যুক্তরাজ্যে ব্রিটিশ-বাংলাদেশি তরুণদের নীরব বিপ্লব

আশির দশকে চরম দারিদ্র্য, বর্ণবৈষম্য এবং সীমিত শিক্ষার সুযোগের মধ্য দিয়ে যুক্তরাজ্যে ব্রিটিশ-বাংলাদেশিদের যাত্রা শুরু হয়েছিল। তৎকালীন এক সরকারি প্রতিবেদনে যাদের শিক্ষাগত মানকে ‘খুবই নিম্নমানের’ বলে অভিহিত করা হয়েছিল, সেই সম্প্রদায়ের তরুণ প্রজন্মই এখন যুক্তরাজ্যের শিক্ষা ও অর্থনীতিতে এক নীরব বিপ্লব ঘটিয়ে চলেছে। শিক্ষাক্ষেত্রে তারা এখন পেছনে ফেলে দিচ্ছে দেশটির সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠীকেও।

অর্থনৈতিক ও সামাজিক এই অগ্রগতির ধারা শুরু হয় ২০১০-এর দশকের গোড়ার দিকে, যখন ১৬ বছর বয়সী বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা মাধ্যমিক পরীক্ষায় শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশদের সমকক্ষ ফলাফল করতে শুরু করে। সম্প্রতি এই অর্জনের হার আরও বেড়েছে। ২০২১ সালের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশি মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের ৬৭ শতাংশই ১৯ বছর বয়সের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছেন; যেখানে শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশদের ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ৩৮ শতাংশ।

কেবল শিক্ষায় অংশ দেওয়াই নয়, কর্মমুখী ও প্রতিযোগিতামূলক বিষয়গুলোতে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো বেড়েছে। গত এক দশকে প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিভাগে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে এবং চিকিৎসাবিজ্ঞান ও দন্তচিকিৎসায় এ হার বেড়েছে প্রায় তিনগুণ। এ শিক্ষাগত যোগ্যতা প্রভাব ফেলছে কর্মক্ষেত্রেও। সর্বশেষ আদমশুমারি অনুযায়ী, ২৫ থেকে ৩৪ বছর বয়সী যুক্তরাজ্যে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশিদের ১৪ শতাংশ এখন পেশাদার বা ব্যবস্থাপক পদে নিয়োজিত আছেন—যা শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশদের হারের প্রায় সমান। একইসঙ্গে ২০১০-১১ সালের পর থেকে দেশটির বিদ্যালয়গুলোতে বাংলাদেশি শিক্ষকের সংখ্যা প্রায় তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

কাজের ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন এসেছে বাংলাদেশি নারীদের ভূমিকা ঘিরে। প্রথাগতভাবে এই সম্প্রদায়ের নারীদের একটি বড় অংশ অর্থনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় থাকায় বহু পরিবার দারিদ্র্যের মধ্যে দিন কাটিয়েছে। কিন্তু যুক্তরাজ্যে জন্ম নেওয়া নতুন প্রজন্মের নারীদের ক্ষেত্রে দৃশ্যপট দ্রুত পাল্টাচ্ছে। ২০২১ সালের পরিসংখ্যান মতে, ২৫ থেকে ৩৪ বছর বয়সী যুক্তরাজ্যে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশি নারীদের ৬৮ শতাংশই এখন কর্মজীবী। সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, উচ্চশিক্ষা এখন বিয়ের বাজারেও উচ্চশিক্ষিত নারী ও পুরুষদের চাহিদা বহুলাংশে বাড়িয়ে দিয়েছে।

অবশ্য চ্যালেঞ্জ এখনো সম্পূর্ণ কেটে যায়নি। আবাসন ব্যয় বাদ দিলে এখনো বাংলাদেশি প্রতি দুজন মানুষের একজন জাতীয় নিম্ন আয়ের (সর্বনিম্ন ২০ শতাংশ) তালিকার অন্তর্ভুক্ত। অধিকাংশ পরিবার এখনো পূর্ব লন্ডনে বসবাস করে এবং তাদের গড় সম্পদের পরিমাণ দেশটির অন্যান্য জনগোষ্ঠীর তুলনায় কম। তবে নতুন ও পুরোনো অভিবাসীদের মিশ্র উপাত্তের কারণে বাংলাদেশি সমাজের এই অগ্রগামী রূপান্তরটি অনেক সময় নজর এড়িয়ে যায়। তা সত্ত্বেও, লন্ডনকেন্দ্রিক গতিশীল সামাজিক পরিবেশে নতুন প্রজন্মের ওপর ভর করে এগিয়ে যাচ্ছে ব্রিটিশ-বাংলাদেশি সম্প্রদায়।