গার্মেন্টস শ্রমিকদের চলমান আন্দোলনকে পুঁজি করে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলগুলোতে আবারও চেনা ছকের নাশকতা, অগ্নিসংযোগ এবং পরিকল্পিত অরাজকতা দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। সাধারণ আন্দোলন ও ন্যায্য দাবির আড়ালে রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিমালিকানাধীন সম্পত্তিতে আগুন দেওয়া, কারখানায় ভাঙচুর, যানবাহনে হামলা এবং জনজীবনে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেওয়ার এই প্রবণতা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। শ্রমিকদের প্রকৃত ক্ষোভ ও দাবি-দাওয়ার সঙ্গে এসব সহিংস কর্মকাণ্ডের সম্পর্ক কতটুকু, আর এর পেছনে সক্রিয় কোনো স্বার্থান্বেষী চক্র রয়েছে কি না, তা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন।
গতকাল মঙ্গলবারও মিরপুর, গাজীপুর-আশুলিয়া ও নারায়ণগঞ্জের কিছু এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করেছে। অনেক এলাকায় পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। আগের রাতে নারায়ণগঞ্জের একটি গ্যারেজে রাখা বাসে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে।
রাজনীতি বিশ্লেষকরা মনে করছেন, গার্মেন্টস শ্রমিকদের এই আন্দোলনে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের মতো ফন্দি এঁটে একটি অসৎ রাজনৈতিক চক্র নেপথ্যে কলকাঠি নাড়ছে। ভাড়াটে লোকজন এনে শ্রমিকদের সঙ্গে মাঠে নামিয়ে সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্যই তারা এই অপচেষ্টা চালাচ্ছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ তৈরি পোশাকশিল্পের এই অস্থিতিশীলতাকে একটি গভীর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি অভিযোগ করেছেন, পতিত স্বৈরাচারী ও পরাজিত ফ্যাসিবাদের সমর্থক কিছু পক্ষ নিরীহ গার্মেন্টস শ্রমিকদের ব্যবহার করে এই অস্থিরতা সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে। রাজনৈতিক হীনস্বার্থ চরিতার্থ করতে এই আন্দোলনকে উসকে দেওয়া হচ্ছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেন, তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে, শ্রমিকদের ক্ষোভকে পুঁজি করে সীমান্তের ওপার থেকেও ইন্ধন জোগানো হচ্ছে, যাতে বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্য ও উৎপাদন ব্যাহত হয়। আন্দোলনের নামে পুলিশের গাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া, কারখানায় আগুন দেওয়া এবং মুখোশধারী অনুপ্রবেশকারীদের ভাঙচুর করার ঘটনাকে তিনি উগ্র সহিংসতা বলে আখ্যা দেন।
সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি নাজমা আক্তারসহ একাধিক শ্রমিক নেতা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, সাধারণ শ্রমিকদের যৌক্তিক মজুরির আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে একটি তৃতীয় পক্ষ বা বহিরাগত গোষ্ঠী এতে প্রবেশ করেছে। তারা কারখানায় ঢুকে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটাচ্ছে, যা সাধারণ শ্রমিকদের স্বার্থপরিপন্থি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, গার্মেন্টস শ্রমিকদের বেতন-ভাতা, কর্মপরিবেশ, চাকরির নিরাপত্তা ও অন্যান্য ন্যায্য দাবি নিয়ে আন্দোলন নতুন কিছু নয়। দেশের শিল্প অর্থনীতির বিকাশে শ্রমিকদের অবদান যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনও গণতান্ত্রিক ও শ্রমিক অধিকার চর্চার স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু সেই আন্দোলনের সুযোগে যখন কারখানা, যানবাহন, সরকারি স্থাপনা কিংবা সাধারণ মানুষের সম্পদে হামলা হয়, তখন তা আর শ্রমিক অধিকারের আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। শ্রমিকদের প্রকৃত দাবি ও অসন্তোষকে ব্যবহার করে একটি মহল নিজেদের স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করতে পারে। আন্দোলনে বহিরাগতদের অনুপ্রবেশ, উসকানি, সংঘবদ্ধভাবে সহিংসতা ছড়ানো এবং অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনা ঘটিয়ে শিল্পাঞ্চলে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
