করোনা-পরবর্তী ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারের পাশাপাশি বৈশ্বিক বিমান পরিবহন যখন চাঙ্গা হয়ে উঠছে, তখন চমক দেখাল এয়ার ইন্ডিয়া। ফ্রান্সের বিমান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এয়ারবাস ও মার্কিন কম্পানি বোয়িংয়ের কাছ থেকে একসঙ্গে রেকর্ড ৪৭০টি বিমানের অর্ডার করল তারা। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ভারতের এভিয়েশন খাতের এ যাবৎকালের সবচেয়ে বড় চুক্তি এটি। এই ক্রয়ে এয়ার ইন্ডিয়া শুধু বৈশ্বিক বিমান পরিবহনেই প্রভাবশালী হবে না, নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছেও তাদের কদর বাড়বে।
সিএনএন বিজনেসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বোয়িংয়ের কাছে এয়ার ইন্ডিয়ার অর্ডারের মূল্য হতে পারে ৩৪ বিলিয়ন ডলার, আর এয়ারবাসের মূল্য হতে পারে প্রায় ৩৮ বিলিয়ন ডলার। তবে বড় ক্রয়ের কারণে বোয়িং যদি অর্ধেক ছাড় দেয় তবে এ চুক্তির মূল্য হবে ১৭ বিলিয়ন ডলার। এয়ারবাস ও এয়ার ইন্ডিয়া গত শুক্রবার এই চুক্তি সই করেছে। বোয়িংয়ের সঙ্গে চুক্তি চূড়ান্ত হয়েছে গত ২৭ জানুয়ারি। এয়ার ইন্ডিয়ার জন্য তারিখটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এদিনই টাটা ৭০ বছর পর আবারও সাবেক এই রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থার মালিকানা ফেরত পায়। এর মধ্যে ২২০টি বিমান কেনা হবে বোয়িং থেকে আর ২৫০টি কেনা হবে এয়ারবাস থেকে। বিমানগুলো সরবরাহ শুরু হবে ২০২৩ সালের দ্বিতীয় ভাগে। এ চুক্তিকে ‘যুগান্তকারী’ বলে উল্লেখ করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। আর প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন চুক্তিটিকে ‘ঐতিহাসিক’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এক বিবৃতিতে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘চুক্তিটি বাস্তবায়িত হলে আমেরিকার ৪৪টি প্রদেশে ১০ লাখের বেশি কর্মসংস্থানে সহায়তা হবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘এই চুক্তি ইন্দো-মার্কিন অর্থনৈতিক সমঝোতা ও শক্তির প্রকাশ। ভবিষ্যতেও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে সঙ্গে নিয়ে কঠিন আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জ লড়বে আমেরিকা। সুরক্ষিত করা হবে নাগরিকদের ভবিষ্যৎ।’
গত মঙ্গলবার এ নিয়ে এক বিবৃতিতে হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, বোয়িংয়ের সঙ্গে চুক্তির ফলে আমেরিকায় অর্থনৈতিক প্রভাব পড়বে ৭০ বিলিয়ন ডলারের। এমনকি ১৪ লাখ ৭০ হাজার কর্মসংস্থান প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সহায়তা পাবে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এয়ার ইন্ডিয়া বৈশ্বিক বিমানসেবায় নিজেদের স্থান আরো পাকাপোক্ত করার লক্ষ্যে একসঙ্গে এতগুলো বিমান কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। টানা প্রায় এক বছর এ নিয়ে গোপনে আলোচনা হয়েছে। আলোচনার স্থান ব্রিটেনের বাকিংহাম প্রাসাদের কাছাকাছি অবস্থিত টাটাদের এক হোটেলে। তারা আরো জানিয়েছে, সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়ে যাওয়ার পর উদযাপন করা হয়েছে ভারতের উপকূলীয় অঞ্চলের খাবার দিয়ে।আলোচনাপ্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত এক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে রয়টার্সকে এসব তথ্য দিয়েছেন। গত বছরের গ্রীষ্মকালে এই আলোচনা শুরু হয়। বড়দিনের কয়েক দিন আগে চুক্তির রূপরেখা চূড়ান্ত হয়। ডিসেম্বরেই রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ৫০০টি বিমান কেনার চুক্তি এই হলো বলে। আর এসব আলোচনা হয়েছে বাকিংহাম প্রাসাদের কিছুটা দূরে অবস্থিত ভিক্টোরীয় রীতিতে নির্মিত বিলাসবহুল সেন্ট জেমস কোর্ট হোটেলে। উভয় পক্ষের প্রতিনিধিরা এই হোটেলে অবস্থান করেছেন।
কখনো কখনো মধ্যরাত অবধি এয়ার ইন্ডিয়ার সঙ্গে এয়ারবাস ও বোয়িংয়ের আলোচনা হয়েছে বলে রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এয়ার ইন্ডিয়ার প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তা নিপুণ আগারওয়াল ও ট্রান্সফরমেশন বিভাগের প্রধান জোগেশ আগারওয়াল এই আলোচনায় নেতৃত্ব দেন।
বৈঠকে অংশগ্রহণকারী এক পক্ষের কর্মকর্তারা রয়টার্সকে বলেন, ‘এয়ার ইন্ডিয়ার প্রতিনিধিরা খুবই দক্ষতার সঙ্গে আলোচনা করেছেন। তাঁরা বিশ্বের সেরা ব্যাবসায়িক চুক্তি-আলোচকদের সমকক্ষ।’ আলোচনায় অংশ নেওয়া আরেক ব্যক্তি বলেছেন, ‘এয়ার ইন্ডিয়ার প্রতিনিধিরা খুবই পদ্ধতিগতভাবে আলোচনা করেছেন।’ সূত্র : রয়টার্স, সিএনএন মানি





