বিশ্বকাপের আগে সম্ভাব্য চ্যাম্পিয়নদের তালিকা তৈরি করলে বেশিরভাগ আলোচনাতেই জায়গা পাচ্ছিল আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স, স্পেন কিংবা ব্রাজিল। কিন্তু জার্মানির নামটি তুলনামূলকভাবে কমই উচ্চারিত হচ্ছিল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বড় টুর্নামেন্টে ধারাবাহিক ব্যর্থতা এবং দল পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া তাদের নিয়ে সংশয়ের জন্ম দিয়েছিল। তবে কুরাসাওয়ের বিপক্ষে ৭-১ গোলের দাপুটে জয় সেই ধারণাকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
স্কোরলাইন যতটা নজর কেড়েছে, তার চেয়েও বেশি গুরুত্ব পেয়েছে জার্মানির খেলার ধরন, কৌশলগত পরিপক্বতা এবং দলের ভেতরের ভারসাম্য!
আধুনিক ফুটবলে সেট-পিস অনেক সময় ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে। সেই জায়গায় জার্মানির উন্নতি চোখে পড়ার মতো। কর্নার ও ফ্রি-কিক থেকে সুযোগ তৈরি করার ক্ষেত্রে দলটি এখন অনেক বেশি পরিকল্পিত ও কার্যকর। কুরাসাওয়ের বিপক্ষে নিকো শ্লটারবেকের গোলটি ছিল এর একটি নিখুঁত উদাহরণ। প্রতিপক্ষের কড়া মার্কিংয়ের মধ্যেও নাথানিয়েল ব্রাউনের পরিমিত ক্রস থেকে শ্লটারবেক যেভাবে হেডে বল জালে পাঠিয়েছেন, তা শুধু ব্যক্তিগত দক্ষতার নয়, বরং অনুশীলিত কৌশলেরও প্রতিফলন। সেট-পিস কোচ ম্যাডস বুটগেরাইটের কাজ যে ফল দিতে শুরু করেছে, সেই ইঙ্গিতও মিলেছে এই ম্যাচে!
অন্যদিকে গোলবারের নিচে এখনো ভরসার প্রতীক ম্যানুয়েল নয়্যার। বয়স তাঁর ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়ের কথা মনে করিয়ে দিলেও অভিজ্ঞতার মূল্য যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা বারবার প্রমাণ করেছেন তিনি। কুরাসাওয়ের বিপক্ষে খুব বেশি পরীক্ষা দিতে হয়নি তাঁকে। তবু যে গোলটি হজম করেছেন, সেখানেও সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে বলের দিকে ঝাঁপ দিয়েছিলেন। সামনে বিশ্বকাপে গোলকিপার হিসেবে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার রেকর্ড গড়ার সম্ভাবনা রয়েছে তাঁর। ব্যক্তিগত মাইলফলকের চেয়েও বড় বিষয় হলো, বড় মঞ্চে চাপ সামলানোর যে অভিজ্ঞতা নয়্যারের আছে, তা জার্মানির জন্য অমূল্য সম্পদ।
সমালোচনার জবাব মাঠেই দিয়েছেন জামাল মুসিয়ালা। কয়েক সপ্তাহ ধরে তার ফর্ম নিয়ে জার্মান সংবাদমাধ্যমে প্রশ্ন উঠছিল। কিন্তু কুরাসাওয়ের বিপক্ষে দেখা গেছে সেই চেনা মুসিয়ালাকে। বল পায়ে প্রতিপক্ষকে কাটিয়ে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা, সংকীর্ণ জায়গায় ভারসাম্য ধরে রাখার দক্ষতা এবং আক্রমণে সৃজনশীলতা—সবকিছুর সমন্বয় ছিল তাঁর খেলায়। বিশ্বকাপে নিজের প্রথম গোল পাওয়ায় তাঁর আত্মবিশ্বাস আরও বাড়বে বলেই মনে করা হচ্ছে। একজন ফর্মে থাকা মুসিয়ালা যেকোনো প্রতিপক্ষের জন্য বড় হুমকি।