এইচ কে গার্মেন্টসের মালিক হুমায়ুন কবীর বলেন, শ্রমিক আন্দোলন এবং পরিকল্পিত নাশকতা এক বিষয় নয়। শ্রমিকরা তাদের দাবি আদায়ের জন্য বিক্ষোভ, কর্মবিরতি কিংবা অবস্থান কর্মসূচি পালন করতে পারেন। কিন্তু আন্দোলনের নামে কারখানায় আগুন দেওয়া, অন্যের সম্পদ ধ্বংস করা কিংবা সাধারণ মানুষের চলাচল বন্ধ করে দেওয়ার কোনো বৈধতা নেই। এখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, যারা শ্রমিকদের প্রকৃত দাবির প্রতিনিধিত্ব করছেন, তাদের সঙ্গে সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের সম্পর্ক কী? কারা আন্দোলনের কর্মসূচি নির্ধারণ করছেন? কারা শ্রমিকদের মাঠে নামাচ্ছেন? আর কারা আন্দোলনের পরিস্থিতি ব্যবহার করে সহিংসতা উসকে দিচ্ছেন? চারপাশে যা ঘটছে, প্রতিটি ঘটনার পেছনের সংগঠক, অর্থের উৎস, যোগাযোগের ধরন এবং সহিংসতায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের পরিচয় অনুসন্ধান করা জরুরি। এটা করতে পারলেই বের হয়ে আসবে নেপথ্য থেকে ঘুঁটি নাড়ছেন কে বা কারা?
বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাকশিল্প। এই খাতের উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রমের সঙ্গে লাখ লাখ শ্রমিকের জীবন-জীবিকা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত। শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে তার প্রভাব শুধু মালিক পক্ষের ওপর পড়ে না; কর্মসংস্থান, শ্রমিকদের আয়, রপ্তানি আদেশ, বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। একটি কারখানায় আগুন লাগলে বা উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেলে সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েন সাধারণ শ্রমিকরা। তাদের দৈনিক আয় বন্ধ হয়, চাকরি হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়। অন্যদিকে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে দেশের শিল্পাঞ্চলের নিরাপত্তা ও উৎপাদন সক্ষমতা নিয়ে নেতিবাচক বার্তা যায়। এ কারণে শিল্পাঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি আরও বলেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, শ্রমিক আন্দোলনের আড়ালে সংঘটিত সহিংসতার প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত। কোনো ঘটনার সঙ্গে রাজনৈতিক বা অন্য কোনো স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতা থাকলে সেটিও আড়াল করার সুযোগ নেই। তদন্তে দেখতে হবে, সহিংসতায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা সংশ্লিষ্ট কারখানার শ্রমিক কি না, তাদের সঙ্গে কোনো বহিরাগত গোষ্ঠীর যোগাযোগ রয়েছে কি না, একই ব্যক্তিরা একাধিক ঘটনায় অংশ নিয়েছেন কি না এবং অগ্নিসংযোগ বা ভাঙচুরের পেছনে পূর্বপরিকল্পনা ছিল কি না। একই সঙ্গে শিল্পাঞ্চলে দায়িত্ব পালনকারী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা, গোয়েন্দা নজরদারি এবং ঘটনার আগে কোনো সতর্কবার্তা ছিল কি না, সেসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
সাবেক শ্রমিক নেতা রুহুল আমিন বলেন, শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি উপেক্ষা করে শিল্পাঞ্চলে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। আবার আন্দোলনের নামে নাশকতা ও অগ্নিসংযোগের সুযোগ দিয়ে শিল্প অর্থনীতিকেও নিরাপদ রাখা যাবে না। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। একই সঙ্গে শ্রমিক নেতাদেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। কোনো পক্ষ যেন শ্রমিকদের ক্ষোভকে নিজেদের রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করতে না পারে, সে বিষয়ে তাদের সতর্ক থাকতে হবে। একই সঙ্গে মালিক পক্ষকে শ্রমিকদের দাবি ও অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে, শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা এবং একই সঙ্গে নাশকতা, অগ্নিসংযোগ ও সম্পদ ধ্বংসের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা।
