জ্বালানির দাম বাড়ার পর নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের বাজারে নতুন করে মূল্যবৃদ্ধির চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কায় বাজার নজরদারি জোরদার করেছে সরকার। গবাদিপশুর খাদ্য, সয়াবিন মিল, ভুট্টা, গম, গমের ভুসি, শস্যভিত্তিক পশুখাদ্য ও তরল দুধের দাম বাড়ার পেছনে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রকৃত প্রভাব কতটা, তা খতিয়ে দেখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এজন্য বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন (বিটিটিসি), বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন (বিসিসি) এবং জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনা ও পণ্যের দাম পর্যবেক্ষণের নির্দেশ দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।
আগামী সপ্তাহের মধ্যে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো তাদের পর্যালোচনা প্রতিবেদন জমা দেবে। গত ২১ সেপ্টেম্বর সব ধরনের জ্বালানি তেলের খুচরা দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানোর পর নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি হচ্ছে কি না, তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বাণিজ্য সচিব মো. আতাউর রহমান খান বলেন, জ্বালানির দাম বাড়ার পর নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বিটিটিসির দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকানো হবে।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির পর ডিম উৎপাদনকারীদের অবস্থান জানতে আজ (রবিবার) তাঁদের সঙ্গে বৈঠক করা হয়। শুধু বাজারের খুচরা দাম নয়, উৎপাদন পর্যায় থেকে ভোক্তার হাতে পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো মূল্যশৃঙ্খল খতিয়ে দেখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিটিটিসির একটি দল ইতোমধ্যে বাঘাবাড়ী ও অন্যান্য দুধ উৎপাদন এলাকায় গিয়ে কৃষকদের উৎপাদন ব্যয়ের তথ্য সংগ্রহ করেছে। বিটিটিসির এক কর্মকর্তা বলেন, কৃষকেরা কী দামে দুধ বিক্রি করছেন এবং ভোক্তা পর্যায়ে প্রকৃত দাম কত- তা জানতে বাস্তব তথ্যের ভিত্তিতে বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
অর্থাৎ জ্বালানির দাম বাড়ার কারণে উৎপাদন, পরিবহন ও বিতরণ ব্যয় বাস্তবে কতটা বেড়েছে এবং সেই অনুপাতে পণ্যের দাম বাড়ানোর যৌক্তিকতা রয়েছে কি না, তা তথ্যের ভিত্তিতে যাচাই করা হবে। বিশেষ করে দুগ্ধ খাতে নজরদারি বাড়াতে বলা হয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে দুগ্ধ কোম্পানিগুলোর কাঁচা দুধ সংগ্রহ, দুধের চর্বি পৃথক করার হিসাব এবং প্যাকেটজাত দুধ বিক্রির বিষয়ে বিশেষ নিরীক্ষার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যৌক্তিক কারণ ছাড়া করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে তরল দুধসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম হঠাৎ বাড়াতে না পারে, সে বিষয়েও সতর্ক করা হয়েছে।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব শুধু সরাসরি জ্বালানি ব্যবহারের খরচে সীমাবদ্ধ নয়। পরিবহন, সেচ, উৎপাদন ও পণ্য বিতরণের ব্যয় বাড়ার মধ্য দিয়ে এর প্রভাব নিত্যপণ্যের বাজারেও পড়তে পারে। ফলে মূল্যস্ফীতি কমানোর চলমান প্রক্রিয়ায় নতুন চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে দেশের পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি সামান্য কমে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। জুলাইয়ে এ হার ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। একই সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতিও জুলাইয়ের ৭ দশমিক ১৬ শতাংশ থেকে কমে আগস্টে ৭ দশমিক ০২ শতাংশ হয়েছে।
বাজারে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি চিহ্নিত করতে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. নাজনীন আহমেদ। তিনি বলেন, এ ধরনের বাজার পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনার উদ্যোগ সমন্বিতভাবে বছরে অন্তত তিনবার চালানো উচিত।
সরবরাহব্যবস্থার অদক্ষতার কারণে বাজার পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যহীনভাবে কোনো পণ্যের দাম বাড়ানো হচ্ছে কি না, তা বিটিটিসি, বিসিসি, টিসিবি, বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউট এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সমন্বিত উদ্যোগে চিহ্নিত করা প্রয়োজন।
নাজনীন আহমেদ বলেন, জ্বালানির দাম বাড়ায় মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন করে ঊর্ধ্বমুখী চাপ তৈরি হবে। তবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগের লক্ষ্য শুধু মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ নয়, অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকানোও।
বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে বৈঠকের নির্দেশ দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। তবে বৈঠকের আগে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করতে বলা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে কঠোর ও সমন্বিত বাজার তদারকি জোরদার করতে হবে।
এর মাধ্যমে জ্বালানির বাড়তি ব্যয়ের প্রকৃত প্রভাব এবং সেই সুযোগে কোনো পণ্যের অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি হচ্ছে কি না- দুই দিকই যাচাই করা হবে।





