নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানার একটি মাদক মামলায় নীলফামারীতে গ্রেপ্তার হয়ে সেখানকার কারাগারে বন্দি ছিলেন মো. সাইদুল ইসলাম। ১০ আগস্ট তিনি নারায়ণগঞ্জের ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে জামিন পান। আর ১২ আগস্ট সকালেই নীলফামারীর কারাগার থেকে মুক্তি পান।
সম্প্রতি চালু হওয়া অনলাইনে জামিননামা দাখিল বা ‘ই-বেইলবন্ড’ সুবিধার কারণে আরেক জেলার কারাগার থেকে তার এত দ্রুত মুক্তি পাওয়া সম্ভব হয়েছে বলে জানিয়েছেন তার আইনজীবী আদনান মোল্লা।
তিনি বলেন, “ঠিক এমন পরিস্থিতিতে পুরোনো পদ্ধতিতে আরেক জেলায় জামিননামার কাগজ পৌঁছাতে এবং কারাগার থেকে বের হতে পাঁচ থেকে সাত দিন সময় লেগে যেত।”
এ আইনজীবী জানান, জামিন পাওয়ার দিন দুপুর সাড়ে ১২টায় সাইদুলের জামিননামা অনলাইনে দাখিল করা হয়। তিন ঘণ্টার মধ্যে জামিননামার কাগজ নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগারের সার্ভারে চলে যায়। সেখান থেকে তথ্য পাঠানো হয় নীলফামারী জেলা কারাগারে। তার পরদিনই কারাগার থেকে মুক্তি পান সাইদুল।
বিচার বিভাগের কার্যক্রমে গতি আনা এবং বিচারপ্রার্থীদের হয়রানি ও দুর্ভোগ কমাতে এই ই-বেইলবন্ড সেবা চালু করেছে সরকার। গত বছরের ১৬ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জ জেলায় প্রথম এ কার্যক্রম শুরু করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। পরে গত ১৩ আগস্ট থেকে আরও বারোটি জেলায় এ কার্যক্রম চালু করে বিএনপি সরকার।
বিচারপ্রার্থী ও আইনজীবীরা বলছেন, অনলাইনে জামিননামা দাখিলের এ কার্যক্রম চালু হওয়ায় সময়ের অপচয় ও হয়রানি কমেছে। একইসঙ্গে কারামুক্তির তথ্য পাওয়া যাচ্ছে মোবাইল ফোনের খুদে বার্তার মাধ্যমে।
কর্মকর্তারা বলছেন, আদালত থেকে কারাগারে কাগজ পৌঁছানো এবং তারপর আসামিকে মুক্তি দেওয়ার আমলাতান্ত্রিক কাজগুলো যাতে দ্রুত হয়, সেজন্য আগে ঘুষ বা টাকা-পয়সার লেনদেন হতো। ই-বেইলবন্ডে তা বন্ধ হয়েছে।
জেলা ও দায়রা জজ আদালতের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোসাম্মৎ মাহমুদা খাতুন বলেন, “আগে হাতে হাতে কাগজটা কোর্টের স্টাফরা নিয়ে যেতে হত কারাগারে। অনলাইনে কাজ হওয়ায় এখন সময় ও শ্রম দুটোই কম লাগছে। বিচারপ্রার্থীদের হয়রানিও কমেছে।”
তবে কখনো কখনো সার্ভারে প্রবেশে সমস্যা, সময়মতো এককালীন গোপন নম্বর না আসার মতো কিছু অসুবিধার কথাও বলেছেন কেউ কেউ।
আবার প্রযুক্তি সম্পর্কে অভিজ্ঞ নন এমন প্রবীণ আইনজীবীরা অনলাইনে জামিননামা দাখিলে জটিলতা পোহাচ্ছেন বলে জানালেন নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সরকার হুমায়ূন কবির।
তিনি বলেন, “সব আইনজীবী মোবাইলে বা ইন্টারনেটের কাজে পরদর্শী না। তাছাড়া, প্রথমে বিচারক বেইলবন্ড মেলান, তারপর পাঠান জেলে। মাঝপথে ভুল-ত্রুটি হলে পুনরায় একই কার্যক্রম করতে জটিলতা পোহাতে হয়। যারা এইসব কম বোঝেন তারা কম্পিউটারের দোকানে গিয়ে ফরম পূরণ করেন, তাতে অতিরিক্ত টাকা গুনতে হয়।”
সরকার হুমায়ূনের সঙ্গে শিক্ষানবীশ হিসেবে কাজ করেন আইন বিষয়ে পাস করা রুবেল মিয়া। তথ্যগত জটিলতার কারণে তিন মাস আগে এক আসামির কারামুক্তিতে দুইদিন অতিরিক্ত সময়ক্ষেপণের কথা জানালেন তিনি।
রুবেল বলেন, “বৃহস্পতিবার ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে জামিন পাওয়া এক ব্যক্তির এজাহারে নাম ও জাতীয় পরিচয়পত্রের নামে গড়মিল থাকায় তা আবার ফেরত আসে। কিন্তু তথ্য আসতে বিকাল হয়ে যাওয়ায় নতুন করে তথ্য দেওয়ার পরও আসামি বের হতে রোববার হয়ে যায়।”
অ্যাডভোকেট আদনান মোল্লা, যিনি ই-বেইলবন্ড কার্যক্রম শুরুর আগে প্রশিক্ষণও নিয়েছিলেন, তিনি বলেন, “লিংকের মাধ্যমে ওয়েবসাইটে ঢুকতে অনেক সময় ঝামেলা করে। তাছাড়া, সবসময় এককালীন গোপন নম্বরের বার্তাও আসে না। বারবার চেষ্টা করতে হয়।”
কিছু সমস্যা থাকলেও অনলাইনে এ কার্যক্রম আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীর হয়রানি লাঘব করেছে মন্তব্য করে আরেক আইনজীবী অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “পদ্ধতিগতভাবে এই কার্যক্রম আরো সহজ ও প্রযুক্তিগত ত্রুটি দূর করা উচিত।”
নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগারের সুপার আব্দুল কুদ্দুছ বলেন, “বিচার বিভাগে এটা একটা ওয়ান্ডারফুল কাজ হয়েছে। অনেকের পেরেশানি কমে গেছে। সবচেয়ে বড় বিষয়, জামিন পাওয়া ও কারাগার থেকে মুক্তির মাঝপথে যে ম্যালপ্র্যাকটিসটা হত, সেটি একেবারেই বন্ধ হয়ে গেছে।”




