প্রযুক্তি জায়ান্ট অ্যাপল সর্বশেষ প্রান্তিকের আর্থিক ফলাফলে বিশ্লেষকদের পূর্বাভাস ছাড়িয়ে গেছে। আইফোন বিক্রি ও বিভিন্ন সেবা থেকে আয় বাড়ায় চলতি বছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে কোম্পানিটি রেকর্ড পরিমাণ রাজস্ব আয় করেছে।
তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির উন্নয়ন ও সংশ্লিষ্ট খাতে ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় আগামী প্রান্তিকে কোম্পানিটির মুনাফার হার কমতে পারে।
খবর বার্তা সংস্থা এএফপি’র।
সোমবার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে অ্যাপলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) জন টার্নাস বলেন, ‘আমরা এখন পর্যন্ত আমাদের সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী পণ্যসম্ভার নিয়ে বছর শেষ করতে যাচ্ছি।’ গত সেপ্টেম্বরে টিম কুকের কাছ থেকে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই তার নেতৃত্বে কোম্পানির গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক প্রতিবেদন।
সোমবার বিকেলে বিশ্লেষকদের সঙ্গে এক আলোচনায় টার্নাস ছুটির মৌসুমে কোম্পানির নতুন পণ্যগুলোর বিক্রি নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে ভাঁজ করা যায় এমন নতুন স্মার্টফোন ‘ডুও’।
তবে অ্যাপলের প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা (সিএফও) কেভান পারেখ সতর্ক করে বলেছেন, বছরের শেষ প্রান্তিকে কোম্পানিটির মোট মুনাফার হার (গ্রস মার্জিন) সেপ্টেম্বর প্রান্তিকের তুলনায় কিছুটা কমতে পারে। সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে এ হার ছিল ৪৭ দশমিক ৯ শতাংশ।
পারেখ বলেন, ‘আমরা আশা করছি, মোট মুনাফার হার ৪৫ থেকে ৪৬ শতাংশের মধ্যে থাকবে। এর প্রধান কারণ মেমোরি চিপের দাম বৃদ্ধি এবং সিরি এআই প্রযুক্তির সম্প্রসারণে সংশ্লিষ্ট কিছু অতিরিক্ত ব্যয়।’
গত জুনে গুগলের সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে অ্যাপল তাদের ডিজিটাল সহকারী সিরিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনে। নতুন সিরি এআইয়ের সক্ষমতা বাড়াতে গুগলের জেমিনি মডেল ব্যবহার করা হয়েছে।
এআই খাতে বাড়তি ব্যয়ের কারণে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে তৈরি হওয়া উদ্বেগ কমানোর চেষ্টা করেছে অ্যাপল। পারেখ বলেন, ‘আমরা মনে করি, এআই গ্রাহকদের নতুন প্রযুক্তির সুবিধা পেতে নতুন ডিভাইস কেনা বা পুরোনো ডিভাইস পরিবর্তনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেরণা তৈরি করবে। পাশাপাশি তৃতীয় পক্ষের অ্যাপ, অংশীদারত্ব এবং অ্যাপলের নিজস্ব পণ্য ও সেবার ক্ষেত্রেও এআইয়ের নতুন ব্যবসায়িক সুযোগ রয়েছে।’
গত সেপ্টেম্বরে অ্যাপল তিনটি নতুন স্মার্টফোন বাজারে আনে। এগুলো হলো আইফোন ১৮ প্রো, আইফোন ১৮ প্রো ম্যাক্স এবং কোম্পানিটির প্রথম ভাঁজযোগ্য ফোন ‘ডুও’। একই সময়ে দুটি নতুন ডেস্কটপ কম্পিউটারও উন্মোচন করে প্রতিষ্ঠানটি।
অক্টোবরে সিরি এআই-চালিত নতুন স্মার্ট ডিসপ্লে ‘হোমভিউ’ এবং প্রথমবারের মতো টাচস্ক্রিন সুবিধাসম্পন্ন ম্যাকবুক প্রো উন্মোচন করে অ্যাপল।
এ ছাড়া গত জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রাহকদের জন্য ‘অ্যাপল আপগ্রেড’ নামে একটি কিস্তিভিত্তিক ডিভাইস কেনার কর্মসূচি চালু করে প্রতিষ্ঠানটি। এর আওতায় গ্রাহকেরা আইফোনসহ অন্যান্য অ্যাপল ডিভাইস মাসিক কিস্তিতে ব্যবহারের জন্য নিতে পারবেন।
চিপ সংকট ও এআই খাতে ব্যয়ের হিসাব
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে থাকার অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে রয়েছে অ্যাপলের বিরুদ্ধে। তবে এআই খাতে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর বিপুল বিনিয়োগের কারণে পরোক্ষভাবে লাভবান হওয়ার সুযোগ রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। কারণ, নিজস্ব বিনিয়োগ তুলনামূলক কম রেখেও অন্য কোম্পানিগুলোর তৈরি অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সুফল নিতে পারে অ্যাপল।
বিশ্লেষকদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বরে শেষ হওয়া ১২ মাসে অ্যাপলের মূলধনি ব্যয় প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলার হতে পারে। সেপ্টেম্বরেই কোম্পানিটির অর্থবছর শেষ হয়।
অন্যদিকে মাইক্রোসফট, অ্যালফাবেট, অ্যামাজন ও মেটা চলতি বছরে সম্মিলিতভাবে ৭০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূলধনি বিনিয়োগের পথে রয়েছে। বিশ্লেষকদের হিসাব অনুযায়ী, এ অর্থের বড় অংশই ব্যয় হবে এআই অবকাঠামো, বিশেষ করে ডেটা সেন্টার নির্মাণ ও সম্প্রসারণে। বিনিয়োগের এই পরিমাণ আর্জেন্টিনা বা বেলজিয়ামের মতো একটি দেশের পুরো অর্থনীতির আকারের কাছাকাছি।
গত জুলাইয়ে মেটা জানায়, ২০২৬ সালে তাদের ব্যয় ১৪৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে, যা আগের বছরের ব্যয়ের প্রায় দ্বিগুণ।
গত সপ্তাহে অ্যামাজন জানায়, চলতি বছরে তাদের বিনিয়োগ ব্যয় ২২০ বিলিয়ন ডলার হতে পারে। একই সময়ে মাইক্রোসফট জানায়, বছরের শেষ নাগাদ তাদের বিনিয়োগ ব্যয় ১৭০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
অন্যদিকে অ্যালফাবেট ২০২৬ সালে ১৯৫ থেকে ২০৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের পূর্বাভাস দিয়েছে।
এদিকে এআই খাতে ঘনিষ্ঠ অংশীদারদের একজনের সঙ্গেই আইনি বিরোধে জড়িয়েছে অ্যাপল।
গত জুলাইয়ে ওপেনএআইয়ের বিরুদ্ধে মামলা করে অ্যাপল। আইফোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটির অভিযোগ, নিজস্ব ভোক্তাপণ্য তৈরির উদ্যোগের অংশ হিসেবে ওপেনএআই তাদের বাণিজ্যিক গোপন তথ্য চুরির জন্য পরিকল্পিত প্রচারণা চালিয়েছে।
ওপেনএআইয়ের জনপ্রিয় এআই সেবা চ্যাটজিপিটি ২০২৪ সাল থেকে অ্যাপলের বিভিন্ন পণ্যে যুক্ত রয়েছে।