রুহুল আমিন আরও বলেন, শিল্পাঞ্চলে আগুন জ্বললে তার উত্তাপ শুধু কারখানার দেয়ালে সীমাবদ্ধ থাকে না। সেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে শ্রমিকের সংসারে, দেশের অর্থনীতিতে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিতে। তাই শ্রমিক আন্দোলনের অধিকার রক্ষা এবং আন্দোলনের আড়ালে নাশকতার ছক ভেঙে দেওয়ার বিষয়টিকে আলাদা করে দেখতে হবে।
ডিবির উপ-পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ রাকিব খান জানান, পোশাক শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির আন্দোলনের আড়ালে সাধারণ শ্রমিকদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে একশ্রেণির রাজনৈতিক চক্র অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির অপচেষ্টা চালাচ্ছে। আটক নেতাকর্মীদের মধ্যে বরিশাল, পটুয়াখালী, কক্সবাজার ও গাইবান্ধাসহ বিভিন্ন জেলার তৃণমূল পর্যায়ের নেতারা রয়েছেন। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, ঢাকার পল্লবী ও রূপনগর (ঢাকা-১৬ আসন) এলাকার পলাতক সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহর ভাগ্নে আলিফ মোল্লাহ এই নাশকতার মূল ‘সমন্বয়ক’ হিসেবে কাজ করছেন। আলিফই বিভিন্ন জেলা থেকে দলীয় কর্মীদের ঢাকায় সংগঠিত করে মিরপুরে এনেছেন। রোববারের সহিংসতায় শতাধিক রাজনৈতিক নেতাকর্মী সাধারণ শ্রমিকদের সঙ্গে মিশে উপস্থিত ছিলেন। তাদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
পুলিশ সূত্র মতে, আন্দোলন ঘিরে নতুন করে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাধিক ছাত্রলীগ নেতার পোস্টও সামনে এসেছে। এগুলোও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক সাবেক মেজর জেনারেল নজরুল ইসলাম বলেন, দেশের প্রধান শিল্পাঞ্চল ও উৎপাদনমুখী খাতগুলোতে সাম্প্রতিক অস্থিরতা এবং এর অন্তরালে লুকিয়ে থাকা গভীর ষড়যন্ত্র এখন জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। এই নাশকতার পেছনে মূলত অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক একাধিক স্বার্থান্বেষী মহলের যৌথ ইন্ধন কাজ করছে। উৎপাদন খাতকে পঙ্গু করে দেওয়া, বৈদেশিক বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলা এবং একটি নির্বাচিত বা স্থিতিশীল সরকারকে বেকায়দায় ফেলতেই এই অপতৎপরতা।
তিনি আরও বলেন, এই পরিস্থিতিতে শুধু সাধারণ পুলিশি টহল বাড়িয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করার পাশাপাশি শিল্পাঞ্চলগুলোতে বহিরাগতদের প্রবেশ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে কলকারখানাগুলোর নিজস্ব নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও জোরদার এবং প্রকৃত শ্রমিকদের তালিকা যাচাই করে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার বিকল্প নেই।
শ্রমিক সংগঠনগুলোর নেতাদেরও এ বিষয়ে সজাগ থাকতে হবে, যাতে কোনো অপরাধী চক্র তাদের আন্দোলনের কাঁধে ভর দিয়ে দেশবিরোধী কোনো ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড চালাতে না পারে। সর্বোপরি, এই আগুনসন্ত্রাসীদের মুখোশ উন্মোচন করতে হবে এবং তাদের কঠোর হস্তে আইনের আওতায় আনতে হবে। সাধারণ শ্রমিকের ঘাম ও পরিশ্রমে গড়া উৎপাদন খাতকে যারা নিজেদের রাজনৈতিক বা হীনস্বার্থে জিম্মি করতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স-নীতি গ্রহণ না করলে দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।