জার্মানির পুনর্জাগরণের আরেকটি বড় কারণ মাঝমাঠের নতুন রসায়ন। ২০২৪ ইউরোর পর দলটি এই বিভাগে পরিবর্তনের পথে হেঁটেছে। ফেলিক্স এনমেচা ও আলেকজান্ডার প্যাভলোভিচের জুটি কুরাসাওয়ের বিপক্ষে যে বোঝাপড়া দেখিয়েছে, তা আশাবাদী হওয়ার মতো। তাদের দ্রুত পাস আদান-প্রদান এবং খেলার গতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা জার্মানিকে মাঝমাঠে আধিপত্য বিস্তারে সহায়তা করেছে।
আধুনিক ফুটবলে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ অনেকাংশেই নির্ভর করে মাঝমাঠের ওপর, আর সেই জায়গায় জার্মানি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সংগঠিত।
এই দলের সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি হলো গোলের জন্য নির্দিষ্ট কোনো খেলোয়াড়ের ওপর নির্ভর না করা। কুরাসাওয়ের বিপক্ষে সাত গোলের মধ্যে ছয়জন ভিন্ন খেলোয়াড়ের নাম স্কোরশিটে উঠেছে। কাই হাভার্টজ দুটি গোল করলেও বাকিরা নিজেদের অবদান রেখেছেন সমানভাবে। এর ফলে প্রতিপক্ষের জন্য জার্মানিকে ঠেকানো আরও কঠিন হয়ে ওঠে। কারণ একটি উৎস বন্ধ করলেও অন্য দিক থেকে আক্রমণের ঝড় আসতে পারে!
এই ম্যাচে সবচেয়ে সুখকর চমকগুলোর একটি ছিল নাথানিয়েল ব্রাউনের অভিষেক। আইনট্রাখট ফ্রাঙ্কফুর্টের তরুণ এই ফুলব্যাক শুধু গোলই করেননি, আক্রমণ ও রক্ষণ-দুই ক্ষেত্রেই নিজের সক্ষমতার পরিচয় দিয়েছেন। ডেভিড রাউমের বিকল্প হিসেবে নয়, বরং প্রথম পছন্দের লেফটব্যাক হওয়ার দাবিও জোরালো করেছেন তিনি। পরিবারের সামনে অভিষেক ম্যাচে গোল করার স্মৃতি তার আত্মবিশ্বাসকে আরও সমৃদ্ধ করবে।
গোল না করেও আলোচনায় জায়গা করে নিয়েছেন ফ্লোরিয়ান ভির্টৎস। অনেক সময় পরিসংখ্যান কোনো ফুটবলারের প্রকৃত অবদান তুলে ধরতে পারে না, আর এই ম্যাচ তারই উদাহরণ। ফেলিক্স এনমেচার গোল তৈরিতে তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। পাশাপাশি রক্ষণেও তিনি ছিলেন সমান সচেতন।
প্রথমার্ধের শেষদিকে কুরাসাওয়ের একটি সম্ভাবনাময় পাল্টা আক্রমণ থামিয়ে দিয়ে দলকে বিপদমুক্ত করেন। ক্লাব ফুটবলে সাম্প্রতিক সমালোচনার পর তাঁর জন্য এমন একটি পারফরম্যান্স ছিল আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার আদর্শ মঞ্চ!
অখ্যাত কুরাসাওয়ের বিপক্ষে জয়কে শুধুমাত্র একটি বড় ব্যবধানে পাওয়া ফল হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এই ম্যাচে জার্মানি দেখিয়েছে তাদের কৌশলগত বৈচিত্র্য, অভিজ্ঞতা ও তরুণ প্রতিভার সমন্বয়, মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ এবং বহুমুখী আক্রমণক্ষমতা। বিশ্বকাপের মতো দীর্ঘ ও কঠিন টুর্নামেন্টে সাফল্যের জন্য যে উপাদানগুলো প্রয়োজন, তার প্রায় সবকটিরই ঝলক দেখা গেছে এই দলে!





