কাপ্তাই হ্রদের জলে ঝলমলে অর্থনীতি

সম্ভাবনায় অনন্যা রাঙামাটি কাপ্তাই হ্রদ। কর্মসংস্থান, জীবন ও জীবিকা আর নতুন নতুন সম্ভাবনা এ জেলাকে করেছে আরও সমৃদ্ধ। প্রাকৃতিকভাবে যেমন রূপ বৈচিত্র্যের কমতি নেই। তেমনি অর্থনৈতিকভাবেও পিছিয়ে নেই। বিশেষ করে সম্ভাবনার দোয়ার খুলেছে বিদ্যুৎ, মৎস্য, কৃষি, যোগাযোগ, ও পর্যটন খাতে। বছরের কোটি কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয় শুধু রাঙামাটির একটি মাত্র কাপ্তাই হ্রদ থেকে। তাই তো রাঙামাটিবাসীর বাঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন এটি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম কৃত্রিম জলরাশি কাপ্তাই হ্রদ। যার আয়তন ৭২৫ বর্গকিলোমিটার। ১৯৫৯ সালে পানি বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে রাঙামাটির কাপ্তাইয়ে খড়স্রোতা কর্ণফুলী নদীর ওপর বাঁধ দেওয়ায় বিশাল এই হ্রদের সৃষ্টি।

বাংলাদেশে একমাত্র জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রে হিসেবে পরিচিত রাঙামাটির কাপ্তাই কর্ণফুলী জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রে। জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ৫টি ইউনিটের মাধ্যমে প্রায় ২৩০ থেকে আর ২৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। যা যুক্ত হয় জাতীয় গ্রিডে। এতে করে দেশে বিদ্যুৎ ঘাটতি পূরণে ভূমিকা রাখছে জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি। শুধু তাই নয়, এই বাঁধের পাশে ১৬টি জলকপাট সংযুক্ত ৭৪৫ ফুট দীর্ঘ একটি পানি নির্গমন পথ বা স্প্রিলওয়ে রয়েছে। এই স্প্রিলওয়ে প্রতি সেকেন্ডে ৫ লাখ ২৫ হাজার কিউসেক ফিট পানি নির্গমন করতে পারে। এতে করে রাঙামাটি কাপ্তাই হ্রদের পানিরস্তর ভারসাম্য ঠিক থাকে। যার কারণে কাপ্তাই এখনো চির সবুজ এবং যৌবনে ভরপুর।

জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি আরও ছয়টি সম্ভাবনার বাড়তি সুফল হিসেবে এর কাজে আসে। এগুলো হলো- বনজ সম্পদ আহরণ, মৎস্য চাষ ও আহরণ, দুর্গম এলাকায় নৌচলাচলের সুযোগ, বৃহত্তর চট্টগ্রামের নিম্নাঞ্চলের বন্যা নিয়ন্ত্রণ, কৃষি ও সেচ ব্যবস্থার সুযোগ সৃষ্টি এবং পর্যটন শিল্পের বিকাশ সাধন।

দেশের একমাত্র মিঠা পানির মাছের ভান্ডার হিসেবে পরিচিত রাঙামাটি কাপ্তাই হ্রদ। ৭২৫ বর্গ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে রয়েছে মাছের অভয়ারণ্য। রাঙামাটি কাপ্তাই হ্রদে ৭৩টি দেশি প্রজাতির ও ছয়টি বহিরাগত প্রজাতির মাছ পাওয়া যায়।

সুস্বাদু রুই, কাতলা, মৃগেল থেকে শুরু করে দেশজুড়ে তুমুল জনপ্রিয় ‘রাঙামাটির কাচকি মাছ’ আর বিখ্যাত চাপিলা। প্রতিবছর হাজার হাজার টন মাছ উৎপাদিত হয় এ কাপ্তাই হ্রদে। কাপ্তাই হ্রদের আহরিত মাছ দেশের চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানি করা হচ্ছে বিদেশেও। রাঙামাটির প্রায় ২৬ হাজার ৮৪৫ জন জেলে পরিবার ১৫৩ জন মৎস্যজীবী এ হ্রদের ওপর নির্ভরশীল।

কৃষিতে বিপ্লব ঘটিয়েছে রাঙামাটি কাপ্তাই হ্রদ। কাপ্তাই হ্রদের জলে ভাসা জমিতে চাষাবাদ করে বছরে কোটি কোটি টাকা আয় করে কৃষকরা। পানির ব্যবস্থা থাকায় মৌসুমি সবজি। বিশেষ করে শীতকালীন সবজি। ধান, তরমুজ চাষাবাদে উল্লেখযোগ্য কাপ্তাই হ্রদ।

কাপ্তাই হ্রদ। হ্রদকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে পার্বত্য অঞ্চলের সবচেয়ে লাভজনক পর্যটন শিল্প। কাপ্তাই হ্রদের আশপাশে ঘিরে গড়ে উঠেছে অসংখ্য পর্যটক কেন্দ্র। ঝরনা আর ঝুলন্ত সেতু পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। যা থেকে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার রাজস্ব আয় করে পর্যটন করপোরেশন। একই সঙ্গে গড়ে উঠেছে অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পর্যটন ব্যবসায় আর শিল্প বাণিজ্য। শুধু তাই নয়, হ্রদের বুকে ভাসমান শত শত ইঞ্জিনচালিত বোট, ট্রলার আর স্পিডবোটের চালক ও মালিকদের সংসার এখন বেশ সচ্ছল। প্রতিদিন শত শত পর্যটককে ঝুলন্ত সেতু, পলওয়েল পার্ক কিংবা সুবলং ঝরনায় নিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে সচল থাকে এই নৌ-বাণিজ্য। হ্রদের কোলঘেঁষে গড়ে উঠেছে বিশ্বমানের ইকো-রিসোর্ট, আধুনিক হোটেল ও কটেজ। স্থানীয় যুবকদের অনেকেই এখন ট্যুর গাইড, রিসোর্ট ম্যানেজার

কিংবা ফ্রিল্যান্স ফটোগ্রাফার হিসেবে নিজেদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করেছেন।