো বলেন, ‘প্রতিবছর আট লাখ টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিং করতে সক্ষম হব। সঙ্গে অনেক আধুনিক সুবিধা থাকবে। গ্রিন পোর্ট প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। কনটেইনার ডিপোসহ নানা সুবিধা থাকবে। পিপিপি পদ্ধতিতে ডেনমার্কের সহযোগিতায় আমরা এটি প্রতিষ্ঠা করতে যাচ্ছি। এটা দেশের জন্য সুসংবাদ।’

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ৬১৬ মিটার দীর্ঘ জেটিসমৃদ্ধ লালদিয়া টার্মিনাল চালু হলে একসঙ্গে ছয় হাজার টিইইউএস ধারণক্ষমতার জাহাজ সেখানে ভিড়তে পারবে। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে যে আকারের জাহাজ ভেড়ে, নতুন টার্মিনালে তার প্রায় দ্বিগুণ ধারণক্ষমতার জাহাজ ভেড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।

বাংলাদেশ ও ডেনমার্ক সরকার ২০২১ সালের ৩০ জুন পিপিপি মডেলে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করে। ২০২৩ সালের ২১ মে কর্ণফুলী নদীর ডান তীরে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে প্রায় ৯ কিলোমিটার ভাটিতে লালদিয়ার চরে টার্মিনাল নির্মাণের প্রস্তাব দেয় এপিএম টার্মিনালস। ওই বছরের ২৯ নভেম্বর প্রকল্পটি নীতিগতভাবে অনুমোদন দেয় অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। ২০২৪ সালের ৩ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-ডেনমার্ক পিপিপি যৌথ প্ল্যাটফর্মের প্রথম বৈঠকে প্রকল্পটি উপস্থাপন করা হয়। এরপর ডেনমার্ক সরকারের পক্ষে এপিএম টার্মিনালস প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব নেয়।

কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ তীরে লালদিয়ার চরে টার্মিনাল নির্মাণের জন্য ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে চুক্তি সই করে ডেনমার্কের মেয়ার্স্ক গ্রুপের কম্পানি এপিএম টার্মিনালস। গত ১৬ মার্চ থেকে চুক্তিটি কার্যকর হয়।

টার্মিনালে থাকবে ৬১৬ মিটার দীর্ঘ জেটি। সর্বোচ্চ সাড়ে ১০ মিটার ড্রাফটের জাহাজ এখানে ভেড়ানো যাবে। টার্মিনালে থাকবে সাতটি শিপ-টু-শোর (এসটিএস) গ্যান্ট্রি ক্রেন, ৩২টি বৈদ্যুতিক রবার-টায়ার্ড গ্যান্ট্রি (আরটিজি) ক্রেন এবং ৪১টি ইলেকট্রিক টার্মিনাল ট্রাক্টর। প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ ৪৯.১৫ একর জমির মধ্যে ৩২ একর জায়গায় মূল টার্মিনাল, ৭.১৫ একরে কনটেইনার ইয়ার্ড এবং প্রায় ১০ একর জায়গায় ট্রাক পার্কিং ও প্রি-গেট সুবিধা গড়ে তোলা হবে। ৩৩ বছরের কনসেশন চুক্তিতে নির্মাণের জন্য তিন বছর এবং পরিচালনার জন্য ৩০ বছর সময় রাখা হয়েছে। চুক্তির শর্ত পূরণ সাপেক্ষে আরো ১৫ বছর কনসেশনের মেয়াদ বাড়ানো যেতে পারে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। এই টার্মিনালে ২৪ ঘণ্টা জাহাজ আনা-নেওয়া করা যাবে।

বন্দর কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকল্পটি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক, কর্ণফুলী টানেল ও মেরিন ড্রাইভ সড়কের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ায় দেশের প্রধান শিল্প ও বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ নিশ্চিত করবে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান বলেন, ‘ডেনমার্কে গ্রিন টেকনোলজির কিছু টার্মিনাল দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। এপিএম টার্মিনালস আন্তর্জাতিক মানের বন্দর ব্যবস্থাপনায় অত্যন্ত অভিজ্ঞ। তিন বছরের মধ্যে লালদিয়ায় এর প্রতিফলন দেখা যাবে। বর্তমান সক্ষমতার চেয়ে দ্বিগুণ কনটেইনার ধারণক্ষমতার জাহাজ ভিড়বে লালদিয়া টার্মিনালে।’

বাংলাদেশে নিযুক্ত ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত ক্রিশ্চিয়ান ব্রিক্র মোলার বলেন, ‘লালদিয়া টার্মিনালের মাধ্যমে বাংলাদেশ এই বার্তা দিচ্ছে—বাংলাদেশ বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের জন্য উন্মুক্ত।’